বিজ্ঞাপন

‘মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বিন্দুমাত্র সত্যের অপলাপ ছিল না’

August 18, 2022 | 10:46 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ২০২১ সালে দুর্গাপূজায় বিভিন্ন মণ্ডপে হামলা ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা অস্বীকার করে দেওয়া বিবৃতি সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল সেখানে বিন্দুমাত্র সত্যের অপলাপ ছিল না। কিন্তু সেটাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যা দুঃখজনক।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর জে এম সেন হল প্রাঙ্গনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় আয়োজন জন্মাষ্টমী উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

২০২১ সালে দুর্গাপূজায় বিভিন্ন মণ্ডপে হামলা ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা অস্বীকার করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের একটি বিবৃতি নিয়ে ক্ষোভ আছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ওই বিবৃতির জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছিলেন। এর মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়া নিয়ে আপত্তি তুলে বৃহস্পতিবার কালো পতাকা নিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেয় ‘বিক্ষুব্ধ সনাজন সমাজ’ ও ঐক্যবদ্ধ সনাতন সমাজ’ নামে একটি সংগঠন, যাতে উপস্থিত ছিলেন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তও। তারা মিছিল-সমাবেশ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চট্টগ্রামে আগমনের প্রতিবাদ জানান।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, অনুষ্ঠানে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ-কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুকুমার চৌধুরী এবং চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বক্তব্যের ব্যাখা দাবি করেন।

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনাটি এক বছর আগের। পূজার সময় কুমিল্লায় একটি দেবতার কাছে কোরআন শরীফ রেখে একটা ছবি তোলে। সেটা ভাইরাল হয়। ভাইরাল হওয়ার পর কিছু মোল্লাগোষ্ঠী ওখানে আক্রমণ করে। আক্রমণ থামাতে গিয়ে পুলিশ ‍গুলি করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে এই ঘটনা আমরা জানি, তখনও আমরা কিন্তু কুড়িগ্রামের কাহিনী জানতাম না। তখন আমাদের মন্ত্রণালয় যেসব কথা বলেছে, সত্যি কথা বলেছে। আমি শিক্ষক লোক, সত্য কথা বলি। আমরা বলেছি, তখন পর্যন্ত মোট ছয়জন লোক মারা যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, চারজন মুসলমান, দুজন হিন্দু। তবে আমরা একজন লোকও মারা যাক সেটা চাই না।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে, বিভিন্ন প্রচারণায় বের হল যে কয়েকশ’ নারী নির্যাতিত হয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে। অথচ একজন নারীও ধর্ষিত হয়নি। আপনারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন যে, কুমিল্লায় কোনো নারী ধর্ষিত হয়েছে। আমি বলছি, হয়নি। সেটি আমরা বলেছি এবং সত্য কথা বলেছি। ১৭/১৮টা বাড়ি ভেঙে ফেলেছিল। সরকার সবগুলো বাড়ি মেরামত করে দিয়েছে, তাদের আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে। সেটাও আমরা বলেছি এবং সত্যি কথা বলেছি।’

ড. মোমেন বলেন, ‘কিন্তু এখানে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে অনেকে গল্প বলেছে, এটা খুবই দুঃখজনক। আমি যেটা করেছি, বিবেকের তাড়নায় করেছি। কিন্তু এটাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে, টুইস্ট করে আপনাদের কাছে বলা হয়েছে। আমি বলছি, কোথাও সত্যের অপলাপ হয়নি। জেনেশুনেও আপনারা যদি প্রতিক্রিয়া দেখান, তাহলে তো বড় মুশকিল।’

বিজ্ঞাপন

উসকানি না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন কাজ করব না, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এমন কোনো উসকানি দেব না, যাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমাদের প্রতিবেশি দেশে কিছু মসজিদ পুড়েছে। আমরা কোনোভাবে সেটা প্রচার করতে দিইনি। এর কারণ হচ্ছে কিছু দুষ্টু লোক আছে, কিছু জঙ্গি আছে যারা এটার বাহানায় আরও অপকর্ম করবে। আমরা এটা নিয়ন্ত্রণ করেছি। অনেকে আমাকে ভারতের দালাল বলে, কারণ অনেক কিছুই হয়, আমি স্ট্রং কোনো স্টেটমেন্ট দিই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংস খুনের আগে কত মিথ্যা প্রচার করা হয়েছিল। এভাবে একটি পরিস্থিতি তৈরি করে তারপর বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। এখনও আবার সেই ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন ধরনের লোক দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা শুরু করেছে, ‍উদ্দেশ্য অস্থিতিশীলতা। আপনাদেরও স্মরণ করা দরকার, শেখ হাসিনার সরকারকে টলানোর জন্য দেশকে যদি অস্থিতিশীল পথে নিয়ে যান, তাহলে আপনার-আমার প্রত্যেকের জন্য বিপদ। সেই বিপদ যাতে না আসে সেজন্য স্থিতিশীলতা চাই।’

বিজ্ঞাপন

ভারত সফরের প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছি, আমার দেশে কিছু দুষ্ট লোক আছে, কিছু উগ্রবাদী আছে। আমার দেশ সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন না। আপনার দেশেও যেমন দুষ্ট লোক আছে, আমাদের দেশেও আছে। কিছুদিন আগে আপনাদের দেশেও এক ভদ্রমহিলা কিছু কথা বলেছিলেন, আমরা সরকারের পক্ষ থেকে একটি কথাও বলিনি। বিভিন্ন দেশ কথা বলেছে, আমরা বলিনি। এ ধরনের প্রটেকশন আমরা আপনাদের দিয়ে যাচ্ছি। সেটা আপনাদের মঙ্গলের জন্য, আমাদের মঙ্গলের জন্য। আমরা যদি একটু বলি, তখন উগ্রবাদীরা আরও সোচ্চার হয়ে আরও বেশি বেশি কথা বলবে। তাতে ক্ষতিটা হবে কি? আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন হবে। আমাদের স্থিতিশীলতা বিঘ্ন হবে।’

মোমেন বলেন, ‘ভারতকে বলেছি, আমরা উভয়ে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডকে কখনও প্রশ্রয় দেব না। এটা যদি আমরা করতে পারি, ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়ের মঙ্গল। শেখ হাসিনা আছেন বলে ভারতের যথেষ্ঠ মঙ্গল হচ্ছে। বর্ডারে এক্সট্রা খরচ করতে হয় না। ভারতে ২৮ লাখ লোক আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর বেড়াতে যায়। ভারতের কয়েক লাখ লোক আমাদের দেশে কাজ করে। এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের সুন্দর অবস্থানের কারণে। সুতরাং, আমরা উভয়ে এমনভাবে কাজ করব যাতে কোনো ধরনের উসকানিমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। ভারত সরকারকে বলেছি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে যদি আমরা উভয়ে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিই।’

জন্মাষ্টমী উৎসবের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন- বাঁশখালীর সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, ঢাকা মহানগর জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক এস কে সিকদার, চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি দুলাল চন্দ্র দে ও সাধারণ সম্পাদক শংকর সেনগুপ্ত।

কালো পতাকা মিছিল

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চট্টগ্রামে আগমনের প্রতিবাদে নগরীর চেরাগি চত্বরে কালো পতাকা মিছিল ও সমাবেশ হয়। বুধবার বিকেলে অনুষ্ঠিত সমাবেশে রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বার বার দেশের বাইরে এই মর্মে প্রচার করেছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন নিয়ে গণমাধ্যমে যে প্রচার করা হয় বা হিন্দু জনগণ যে ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ করে সেইগুলো মিথ্যা। তিনি বার বার বলেছেন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন হয়নি, এদেশের সংবাদ মাধ্যম ও সংখ্যালঘুরা নির্যাতন নিয়ে মিথ্যাচার করে। হঠাৎ জানতে পারলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামের মানুষ কোনোভাবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর মেনে নিতে পারছে না। এই আগমনের বিরুদ্ধে যেই প্রতিবাদ সেই প্রতিবাদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ। আমরা মনে করি, এখনও সময় আছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুক। না হলে জাতিগত সংখ্যালঘুরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করবে এবং প্রতিরোধ করবে। অধিকারের প্রশ্নে আমরা কাউকে ছাড় দেব না।’

এ সময় চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত ও সাধারণ সম্পাদক অশোক দেব, চট্টগ্রাম মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিতাই প্রসাদ ঘোষ ও যুব ঐক্য পরিষদ নেতা রুবেল পাল।

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন