বিজ্ঞাপন

সার-ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, চাষাবাদে আগ্রহ হারাবে কৃষক

August 7, 2022 | 11:05 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে ইউরিয়া সার ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ‘উভয়মুখী চাপে’ পড়েছে কৃষক। ফলে আগামী মৌসুম থেকেই চাষাবাদ কমিয়ে ফেলা কিংবা জমি পতিত রাখার চিন্তাও করছেন কেউ কেউ। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, বাজেটে সংকুলান না হলে কৃষক বাধ্য হয়েই আগের চেয়ে কম জমি চাষ করবেন। এতে দেশে ধান উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলছেন, সার ও ডিজেলের দাম বাড়ায় দেশে খাদ্য সংকেটর আশঙ্কা রয়েছে। ভবিষ্যতে আগের চেয়ে আরও বেশি খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে বাংলাদেশকে। তবে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় এসব আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে।

মন্তব্য জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সার ও ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষক আর্থিক সংকটে পড়বে। চলতি মৌসুমের রোপা আমনের চাষ বিঘ্নিত হতে পারে। আশানুরূপ ফলনও হবে না। সামনের বোরো মৌসুমেও কৃষক চাষে নিরুৎসাহিত হবে। কারণ বোরো মৌসুমে বেশি করে সেচ ও সার লাগে। অনেকেই হয়তো বোরো চাষের বাইরে থাকবেন।’

বিজ্ঞাপন

আরও বেশি খাদ্যশস্য আমদানির শঙ্কা তৈরি হয়েছে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এ বছর সরকার ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সামনের দিকে হয়তো ২০ থেকে ২৫ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষিপণ্য বিপণনেও খরচ বেড়ে যাবে। কারণ পরিবহন খরচ বাড়বে। এতে কৃষকের প্রকৃত আয় কমে যাবে। সব মিলিয়ে কৃষক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবে। গ্রামীণ জনপদে বিরূপ প্রভাব পড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ জীবনে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।’

বিজ্ঞাপন

সার ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে বিশাল খাদ্য সংকটের আশঙ্কা রয়েছে— এমন মন্তব্য করেছেন আরেক কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস’র সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. এম আসাদুজ্জামান। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘জ্বালানির খরচ বাড়ায় কৃষিপণ্য বাজারে আনতে খরচ বাড়বে। সমস্ত দিক থেকে কৃষক ও ভোক্তার অবস্থা খারাপ হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় দেশে বিশাল খাদ্য সংকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষক সবদিক থেকে প্রচণ্ড চাপে পড়বে।’

ব্যাখ্যা দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘ইউরিয়া সারের দাম বাড়ায় হয়তো খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। উৎপাদনে খরচ খুব একটা বাড়বে না। কিন্তু একজন কৃষক আগে যখন দুই হাজার টাকা খরচ করতো, এখন তাকে কিন্তু আড়াই হাজার টাকা খরচ করতে হবে। সেই টাকা কৃষকের হাতে নেই। সারের সঙ্গে তেলের দাম বাড়ায় আগে যে কৃষক তিন বিঘা জমি চাষ করতো, এখন তিনি হয়তো দুই বিঘা জমি চাষ করবেন। আবার অনেকেই হয়তো চাষই করবে না। কারণ বোরোতে সেচ দিতে পারবে না। এতে মোট উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘বোরো মৌসুমেই সবচেয়ে বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়। বোরোতে যদি ১০ শতাংশও উৎপাদন কমে যায়, তবে এতে দেশের বিরাট ক্ষতি হবে। বৃষ্টি না হওয়ায় এ বছর আমনের উৎপাদন কম হবে। আবার বৃষ্টি না হওয়ায় পানির লেয়ারও নিচে নেমে যাবে। এতে বোরো মৌসুমে সেচ দিতে বিদুৎ ও জ্বালানির খরচ বাড়বে। আবার পানি নাও পাওয়া যেতে পারে।’

এদিকে কৃষকরাও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার কৃষক মোস্তফা সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘তেল ও সারের দাম বাড়ায় আগামী মৌসুম থেকে কৃষি কাজ করা কষ্টকর হয়ে যাবে। হয়তো আর কৃষি কাজ করাই যাবে না। জমি হয়তো পতিত রাখতে হবে। হয়তো এই মৌসুমই শেষ!’

বিজ্ঞাপন

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কৃষক হিমেল কবীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘এমনিতেই আমরা ধানের দাম পাই না। এর মধ্যে আগেই সব খরচ বেড়েছে। এখন আবার নতুন করে তেল ও সারের দাম বাড়ল। খরচ তো বেড়ে যাবে, সেই টাকা পাবো কোথায়? টাকা না পাইলে তো জমি পতিত রাখতে হবে।’

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কৃষক রুহুল বলেন, ‘বোরো মৌসুমে আমি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করি। সবটাই ডিজেলচালিত ইঞ্জিন দিয়ে সেচ দিতে হয়। এখন সেচের খরচ বাড়বে, আবার সারের খরচও বেশি। খরচ বেশি বেড়ে গেলে হয়তো ধান চাষ কমিয়ে আনতে হবে।’

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্যমতে, দেশের দুই কোটি কৃষকের মধ্যে বোরো মৌসুমের পাঁচ মাসে (ডিসেম্বর-এপ্রিল) প্রায় ৭৫ শতাংশ কৃষকই ডিজেলচালিত ইঞ্চিনের মাধ্যমে জমিতে সেচ দেয়। সারাবছর কৃষিতে ডিজেলের চাহিদা ৯ দশমিক ৭২টন, যা মোট ডিজেল ব্যবহারের ২১ দশমিক ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু বোরো মৌসুমেই প্রায় ৮ লাখ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কৃষিতে যে ডিজেল ব্যবহার হয় তার জন্য বছরে আগে খরচ হতো ৮ কোটি টাকা। ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা বাড়ানোর ফলে এই খরচ এখন প্রায় ১১ দশমিক ৫ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ ডিজেলের দামে কৃষকের ব্যয় বাড়বে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।

অন্যদিকে, ইউরিয়া সারের দাম আগেই কেজিতে ৬ টাকা বাড়িয়ে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তথ্যমতে, প্রতি বিঘা জমিতে আমন ধান চাষে ২৩ কেজি এবং বোরো ধান চাষে ৩০ কেজি করে ইউরিয়া ব্যবহার করতে হয়। এই হিসেবেও শুধু ইউরিয়ার ব্যবহারেই প্রতি বিঘা জমিতে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় বেড়ে যাবে।

মন্তব্য জানতে চাইলে বিএডিসির’ সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্র সেচ) ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ ব্যবস্থায় তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। কৃষক যদি সেচের ক্ষেত্রে ভালো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না করে, তাহলে উৎপাদন খরচ সেই অর্থে বাড়বে না। বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনে কৃষক মাত্রাতিরিক্ত পানি ব্যবহারে অভ্যস্ত। ডিজেলের দাম বাড়ায় এখন তারা হয়তো অতিরিক্ত পানি ব্যবহার বন্ধ করবে। যেভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, সেচ ব্যবস্থায় ততটা প্রভাব পড়বে না। হয়তো উৎপাদনে কিছুটা খরচ বাড়তে পারে।’

প্রসঙ্গত, ইউরিয়া সারের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে এবং চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে ডিলার পর্যায়ে ইউরিয়া সারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রতিকেজি ১৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতিকেজি ২০ টাকা এবং কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি ১৬ টাকা হতে বাড়িয়ে ২২ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।

এদিকে, সম্প্রতি সরকার সবধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ডিজেল ১১৪ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। অর্থাৎ লিটার প্রতি ডিজেল ৮০ টাকা থেকে ৩৪ টাকা বেড়ে ১১৪ টাকা, কেরোসিন ৩৪ টাকা বেড়ে ১১৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ৪৬ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সারাবাংলা/ইএইচটি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন

Tags: , , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন