বিজ্ঞাপন

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় দুর্নীতি করে ৩২ বৈমানিক নিয়োগ

August 5, 2022 | 10:13 pm

শেখ জাহিদুজ্জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বাংলাদেশ বিমানে ৩২ বৈমানিক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। বৈমানিক স্বল্পতার কারণে ২০১৯ সালে ৩২ বৈমানিক (ক্যাডেট পাইলট) নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ বিমান। এই বৈমানিকদের নিয়োগ পরীক্ষার জন্য ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীর সদর দফতরে লিখিত পরীক্ষা (এমসিকিউ ও বর্ণনামূলক) অনুষ্ঠিত হয়। সেই পরীক্ষায় ১২০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০৩ অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৩২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলায় প্রকাশিত প্রথম পর্বের অনুসন্ধানে উঠে আসে এই ১২০ জনের মধ্যে অনেক প্রার্থী ছিলেন যারা দুর্নীতি না করলে এই লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। সারাবাংলার এবারের পর্বের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কিভাবে বিমানের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীরা তাদের পছন্দের প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে বিমানে নিয়োগ দিয়েছেন।

বিমানের এমডি ও সিইও আবুল মুনীম মোসাদ্দিক আহমেদ দায়িত্ব পালনকালে এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তদন্ত শুরু করে বিমান মন্ত্রণালয়। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগও জমা পড়ে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলার অনুসন্ধানে জানা যায়, বিমান মন্ত্রণালয় ও দুদকের অনুসন্ধানের কারণে ২০১৯ সালের ১৫ মে বিমান বাহিনীকে চিঠি দেয় বিমান বাংলাদেশ। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ৩ জুন বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার মো খালেদ হোসাইন স্বাক্ষরিত চিঠিতে উত্তর দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, ‘উত্তরপত্রসমূহ মূল্যায়ন শেষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের মৌখিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সব প্রার্থীকে এমিসিকিউ ও বর্ণনামূলক পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে যথাক্রমে ২০ ও ১০ নম্বর অতিরিক্ত হিসেবে যোগ করে বাংলাদেশ বিমানকে ফলাফল পাঠানো হয়েছে।’

 এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, লিখিত পরীক্ষায় অতিমাত্রায় খারাপ করার পরও প্রার্থীদের পাস করিয়ে বিমানের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীরা কিভাবে তাদের পরবর্তী ধাপে উন্নীত করেছেন। তাদের মধ্যে থেকে নিয়োগ পাওয়া কিছু বৈমানিকের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরা হলো।

বিজ্ঞাপন

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় দুর্নীতি করে ৩২ বৈমানিক নিয়োগ

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় দুর্নীতি করে ৩২ বৈমানিক নিয়োগ

বিজ্ঞাপন

এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী লিখিত পরীক্ষায় পাস মার্ক এমসিকিউতে ৬০ এবং বর্ণনামূলকে ৫০ বলে নির্ধারণ করেছিল। ফলাফল অনুযায়ী দেখা যায— বিমানে নিয়োগ পাওয়া এই বৈমানিকদের লিখিত পরীক্ষার এমসিকিউতে ২০ এবং বর্ণনামূলকে ১০ নম্বর যদি না দেওয়া হতো তাহলে তারা মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেতেন না। কেননা এই প্রার্থীরা আলাদাভাবে তো দূরের কথা এমসিকিউ এবং বর্ণনামূলকে গড় ৫৫ নম্বরও পাননি। বিমানের নীতিমালা অনুযায়ী যেখানে তারা লিখিত পরীক্ষাতেই বাদ পড়ে যান। কিন্তু এখানে তাদের নিয়োগ দিতে বিমানের অসাধু কর্মকর্তারা দুর্নীতি করেছেন।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বিমানের কর্মকর্তারা নীতিমালা ভঙ্গ করে লিখিত ও মৌখিক দুটোতেই সমপরিমাণ ১০০ ও ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়। কিন্তু বিমানের নীতিমালায় বলা রয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় ৭৫ শতাংশ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ২৫ শতাংশ নম্বর দিয়ে সর্বমোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু এখানেও বিমানের কর্মকর্তারা তাদের প্রার্থীদের পাস করিয়ে দিতে দুর্নীতি করেছেন। ফলে বিমানে নিয়োগ পাওয়া এই বৈমানিকরা লিখিত কম নম্বর পাওয়ার পরও অজানা ক্ষমতাবলে মৌখিকে বেশি নম্বর পেয়ে বিমানে নিয়োগের যোগ্য হয়েছেন। শুধু তাই নয় বিমানের লিখিত পরীক্ষায় এমন অনেক প্রার্থী ছিলেন যারা লিখিত পরীক্ষায় এসব প্রার্থীদের চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়ার পরও তাদের মৌখিক পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়ে ফেল করানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিমানের নীতিমালা অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষার মোট নম্বর মৌখিক পরীক্ষার চেয়ে ৩ গুণ বেশি। ফলে একজন প্রার্থীকে শুধু মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করিয়ে বাদ দেওয়া যাবে না। কিন্তু এখানেও বিমানের নিয়ম ভঙ্গ করে লিখিত পরীক্ষায় বেশি পাওয়ার পরও মৌখিক পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়ে অনেক প্রার্থীকে ফেল করানো হয়েছে। আবার লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া বিমানের পছন্দের প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে পাস করানো হয়েছে।

বিমান মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মৌখিক পরীক্ষায় বিমান পরিচালনা পর্ষদের যে সব কর্মকর্তার উপস্থিত থাকার কথা ছিল তারা সবাই ছিলেন না। বিমানের চিফ অব ট্রেনিং যার মৌখিক পরীক্ষায় থাকা আবশ্যক তিনিও এই পরীক্ষার বিষয়ে অবগত ছিলেন না। অপরদিকে বিমান মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানের সময় বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অনুসন্ধান কর্মকাণ্ডে কোনো প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি।

আরও পড়ুন: আবেদনের যোগ্যতা নেই, তবুও তারা বৈমানিক!

এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘যারা যোগ্য নন তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া মানে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হওয়া। দুর্নীতির মাধ্যমে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে সেই নিয়োগ অবশ্যই বাতিলযোগ্য। যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ পাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। যতদূর জানি বিমানের তদন্তে দুর্নীতির বিষয়টি উঠে এসেছিল। তখন ওই নিয়োগ বাতিল করতে বলা হয়। কিন্তু কোন অজানা কারণে নিয়োগ বাতিল হয়নি তা আমার বোধগম্য নয়।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা এভিয়েশনখাতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বিমানকে আরও স্বচ্ছ হতে হবে। দুর্নীতি বন্ধে কঠোর হতে হবে।’

বিমানের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও মো. যাহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে কী ঘটেছে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। যখন নিয়োগ হয় তখন কিন্তু সিভিল এভিয়েশনও এই নিয়োগ গ্রহণ করেছে। আমরা সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’

বিমান মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দুর্নীতির বিষয়টি উঠে এসেছিল, তখন নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ হয়েছিল। এরপরও কেন নিয়োগ বাতিল হলো না জানতে চাইলে বিমানের নতুন সিইও বলেন, ‘ আমি বলতে পারব না। বিষয়টি নিয়ে দুদকও তদন্ত করেছে। আমি এতটুকু বলতে পারি- কারও দায় আমি নেব না। আমি দায়িত্ব পালনকালে কোনো দুর্নীতি হয় কি না সে ব্যাপারে দায়ভার আমার। তবে বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়েও আলোচনা চলছে। আমরা বিমানের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

বিমানে নিয়োগ দুর্নীতির বিষয়ে বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কোনো দুর্নীতি বরদাশত করব না। বিষয়টি নিয়ে উচ্চমহল পর্যন্ত আলোচনা চলছে।’

কেউ দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে থাকলে কী ব্যবস্থা নেবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিমানের নিজস্ব আইন রয়েছে। সেই আইনে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুদকও বিষয়টির অনুসন্ধান শেষে চার্জশিট দিয়েছে। আমরা কিন্তু বসে নেই। আমরাও আমাদের কাজ করছি। সময় হলে সব জানতে পারবেন।’ (বৈমানিক নিয়োগ নিয়ে পরের পর্ব আসছে শিগগিরই...)

সারাবাংলা/এসজে/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন