বিজ্ঞাপন

ঘর পায়নি রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকার অর্ধেক গৃহহীন পরিবার

July 21, 2022 | 7:59 am

প্রান্ত রনি, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

রাঙ্গামাটি: বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না— প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশজুড়ে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। এ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় পশ্চাৎপদ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামেও গৃহহীনদের ঘর দেওয়া হচ্ছে। এই কার্যক্রমের তৃতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার ঘর দেওয়া হয়েছে এই এলাকায়। তবে সরকারি হিসাবেই এখনো ঘর পায়নি রাঙ্গামাটির ৫০ শতাংশ গৃহহীন পরিবার। দুর্গম ও অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন পশ্চাৎপদ এলাকার মানুষ।

বিজ্ঞাপন

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার ১০ উপজেলায় সরকারি হিসাবে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৯০৭টি। গৃহপ্রদান কার্যক্রমের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৫টি ঘর উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২১ জুলাই) তৃতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩২টি ঘর হস্তান্তর করা হলে জেলায় মোট ১ হাজার ৪৭৭টি ঘর হস্তান্তর হবে।

জেলা প্রশাসনের হিসাবই বলছে, জেলার আরও ১ হাজার ৪৩০টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার এখনো সরকারি ঘর পায়নি। তবে সরকারি হিসাবে ২ হাজার ৯০৭টি গৃহহীন পরিবারের কথা বলা হলেও প্রকৃতভাবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তৃতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে নির্মাণাধীন ঘরগুলো হস্তান্তর করবেন। এই ধাপে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় ৭৮টি ঘর নির্মাণের কথা থাকলেও তিন উপজেলায় হস্তান্তর করা হবে ৩২টি ঘর। কাপ্তাই উপজেলায় ২৬টি, বরকলে পাঁচটি ও নানিয়ারচরে একটি ঘর হস্তান্তর করা হবে।

এর আগে, প্রথম পর্যায়ে এই জেলায় ৭৩৬টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫০৩টি এবং তৃতীয় পর্যায়ের প্রথম ধাপে ২০৬টি ঘর হস্তান্তর করা হয় গৃহহীন পরিবারগুলোর মধ্যে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। তবে পরে এই বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে এসে ঘরপ্রতি বরাদ্দ হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫শ টাকা। সে হিসাবে ধাপে ধাপে এ পর্যন্ত সর্বমোট বরাদ্দ বেড়েছে ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্পের অধীন সরকারি ঘর দেওয়ার শুরু থেকেই স্বল্প বরাদ্দের কারণে ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় হস্তান্তরিত এসব ঘরে ফাটল ও ভাঙনের অভিযোগও পাওয়া যায়। অনেক এলাকায় উপকারভোগীদের ঘরে ছেড়ে দেওয়ার তথ্যও জানা গেছে। এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি বিবেচনায় গৃহ নির্মাণে ধাপে ধাপে অভ্যন্তরীণ নকশায় পরিবর্তন আনা ও নির্মাণ ব্যয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।

ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে দুর্গম ও পশ্চাৎপদ অঞ্চল বলা হয়ে থাকে রাঙ্গামাটি জেলাকে। আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা বাঘাইছড়িসহ ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত রাঙ্গামাটির যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্ভোগ, চাহিদার চেয়ে অপ্রতুল নির্মাণ ব্যয় ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতির কারণে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর গৃহহীনরা সরকারি ঘর পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

প্রত্যন্ত অঞ্চলের গৃহহীনদের জন্য সরকারি ঘর নির্মাণে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন বলে মনে করেন রাঙ্গামাটির নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির নেতা এম জিসান বখতেয়ার। তিনি বলেন, সরকারিভাবে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গৃহহীনদের ঘর দেওয়ার উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। কিন্তু সারাদেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট নিরসন সম্ভব নয়। ফলে দুর্গম এলাকার বেশিরভাগ গৃহহী নাগরিক এই উদ্যোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে হলেও তাদের এই সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক। এই ইউনিয়নের সদ্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নেলসন চাকমা বলেন, সাজেক ইউনিয়নের মানুষ অত্যন্ত দরিদ্র। তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসতি ও এই এলাকা দুর্গম হওয়ায় এখানকার অধিবাসীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা খুব একটা ভোগ করতে পারেন না।

বিজ্ঞাপন

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ধূপ্পারচর এলাকার বাসিন্দা অসীম চাকমা বলেন, বিলাইছড়ির উপজেলার অনেক দরিদ্র পরিবার এখনো সরকারি ঘর পাননি। দেখা গেছে স্থানীয়ভাবে যারা বেশি দরিদ্র, দিন আনেন দিন খান— এ ধরনের মানুষও বাদ পড়েছেন। আমার এলাকাতেও এমন পরিবার আছে।

গৃহহীনদের ঘর হস্তান্তর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রাঙ্গামাটিতে গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৯০৭টি। তৃতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপের ৩২টিসহ এ পর্যন্ত জেলায় মোট ১ হাজার ৪৭৭টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ের পর থেকে ক্রমান্বয়ে ঘরগুলোর কিছুটা নকশা পরিবর্তন ও আরও টেকসই ঘর নির্মাণের কারণে বরাদ্দ বেড়েছে।

দুর্গম এলাকার অধিবাসীরা সরকারের এই আশ্রয়ন প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে— এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অভিযোগ স্বীকার করে নেন জেলা প্রশাসক। বলেন, আপাতত বেশি দুর্গম এলাকাগুলোতে এই প্রকল্পের আওতায় ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে না।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন