বিজ্ঞাপন

ভয়কে জয় করে ভ্যাকসিন নিল শিশুরা

August 25, 2022 | 10:07 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পাঁচ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের প্রথম দিন সকাল থেকেই নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে ছিল শিশু ও তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদের ভিড়।

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিন প্রয়োগের প্রথম দিন শুরুর দিকে ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে দেখা যায় বিভিন্ন কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত থাকা সংশ্লিষ্টদের। একইসঙ্গে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ফাইজারের তৈরি ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য আসা শিশু ও অভিভাবকদের চেহারায় উৎকণ্ঠার ছাপ থাকলেও ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হয়ে আসে। ভয় কাটিয়ে ভ্যাকসিন নিতে শুরু করে শিশুরা। বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর একাধিক কেন্দ্রে সরেজমিনে এ চিত্র দেখা যায়।

এ দিন সকালে রাজধানীর নীলক্ষেত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। রাজধানীর ২১টি কেন্দ্রসহ সারাদেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের ৫৫টি জোন ও ৪৬৫টি ওয়ার্ডে পাঁচ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের (প্রাথমিকের শিক্ষার্থী) টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগামী ১৪ দিন চলবে এ কার্যক্রম।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে রাজধানীর মহাখালীর আমতলী স্টাফ ওয়েলফেয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম শুরুর দিকে শিশুদের সঙ্গে অভিভাবকদের আসতে দেখা যায়। নিবন্ধন শেষে পাওয়া ভ্যাকসিন কার্ড নিয়ে কেন্দ্রে ভ্যাকসিন নিতে আসেন তারা। কেন্দ্রে ভ্যাকসিন প্রয়োগের জন্য শিশু স্কাউটের সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। এ সময় কেন্দ্রের শিক্ষকদের দেখা যায় কেন্দ্রের শৃঙ্খলা ধরে রাখার জন্য আহ্বান জানান শিশুদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদের প্রতি। নির্ধারিত শ্রেণিকক্ষে স্থাপন করা কেন্দ্রের ভেতরে দেখা যায় একজন মেডিকেল কর্মকর্তা ও দুজন স্বাস্থ্যকর্মী কাজ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মহাখালীরই আরেকটি কেন্দ্র আব্দুল হামিদ দর্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। তবে এ কেন্দ্রের বাইরের দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ভিড় দেখা যায় সরেজমিনে। একদিকে তীব্র গরম আর তার সঙ্গে রোদের তাপমাত্রায় শিশুদের নিয়ে একটু ছায়া খোঁজার চেষ্টা করতে দেখা যায় অভিভাবকদের। কেন্দ্রের সামনে এ সময় শিশু ও তাদের অভিভাবকদের কিছুটা ভিড় দেখা যায় তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন নিয়ে বাড়ি ফেরার তাগাদা থেকে।

বিজ্ঞাপন

আব্দুল হামিদ দর্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহীনা জান্নাতুল ফেরদৌস সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুই হাজার ৩৯০ জন শিক্ষার্থী আছে আমাদের বিদ্যালয়ে। হঠাৎ করেই আমাদের জানানো হয়েছে স্কুলে ভ্যাকসিন দেওয়ার বিষয়টি। সেজন্য আসলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সব দিক মিলিয়ে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। একাধিক ক্লাসরুমে ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও সেটা সম্ভব হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আজ প্রথম দিনেই ভ্যাকসিন নিতে আসবে প্রায় ৮০০ জন। একটি কেন্দ্রে এই শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেক শিশুর সঙ্গেই একাধিক অভিভাবক এসেছেন সাহস যোগাতে। এ কারণে কিছুটা জটলা দেখা যাচ্ছে। তবে স্কাউটরা চেষ্টা করে যাচ্ছে সর্বোচ্চ। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশা করছি সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে আরও।’

বিজ্ঞাপন

ভয়কে জয় করে ভ্যাকসিন নিল শিশুরা

পাশেই থাকা ঢাকা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. রাফি সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিটা কেন্দ্রেই আমাদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তারা সংখ্যায় সীমিত। ভ্যাকসিন প্রয়োগের জন্য যে শিশুরা আসছেন তাদের অনেকের এখনো নিবন্ধন শেষ হয়নি। স্কাউটের যারা আছেন তারাও কিন্তু বেশি বয়সী না। সব মিলিয়ে শুরুর দিকে কিছুটা ভিড় বেশি বলেও মনে হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘দৈনিক গড়ে ৩০০ ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়ার বরাদ্দ থাকলেও এখানে তার চাইতে বেশি উপস্থিতি আছে। অনেকে আসছে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে। তাও আমরা অতিরিক্ত ভ্যাকসিনের চাহিদা জানিয়েছি কর্তৃপক্ষকে। এক্ষেত্রে কিছু সময় হয়তোবা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আর সেজন্যেই ভিড় বেশি মনে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে কিন্তু বেশি সময় লাগে না। কিন্তু যারা এখানে এসেছেন তাদের নিবন্ধন করা ভ্যাকসিন কার্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু ভুল থেকে যায়। সেগুলো শুধরিয়ে এরপরে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। তবে আশা করছি সবকিছু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’

ভ্যাকসিন কেন্দ্রের বাইরেই অপেক্ষা করতে দেখা যায় সুমি ইসলাম নামে ৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে। বাবা ও মাকে নিয়ে আসা সুমি ইসলাম কিছুটা ভীত হওয়ার কারণে সাহস যোগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন স্কাউটের সদস্যরা। সঙ্গে বাবা ও মা দুইজনেই সাহস যুগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত।

সুমির বাবা ফজল চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতরাত থেকেই বলছিল ভ্যাকসিন নিবে। কিন্তু আজ স্কুলের আসার পরে দেখি কিছুটা ভয় পাচ্ছে। অন্যদের ভ্যাকসিন নিতে দেখে ভয়টা আরও বেড়ে যায়। এজন্য এখন বোঝাতে হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি তার ভয় কাটানোর জন্য। কারণ কোভিড প্রতিরোধে ভ্যাকসিনটা আসলে নিতেই হবে।’

একই কেন্দ্র থেকে ভ্যাকসিন গ্রহণ শেষ বের হয়ে আসার পথেই কথা হয় ৯ বছর বয়সী শিশু আহনাফের সঙ্গে। আহনাফ বলে, ‘শুরুতে ভয় লাগলেও টিচার বলেছে চকলেট দিবে। ডাক্তার আঙ্কেলও বলেছে ভয়ের কিছু নেই। এরপরে একটা ফুটা দিল আর বলল ভ্যাকসিন নেওয়া শেষ। এখন ভালো লাগছে।’

সরেজমিনে রাজধানীর মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপন করা কেন্দ্রে দেখা যায় ভ্যাকসিন প্রয়োগ শেষে শিশুদের জন্য চকলেট বরাদ্দ রাখতে।

এ দিন মহাখালীর আমতলী স্টাফ ওয়েলফেয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে আসেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খোরশেদ আলম।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন নিতে পারবে। শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ফাইজারের ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করেই শিশুদের করোনা ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হচ্ছে। সবাইকে দ্রুত নিবন্ধন করে শিশুদের জন্য ভ্যাকসিন গ্রহণের আহ্বান জানাই।’

এ দিন সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘১৮৬টি কেন্দ্রে শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমরা দেশবাসীকে বিশেষ করে অভিভাবকদের আহ্বান করছি, তারা যেন ৫-১১ বছরের শিশুকে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসেন ও ভ্যাকসিন দেন।’

তিনি বলেন, ‘টিকাপ্রাপ্তি সাপেক্ষে আমরা সারাদেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করব। তবে এটা চলমান থাকবে। এক ডোজ করে যদি দিই তাহলে আমাদের প্রায় আড়াই কোটি টিকা লাগবে। যেটা আমরা পর্যায়ক্রমে পাব। আর কার্যক্রম চলমান থাকবে। এ মুহূর্তে আমাদের হাতে ৩০ লাখ ভ্যাকসিন রয়েছে। আরও এক কোটি ভ্যাকসিনের প্রতিশ্রুতি পেয়েছি।’

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের ন্যায় বাংলাদেশ সরকার দেশের কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করে ২৫ আগস্ট থেকে ৫-১১ বছর বয়সী শিশুদের কোভিড-১৯ টিকাদানের আওতায় আনতে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে এ শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। পরে জেলা, উপজেলা ও পৌরসভাগুলোতে স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে এ ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে শিশুদের জন্য প্রথম পর্যায়ে ৩০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেশে এসে পৌঁছেছে।

সারাবাংলা/এসবি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন