বিজ্ঞাপন

জেকেজির লোকজন কোপাচ্ছে— ঘুমালে এমন দুঃস্বপ্ন এখনো দেখি

August 1, 2022 | 8:00 pm

শামিম হোসেন শিশির

‘ঘুম থেকে এখনও চিৎকার করে উঠি। স্বপ্নে দেখি জেকেজির লোকজন আমাকে ধারালো অস্ত্রো দিয়ে কোপাচ্ছে, রড দিয়ে পেটাচ্ছে। ক্ষত চিহ্নগুলো এখনো আছে, যা দিয়ে পয়জন বের হয়।’

বিজ্ঞাপন

কথাগুলো সরকারি তিতুমীর কলেজের নিরাপত্তাপ্রহরী মো. এনায়েত হোসেনের। ২০২০ সালের ২ জুন রাতে জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা জেকেজি হেলথ কেয়ারের সদস্য ও ভাড়াটেদের দ্বারা কলেজের আরও বেশ কয়েকজন চতুর্থশ্রেণীর কর্মচারীর মতোই নির্মম হামলার শিকার হন। তিনি পরে ৬০ হাজার টাকা ঋণ করে চিকিৎসার খরচ চালিয়েছেন, যে ঋণের বোঝা এখনো বইতে হচ্ছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে ৩ হাজার টাকা পাওয়া ছাড়া এনায়েত সহাযোগিতা পাননি আর কারও কাছ থেকেই।

২০২০ সালে দেশে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা যখন চরমে, তখন কৌশলে করোনার স্যাম্পল কালেকশনের কাজ বাগিয়ে নেয় জেকেজি হেলথ কেয়ার। পরে নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করেই ২৭ হাজার মানুষকে মনগড়া রিপোর্ট দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এই অপরাধের মূলে ছিলেন জেকেজি হেলথ কেয়ারের শীর্ষ কর্মকর্তা ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফুল চৌধুরী। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় সাবরিনা ও তার স্বামীসহ ৮ আসামিকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বলা যায়, এই অপরাধ কার্য সংঘঠিত করতে রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজকে ‘ঘাঁটি’ বানিয়েছিল জেকেজি হেলথ কেয়ার।

বিজ্ঞাপন

জেকেজির লোকজন কোপাচ্ছে— ঘুমালে এমন দুঃস্বপ্ন এখনো দেখি

নমুনা পরীক্ষায় টেকনোলজিস্ট ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি তিতুমীর কলেজে কেন্দ্র স্থাপন করতে কৌশলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়ে আসে জেকেজি হেলথ কেয়ার। দেশে করোনার ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে কলেজ কর্তৃপক্ষও বিষয়টিকে সাধুবাদ জানায়। কিন্তু পরে কলেজ কর্তৃপক্ষকে রীতিমতো জিম্মি বানিয়ে সেখানে অপরাধের আখড়া গড়ে তোলেন জেকেজি হেলথে কেয়ারের সদস্যরা। অবাধে চলত মাদকের উদ্যম পার্টি আর অসামাজিক কাজ।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং জনসাধারণের মধ্যে করোনা সংক্রমণের ভয়— দুইয়ে মিলিয়ে পুরো ঢাকার মতো তিতুমীর কলেজ ক্যাম্পাসের পরিবেশও ছিল সুনসান। যে কয়েকজন কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী কলেজ কোয়ার্টারে থাকতেন, তাদের চলাচলেও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন জেকেজির সদস্যরা। তারা যেসব ভবনে থাকতেন, সেখানে কাউকে যেতে দিতে চাইতেন না। নিরাপত্তাকর্মীদের প্রবেশ নিয়েও ছিল আপত্তি। এমন পরিবেশ তৈরি করে দিনের পর দিন অপরাধকার্য চালিয়েছেন জেকেজির সদস্যরা। তবে কলেজ কোয়ার্টার যেহেতু পাশাপাশিই, ফলে তাদের কর্মকাণ্ড অজানা থাকত না কলেজের কর্মচারীদের।

কলেজের একাধিক নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারী এখনো জেকেজি’র সেসব কর্মকাণ্ডের কথা স্পষ্ট মনে করতে পারেন। তারা জানান, প্রায় প্রতি রাতেই চলত দেশি-বিদেশি মাদকের পার্টি। সন্ধ্যার পর থেকেই উচ্চ শব্দে নাচ-গান চলত। ডা. সাবরিনা ও আরিফুল চৌধুরীও থাকতেন সেসব আয়োজনে। জেকেজির সদস্যদের মধ্যে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা ভবনে থাকার ব্যবস্থা করা হলেও তা মানা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতুমীর কলেজের এক কর্মচারী বলেন, জেকেজির মেয়ে সদস্যের বাইরেও আরও অনেক মেয়েকেই দেখা যেত জেকেজির ছেলে সদস্যদের বিল্ডিংয়ে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমে কলেজে অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন এবং থাকার জায়গা হিসেবে নতুন ভবন ব্যবহারের অনুমতি পায় জেকেজি হেলথ কেয়ার। কিন্তু পরে অডিটোরিয়াম, কলা ভবনসহ কয়েকটি ভবনের জায়গা দখল করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে কলেজ কর্তৃপক্ষ আপত্তি তুললে স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিচার দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হতো। রমজান মাসেও উচ্চস্বরে গান আর মাদকের উদ্যম পার্টির কারণে তিতুমীর কলেজের পাশের ভবনগুলোর বাসিন্দারা রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। একের পর এক আসতে থাকে অভিযোগ।

একটা সময় কলেজের কর্মচারীরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন জেকেজির সদস্যরা। অফিস সহায়ক নুর-মোহাম্মদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘তাদের কর্মকাণ্ডে পাশের ভবনের বাসিন্দারা অভিযোগ দিচ্ছিল। আমরা তো অসহায় তখন। পরে আমরা গিয়ে বুঝিয়ে বললাম এসব না করার জন্য। তাতে রেগে গিয়ে পরদিন আমাদের বেধড়কভাবে পিটিয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

জেকেজির লোকজন কোপাচ্ছে— ঘুমালে এমন দুঃস্বপ্ন এখনো দেখি

২০২০ সালের ২ জুন মধ্যরাতে তিতুমীর কলেজের কর্মচারীদের ওপর হামলা করে জেকেজির সদস্যরা। হামলার জন্য বাহির থেকে ভাড়া করা লোকও আনা হয়েছিল। ফাঁকা কলেজে বাঁশ, রড, চাপাতি ইত্যাদি দিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয় কর্মচারীদের। নিরাপত্তাপ্রহরী মো. এনায়েত হোসেন সেই রাতে বুঝে ওঠার আগেই আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।

গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালিমারীতে ছিলেন অনেক দিন। যেই রাতে হামলার ঘটনা সেই দিনই ফিরেন ঢাকায়। কলেজ থেকে তলব করা হয়েছিল বলে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল যোগে বহু কষ্টে বাড়ি থেকে ফিরেছিলেন। অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে ফেরা ক্লান্ত এনায়েত নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই অবস্থায় তাকে পেটানো হয়েছে দরজা ভেঙে।

কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে এনায়েত হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘তারা খুঁজে খুঁজে বের করে আমাদের পিটিয়েছে। আমি কোয়ার্টারে ছিলাম। আমার দরজা ভেঙে আমাকে বিবস্ত্র করে পিটিয়েছে। আমি হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করেছি। কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেনি। ছেলেরা পিটিয়ে যাওয়ার পর মেয়েরা এসে আবার পেটায় আমাকে। তখন হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগও দেয়নি তারা।’

নিস্তেজ হয়ে পরে ছিলেন এনায়েত। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চার দিন চিকিৎসার পর আবারও কলেজে রেখে যাওয়া হয় তাকে। কলেজ ক্যাম্পাস তখন থমথমে। আক্রান্ত অন্য সহকর্মীদের কেউ বিছানায়, কেউ আতঙ্কে পালিয়ে। এনায়েত একা উঠতে-হাঁটতে পারতেন না। ওভাবেই চার-পাঁচদিন কাটানোর পর বাড়িতে চলে যান।

জেকেজির লোকজন কোপাচ্ছে— ঘুমালে এমন দুঃস্বপ্ন এখনো দেখি

বাড়ি ফিরে ঋণ করে চিকিৎসা করিয়েছেন। খরচ হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। শরীর মোটামুটি সুস্থ্য হলে আবারও তিতুমীর কলেজে কাজে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে এখনো। কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ৩ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছেন এনায়েত। আর কোথাও থেকে সহায়তা, আশ্বাস কিছুই মিলেনি। একটা সুবিধা অবশ্য মিলেছে। শারীরিক অসুস্থতা কাটেনি বলে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব থেকে অফিস সহায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এনায়েতকে। তাতে শরীর কিছুটা বিশ্রাম পায়।

নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে এনায়েতের মাসিক বেতন ১০ হাজার টাকা। বাড়িতে স্ত্রী এবং তিন ছেলে। বড় ছেলে ফরিদপুরে অনার্স প্রথম বর্ষের পড়ে। মেঝ জন দশম শ্রেণীর ছাত্র আর সবার ছোট ছেলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনে তিন ছেলের পড়ালেখার খরচ, সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম সেখানে ঋণের বোঝাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে গলার বড় কাটা।

পরিধেয় পোশাক উচিতে ক্ষত চিহ্ন দেখালেন এনায়েত হোসেন। ক্ষত আর ক্ষতের চিহ্ন হয়তো একদিন মুছে যাবে। কিন্তু নিরপরাধ হয়েও যেভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পরেছেন, তাতে পরিবার এবং সন্তানদের যতোটা মূল্য দিতে হচ্ছে সেটা কী কখনো মুছবে?

ডা. সাবিরনা ও আরিফুল চৌধুরীদের ১২ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এনায়েত বলছিলেন, ‘তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার দরকার ছিল। আমরা নিরাপরাধ হয়েও যে নির্যাতনের শিকার হলাম তার কোন প্রতিবাদও দেখিনি। সবাই আমাদের নির্যাতনের কথা ভুলে গেছে কিন্তু আমাদের ভোগান্তি শেষ হয়নি।’

সারাবাংলা/এসএইচএস/একেএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন