বিজ্ঞাপন

টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি: একা প্রতিবাদ করায় ধর্ষণের শিকার তরুণী

August 8, 2022 | 3:21 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: টাঙ্গাইলে যাত্রীবেশে উঠে চলন্ত বাসে ডাকাতির পর এক তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় বাসের হেলপার রতন হোসেনসহ ১০ কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাবের দাবি, ডাকাতির সময় ওই তরুণী একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন। যার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ডাকাতরা কয়েকজন মিলে তরুণীকে ধর্ষণ করে।

বিজ্ঞাপন

র‌্যাব জানিয়েছে, চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী রতন হোসেন। রতন দিনে বাসচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করলেও রাতে যুক্ত হতেন ডাকাতির কাজে। এর আগেও ১০টি বাসে ডাকাতির নেতৃত্ব দেন রতন। গ্রেফতার হয়ে কারাভোগও করেছেন।

সোমবার (৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, টাঙ্গাইলের মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ১৩ জন। তাদের কেউ বাসের হেলপার কেউবা পোশাক কারখানার শ্রমিক। এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী রতনসহ ডাকাত চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। রোববার (৭ আগস্ট) সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-১৪ তাদেরকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতার হওয়া ১০ জন হলেন- ডাকাত চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী রতন হোসেন (২১), মো. আলাউদ্দিন (২৪), সোহাগ মণ্ডল (২০), খন্দকার মো. হাসমত আলী ওরফে দীপু (২৩), বাবু হোসেন ওরফে জুলহাস (২১), মো. জীবন (২১), আব্দুল মান্নান (২২), নাঈম সরকার (১৯), রাসেল তালুকদার (৩২) ও আসলাম তালুকদার ওরফে রায়হান (১৮)। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ২০টি মোবাইল সেট, রুপার চুড়ি ২টি, ১৪টি সিম কার্ড ও ডাকাতিতে ব্যবহৃত একটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

র‌্যাব জানায়, বাসে ডাকাতির পরিকল্পনা থাকলেও ধর্ষণের কোনো পরিকল্পনা আগে থেকে ছিল না ডাকাতদের।

মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, গত ২ আগস্ট দিবাগত রাত আনুমানিক ১টায় কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস টাঙ্গাইল অতিক্রম করার সময় ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় এক যাত্রী বাদী হয়ে মধুপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ১০/১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।

বিজ্ঞাপন

র‌্যাবের পরিচালক বলেন, গ্রেফতার রতন মিয়া বাস ডাকাতির তিনদিন আগে তার সহযোগী রাজা মিয়াকে ডাকাতির প্রস্তাব দিলে তিনি অন্যদের একত্রিত করার কথা বলেন। পরে রতন, মান্নান, জীবন, দীপু, আউয়াল ও নূরনবীকে ডাকাতির পরিকল্পনার কথা জানান। এরপর মান্নান তার সহযোগী সোহাগ, আসলাম, রাসেল, নাঈম ও আলাউদ্দিনকে নিয়ে ডাকাতিতে যোগ দেন। এ ডাকাতিতে রতনের নেতৃত্বে মোট ১৩ জন অংশ নেন।

টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি: একা প্রতিবাদ করায় ধর্ষণের শিকার তরুণী

বিজ্ঞাপন

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রতনের নেতৃত্বে গত ২ আগস্ট গাজীপুরের জিরানী বাজার এলাকায় সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বাসে ডাকাতির পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। মূল পরিকল্পনাকারী রতন এ ডাকাতি কাজে যাবতীয় প্রস্তুতির আর্থিক খরচ বহন করেন। চক্রের সদস্যদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে তাদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রতন ২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড়ের একটি দোকান থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাকু, ২টি ধারালো কাঁচি ও একটি খুর কেনেন।

তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ডাকাতির রাতে রাজাসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যরা সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। রাত আনুমানিক ১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় পৌঁছালে রাজা বাসটিকে থামার সংকেত দেন। এরপর যাত্রীবেশে প্রথমে রতন, রাজা, মান্নান ও নূরনবী বাসটিতে ওঠেন। পরে আরও দুই দফায় ডাকাতচক্রের অন্য সদস্যরা বাসটিতে যাত্রীবেশে ওঠেন। বাসটিতে ২৪ জন সাধারণ যাত্রী থাকায় ডাকাত চক্রের অধিকাংশ সদস্য বাসের পেছনের দিকে বসেন। বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু এলাকা অতিক্রম করলে রতন ডাকাত দলের সদস্যদেরকে চাকু ও ধারালো কাঁচি দেন। এ সময় ধূমপানের কথা বলে বাসের গেটের কাছে যান আউয়াল। তিনি অন্যান্যদের ইশারা দিলে রাজা, রতন, মান্নান ও নূরনবী বাসচালকের সিটের কাছে গিয়ে ড্রাইভারকে মারধর করেন এবং রতন বাসের ড্রাইভিং সিটে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন।

তিনি জানান, ডাকাত দলের বাকি সদস্যরা বাসের চালক ও সুপারভাইজার, হেলপারসহ অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদেরকে হাত মুখ বেঁধে সিট কভার দিয়ে মুখ ঢেকে দেন। এরপর তারা যাত্রীদের সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করেন। এছাড়াও এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণ করেন।

র‍্যাবের মুখপাত্র বলেন, টাঙ্গাইলের হাটুভাঙ্গা মোড় হয়ে মধুপুরে যাওয়ার পথে মধুপুরের রক্তিপড়া এলাকায় লুট করা মালামাল নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। সেসময় রতন গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এ অবস্থায় পেছনে তাকালে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে হেলে পড়ে। এরপর ডাকাতদলের সবাই লুটকৃত মালামালসহ বাস থেকে নেমে পালিয়ে যান।

র‍্যাবের লিগ্যাল আ্যন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, দুর্ঘটনার পর ডাকাতদল বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়। পরে অন্য বাসে করে ডাকাত চক্রের সদস্যরা টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় যান এবং মধুপুরের কুড়ালিয়া এলাকায় রতনের নিকটাত্মীয়ের ফাঁকা বাড়িতে গিয়ে লুন্ঠিত মালামাল নিজেদের মধ্যে বণ্টন করেন। এরপর রতন গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় আত্মগোপন করেন। মান্নান, আলাউদ্দিন ও বাবু পৃথকভাবে আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকায় আত্মগোপন করেন। এছাড়া আসলাম, নাঈম, রাসেল প্রথমে নিজের এলাকায় ও পরে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ এলাকায় আত্মগোপন করেন। ডাকাত জীবন কোনাবাড়ীতে আত্মগোপন করেন। ডাকাত দীপু প্রথমে টাঙ্গাইলের পিরোজপুর গ্রামে ও পরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় আত্মগোপন করেন। ডাকাত সোহাগ প্রথমে জিরানী বাজার ও পরে জামালপুরে এবং পুনরায় জিরানী বাজারে আত্মগোপন করেন।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার রতন হোসেন ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি পেশায় গাড়ির হেলপার। তার বিরুদ্ধে আগেও ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে। রতন ২০১৮ সালে নূরনবী, জীবন ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে রোডব্লক করে সাভার পরিবহনের একটি বাস ডাকাতি করেন। ওই ঘটনায় রতন গ্রেফতার হয়ে প্রায় দেড় বছর কারাভোগ করেন। পরে জামিনে বের হয়ে ২০২০ সালে আবার নূরনবী, জীবন ও আউয়ালকে নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি অটোরিকশা ছিনতাই করেন। তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা জীবনকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার হয়ে রতন প্রায় এক বছর কারাভোগ করেন। কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে তিনি তার সিন্ডিকেট নিয়ে সাভার, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় মহাসড়কে আরও বেশ কয়েকটি ডাকাতি করেন।

গ্রেফতার জীবন পেশায় গাড়ির হেলপার। এর আড়ালে তিনি বেশ কয়েকটি পরিবহন ডাকাতিতে অংশ নেন। ডাকাতিতে তিনি যাত্রীদের মালামাল লুটের দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে ২০১৮ ও ২০২০ সালে দুটি ডাকাতির মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেন।

গ্রেফতার মান্নান গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তিনি ২০১৯ সালে আশুলিয়া থানায় করা একটি চুরির মামলায় কারাভোগ করেন। তার নেতৃত্বে আলাউদ্দিন, সোহাগ, বাবু, দীপু, রাসেল, রায়হান, নাঈম ডাকাতিতে অংশ নেন। তারা ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।

সারাবাংলা/ইউজে/এএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন