বিজ্ঞাপন

প্রকৃতির খুনসুটি: বন্যা-খরার বিশ্বখেলা

September 12, 2022 | 2:13 pm

মোস্তফা কামাল

একই সময়ে একদিকে ঝড়-বৃষ্টি, আরেকদিকে রোদের তেজ। আবহাওয়া ঋতুবৈচিত্রের ধার ধারছে না। মানছে না পঞ্জিকা। বাংলাদেশসহ দেশে-দেশে ঋতুচক্র এখন কেবলই পাঠ্য, বাস্তব নয়। সারাবিশ্বেই আবহাওয়ার এ মতিগতি বদল। কেবল নতুন চরিত্র নয়, প্রকৃতি চরিত্রহীনতায় চলে গেছে। আবহাওয়ার রীতিনীতি বদলে কোথাও অসময়ে বন্যা। কোথাও শীতেও গরম। দিনের পর দিন তাপদাহ-দাবদাহ। ছড়িয়ে পড়ছে দাবানলও। আগুনে বা বানে বিরান ভূমিতে পরিণত হচ্ছে মাইলের পর মাইল।

বিজ্ঞাপন

প্রকৃতির এমন চরিত্রকে এক কথায় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফল বলছেন আবহাওয়াবিদরা। আলামত দেখে তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেন। বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেন, কিন্তু দেখা দেয় রোদের রুক্ষতা। রোদের আভাস দিলে নামে বৃষ্টি। নানান যদি, কিন্তু, তবে যুক্ত করে দেয়া আভাসও মার খেয়ে যাচ্ছে। মান হানিকর অবস্থায় পড়ছেন আবহাওয়াবিদরা। তাদের কথায় বিশ্বাস না করার অবস্থান এখন কম-বেশি প্রায় সব দেশেই।

বাংলাদেশে এবার স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টি খুব কম হয়েছে। এর জেরে কোথাও কোথাও বন্যার মাঝেও তীব্র বা ভ্যাপসা গরমে পুড়তে হচ্ছে মানুষকে। ধর্মাশ্রয়ীদের কাছে এটি আজাব-গজব। বিজ্ঞানমনস্কদের কাছে প্রকৃতির খেয়াল। প্রতিবেশি বিশাল রাষ্ট্র ভারতের মানুষ একই সময়ে একেক রাজ্যে একেক অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানি নেমে গেলেও আসামসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকা এখনো পানির নিচে। তাদের প্রতিবেশি চীনে তীব্র খরা ও রেকর্ড ভাঙা দাবদাহের মধ্যে বন্যা। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার মধ্যেই সময়েই মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চণ্ডাল খরা। তীব্র খরা মোকাবেলায় দেশের কিছু এলাকায় কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরানোর চেষ্টা করছে চীন সরকার। কিন্তু, সাফল্য মিলছে না। হুবেইসহ বেশ কয়েকটি প্রদেশে রকেটের মাধ্যমে আকাশে রাসায়নিক ছিটানো হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

চীনের চিংহাই প্রদেশের দাতং কাউন্টির পার্বত্য অঞ্চলে গেল সপ্তাহে আঘাত হানে বন্যা। ব্যাপক প্রাণহানি ছাড়াও বানের তোড়ে ছারখার হয়ে গেছে রাস্তাঘাট। বসতবাড়িসহ গাছপালা উপড়ে গেছে। চীনের জলবিদ্যুতের জলাধারগুলোর পানি অর্ধেকে নেমে গেছে। কমে গেছে এশিয়ার দীর্ঘতম জলপথ ইয়াংজি নদীর পানি। নদীটির কোনো কোনো অংশে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদক কোম্পানিগুলো। সিচুয়ান প্রদেশে বিদ্যুত্সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমানো বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ জলাধারের পানি নেমে গেছে অর্ধেকে।

একই সময়ে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় দুমড়েমুচড়ে গেছে পাকিস্তান। বছরের শুরুতে খরা ও দাবদাহের ক্ষত না কাটতেই এখন দেশটির ৩ কোটিরও বেশি মানুষ বন্যাবন্দি। পাকিস্তান সরকারকে জরুরি অবস্থাও জারি করতে হয়েছে। খরার প্রভাব শিথিলের পর জুন থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যার প্রকোপ শুরু হয়। পাকিস্তানের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ-এনডিএমএ’র হিসাবে এ বন্যায় মৃত্যু হয়েছে প্রায় এক হাজার মানুষের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪২ লাখ মানুষ। বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজারের মতো।

বিজ্ঞাপন

দেড় বছরে চারবারের মতো বন্যা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে সিডনিকে। জুলাইর শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে বন্যা দেখা দেয়। মাত্র চার দিনে আট মাসের সমান বৃষ্টিতে সড়কগুলো নদীতে পরিণত হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষকে বাড়ি থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ৮৬ শতাংশ ভুগছে খরায়। ব্রাজিলে নিয়মিত ভূমিধস। প্রবল বৃষ্টির পর ভূমিধস এবং বন্যায় মে মাসে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্নাম্বুকো রাজ্যে অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। অন্তত ১০০ জন প্রাণ হারিয়েছে এই দুর্যোগে। জাতিসংঘের সংস্থা আইপিসিসি পার্নাম্বুকোর রাজধানী রেসিফের আশপাশের নিচু মেট্রো অঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।

সাউথ আফ্রিকায় অতিবৃষ্টির চরম রূপ নিয়েছে। সাউথ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে ভারি বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধস হয়। এতে চার শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, ধ্বংস হয়েছে অন্তত ১২ হাজার বাড়িঘর। অন্তত ৪০ হাজার মানুষকে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যেতে হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের হিসাবে, সাউথ আফ্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে আর ঘনত্ব আট শতাংশ বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে ক’দিন পর পরই দাবানলৈর খবর। মৌসুম শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্র দাবানলে পুড়তে শুরু করেছে। জুলাইয়ের শুরুতেই উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু অঞ্চলে আগুন লাগে। রাতারাতি তা দ্বিগুণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রাজ্যের আরও কিছু অঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। কাছাকাছি সময়ে দাবদাহে পুড়ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। প্রথমে ইউরোপের দু-একটা দেশ দিয়ে শুরু হয়ে খুব অল্প সময়েই ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। ইউরোপ-আফ্রিকা-এশিয়া। বাদ নেই বিশ্বের কোনো অঞ্চল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইউরোপ। আবহাওয়ার এমন বিরূপ প্রভাবের জন্য বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ই দায়ী বলে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জুন মাস থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হওয়া এই দাবদাহ আরও বিস্তৃত রূপ ধারণ করেছে জুলাই মাসে। গরম কমার বদলে প্রতিদিন যেন বেড়েই চলেছে উলটো। মাত্রাতিরিক্ত গরমে কাহিল দেশগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের প্রায় অর্ধেক ৪৬% ভূখণ্ড অতি খরার ঝুঁকিতে। অবস্থার উন্নতি না হলে মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। ২৫০টি নতুন দাবানলের অ্যালার্টে অস্থির পর্তুগাল। স্পেনের ৩০টি অঞ্চল পুড়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানলে এ সব অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক বন-বনানী পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ইতালির অবস্থাও ভয়াবহ। তীব্র খরায় দেশটির মাটি ফেটে চৌচির। মাসের পর মাস বৃষ্টি না হওয়ার কারণে শুকিয়ে গেছে দেশটির সবচেয়ে বড় নদীর বিভিন্ন অংশ।

বিজ্ঞাপন

পরিস্থিতি সামলাতে ইতালির সরকার দেশটির প্রায় ১৭০টি পৌরসভা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পানির ওপর। পানি ব্যবহার করতে দেয়া হয় কেবল খাদ্য, ঘরের কাজ এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কাজে। বাগান, উঠান কিংবা গাড়ি ধোয়ার জন্য পানি ব্যবহার করা দণ্ডনীয়। দাবানলে ১১ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে ফ্র্যান্সে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ১৫টি অঞ্চলের ওপর রেড অ্যালার্ট জারি করেছে দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর।

যুক্তরাজ্যে রেড অ্যালার্ট তুলে নেয়া হলেও অবস্থা এখনো স্বাভাবিক নয়। উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায় দাবানলের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে খেতের ফসল। কিছু দিন আগেই তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়ায় ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। দেশটির ৪০ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এটি। ইরানে জুনের পরে জুলাই মাসেও কমছে না গরম। মধ্যপ্রাচ্য, জার্মানি, বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশেও দেখা যায় অসহনীয় গরম।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, খরা, ঝড়, দাবানল, ভূমিধসের তোড়ের মধ্যে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলক ভালো আছে। তবে, লক্ষণ সুবিধার নয়। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি বা বন্যা, শিলাবৃষ্টি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, মরুকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, নদী ভাঙন অনেক বেড়ে গেছে। প্রকৃতিতে আবহাওয়ার বৈরী আচরণ দিনকে দিন কেবল রুক্ষই হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন