বিজ্ঞাপন

অপুষ্টিতে দেশের ১ কোটি ৭০ লাখ বিবাহিত নারী, ঝুঁকিতে মা ও শিশু

August 17, 2022 | 12:16 am

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী এক কোটি ৭০ লাখ নারী এখনো অপুষ্টির শিকার, যা মোট বিবাহিত নারীর ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এদের বড় একটি অংশের উচ্চতার তুলনায় ওজন বেশি। অন্য অংশের উচ্চতার তুলনায় ওজন কম। এসব নারী প্রতি বছর ১৪ লাখ শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। অর্থাৎ অপুষ্টির ঝুঁকি নিয়ে জন্ম হচ্ছে এসব শিশুর। পুষ্টিহীনতার কারণে দেশে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষকরা বলছেন, দেশে নারীদের স্থুলতার সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এ জন্য বিয়ের আগেই স্কুলে পড়া অবস্থায় পুষ্টির দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে।

মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান গবেষকরা।

বিজ্ঞাপন

‘বাংলাদেশি নারীদের অপুষ্টির দ্বৈতবোঝা’— শিরোনামে আয়োজিত অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে আইসিডিডিআরবি, যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি এবং ডেটা ফর ইমপ্যাক্ট।

অনুষ্ঠানে গবেষণায় পাওয়া তথ্য উপস্থাপন করেন ডাটা ফর ইমপ্যাক্টের নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনস বিশেষজ্ঞ সুস্মিতা খান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) গবেষক মহিউদ্দিন হাওলাদার।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশে গত ১০ বছরে তাদের পুষ্টিহীনতার হার কিছুটা কমলেও পরিসংখ্যান মতে এখনো অপুষ্টিতে ভুগছে নারীদের একটা বিশাল অংশ। বিশেষ করে বিবাহিত নারীদের অবস্থা রয়েছে শোচনীয় পর্যায়ে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে গবেষক মহিউদ্দিন হাওলাদার বলেন, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীর সংখ্যা তিন কোটি ৮০ লাখ। তাদের মধ্যে ৫০ লাখ নারীর ওজন প্রয়োজনের তুলনায় কম; অর্থাৎ তারা অপুষ্টিতে ভুগছেন। অন্যদিকে এক কোটি ২০ লাখ নারীর ওজন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। তারা নারী স্থুল। অপুষ্টির কারণেই তারা স্থুল।

বিজ্ঞাপন

এর অর্থ হচ্ছে— ওই বয়সী ৪৫ শতাংশ নারী অপুষ্টিতে ভুগছেন— উল্লেখ করেন মহিউদ্দিন হাওলাদার।

অনুষ্ঠানে ইউএসএআইডি—র কান্তা জামিল বলেন, আমরা দেখছি যে নীতিতে একটি বিচ্যুতি রয়েছে, তবে, আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, প্রজননক্ষম বয়সের বিবাহিত নারীদের মধ্যে কম ওজন থেকে অতিরিক্ত ওজনের ক্রসওভারটি ২০১২ সালের দিকে শুরু হয়েছিল এবং ২০১৭-১৮ বিডিএইচএস-এ এই ব্যবধানটি আরও দৃশ্যমান। এখন আমাদেরকে অবশ্যই পরবর্তী কর্মসূচির পরিকল্পনা করতে হবে এবং এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজনে নীতিগুলো সংশোধন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

অপুষ্টিতে দেশের ১ কোটি ৭০ লাখ বিবাহিত নারী, ঝুঁকিতে মা ও শিশু

গণমাধ্যম কর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল—এর কান্ট্রি ডিরেক্টর সাইকা সিরাজ বলেন, অতিরিক্ত ওজনের বা স্থুলতার প্রভাব একটি দূরবর্তী সমস্যা নয় যা শুধুমাত্র বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ক্ষতি করবে। এটি আমাদের মা এবং শিশুদেরকে প্রভাবিত করছে এবং একটি আন্তঃপ্রজন্ম চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পুষ্টি একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়, যার জন্য বহু খাতের সমন্বয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। তাই আমাদেরকে এর ওপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

অনুষ্ঠানে ডাটা ফর ইমপ্যাক্ট—এর কান্ট্রি লিড ড. মিজানুর রহমান এধরনের কাজে সহযোগিতা করার জন্য ইউএসএআইডি বাংলাদেশ-কে ধন্যবাদ জানান এবং এই বিষয়ে আরও সোচ্চার হওয়ার জন্য গণমাধ্যমের সদস্যদেরকে অনুরোধ করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা পুষ্টিহীনতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জোর দেওয়ার কথা জানিয়ে পাঁচটি পরামর্শ দেন। এগুলো হলো—

১) কৈশোর থেকেই অপুষ্টির উভয় দিক সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং এবিষয়ে কথা আলোচনা করতে হবে,

২) প্রসবকালীন বিভিন্ন যত্নের প্রবর্তন করতে হবে,

৩) সঠিক ও সুরক্ষিতভাবে নবজাতক ও কম বয়সী শিশুদেরকে খাওয়ানোর উদ্যোগকে জোরদার করতে হবে,

৪) প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং

৫) স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

গবেষকেরা জানান, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে ২০১৭ সালে এই গবেষণা চালানো হয়েছে।

২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের জনমিতি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানান, এই ১০ বছরে মানুষের উন্নয়নের বিভিন্ন মাত্রাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মাঝে পুষ্টি স্বল্পতার হার ৩০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। লক্ষণীয় মাত্রায় কমে যাওয়ার প্রবণতা যেমন দেখা যাচ্ছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে, অতিরিক্ত ওজন বা স্থুলতার প্রবণতাও (১২ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশ) বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষকরা জানান, যদিও নারীদের মধ্যে অপুষ্টি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে কিন্তু অন্যদিকে নারীদের মধ্যে সুপুষ্টির হার আগের মতোই আছে- ২০০৭ সালে ৫৮ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ সালে ৫৬ শতাংশ। আমরা যদি সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করতে চাই, বাংলাদেশে আনুমানিক ১ কোটি ৭০ লক্ষ নারী (যাদের বয়স ১৫-৪৯ বছরের মধ্যে) অপুষ্টিতে ভুগছে, যার মধ্যে ৫০ লক্ষ নারীর ওজন কম, এবং ১ কোটি ২০ লক্ষ নারী স্থুলকায়। এই অবস্থা চলতে থাকলে, ২০৩০ সাল নাগাদ ৪৬ শতাংশ বিবাহিত প্রজননক্ষম নারী স্থুলকায় হবে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। কারণ বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ৩.৪ মিলিয়ন শিশুর জন্ম হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ০.৯ মিলিয়ন শিশুর জন্ম হয় স্থুলকায় নারীর গর্ভ থেকে এবং ০.৫ মিলিয়ন শিশুর জন্ম হয় কম ওজনের নারীর গর্ভ থেকে। বর্তমান এই অপুষ্টির অবস্থা চলতে থাকলে, গর্ভধারণ এবং শিশুর জন্ম এই দুটিই স্থুলকায় নারীর গর্ভ থেকে বেশী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

এই দুই ধরণের অপুষ্টিই মা এবং শিশুর স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। কম ওজনের গর্ভবতী নারীর রক্তশূন্যতা, প্রসবপূর্ব বা প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ, অকালে ঝিল্লি ফেটে যাওয়ার প্রবণতা বেশী হয়ে থাকে— জানান গবেষকরা।

গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জানান, মা যদি স্থুলকায় হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে প্রসবকালীন বিভিন্ন জটিলতা, যেমন গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ, সিজারিয়ান শিশুর জন্ম বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যায় যেমন, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করানোর হার কম হওয়া, বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়কালও কমে যাওয়ার প্রবণতা বেশী পরিলক্ষিত হয়। এই সবগুলো কারণই নবজাতকের বেঁচে থাকার, বেড়ে ওঠার এবং বড় হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিন বক্তারা বলেন,  জাতীয় নীতিতে পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি, জাতীয় নীতি প্রাক-গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থা এবং প্রসবোত্তর প্রজননক্ষম নারীদের এই অপুষ্টির দ্বৈত স্বাস্থ্য সমস্যাকে আমাদের চিহ্নিত করতে হবে, তাহলেই মা ও শিশুর সর্বোত্তম সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বক্তারা জানান, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক নীতিতে, পরিকল্পনায় বা প্রকল্পে কম ওজন বিষয়ক অপুষ্টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সরকারের ২২টি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তবে কাজ কতটা প্রভাব ফেলছে তা চিত্রই বলে দিচ্ছে।

তাঁরা আরও বলেন, দেশে নারীদের স্থুলতার সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এ জন্য বিয়ের আগেই স্কুলে পড়া অবস্থায় পুষ্টির দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে।

সারাবাংলা/এসবি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন