বিজ্ঞাপন

মন্ত্রী-নেতাদের বেফাঁস কথা এবং দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানতে হবে

September 18, 2022 | 3:23 pm

সাজ্জাদ কাদির

দেশে যখন সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে চলে আসে তখন সবকিছুতে যেন এক ভারসাম্যহীন টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করে।সেটা সরকারের মন্ত্রীদের আচরণ, কথাবার্তা থেকে শুরু করে, শান্তি শৃঙ্খলা,দ্রব্যমূল্য সব জায়গায় পরিলক্ষিত হয়। এর কারণ কী হতে পারে? সরকার পরিচালনায় রাজনীতিবিদ যারা থাকেন তারা শেষ দিকে এসে কী আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন? হতে পারে। আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদ সরকার পরিচালনা করছে। আবারও রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখে। সুশাসন দিতে পারলে আসতেই পারে। দোষের কিছু নেই। কিন্তু এই অভাগা দেশে আওয়ামী লীগের তিন মেয়াদের সরকারের কাছ থেকে দেশের জনগণ কতটা সুশাসন পেয়েছে সে বিষয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। হ্যাঁ একথা স্বীকার করতে হবে যে আওয়ামী লীগ অর্থনৈতিক, অবকাঠামো এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যথেষ্ট অগ্রগামী। কিন্তু একই সাথে বলতে হবে উন্নয়ন আছে সুশাসন নেই। আবার আর একটি উল্লেখযোগ্য দল বিএনপির উপর ভরসা করার মত গঠণমূলক মাঠের রাজনীতিও চোখে পড়েনি গত প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতার বাহিরে থাকা রাজনৈতিক দলটির। অতীতে সরকার পরিচালন কর্মকাণ্ড বিবেচনা করলে আরও ভরসা করা যায় না বিএনপিকে।

বিজ্ঞাপন

সরকারের শেষ মুহূর্তে এসে প্রায় প্রায়ই মন্ত্রী-নেতাদের কথাবার্তা হাসির খোরাক যোগাচ্ছে, সরকারকে বিব্রত করছে এবং জনরোষ তৈরী করছে। এই যেমন সম্প্রতি বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দরে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের মধ্যেই কিছুদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সুখে আছে, বেহেশতে আছে’। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির এই সময়ে মানুষ পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছে। কোন কথা কোন সময়ে বলতে হয় সেই কাণ্ডজ্ঞান নেই যার তার রাজনৈতিক, কুটনৈতিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঠিক এর ক’দিন পরে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের মাত্র ক’দিন আগে আবার এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, আমি ভারতবর্ষের সরকারকে সেটা করতে অনুরোধ করেছি’। নির্বাচনের দেড় বছর আগে এটি একটি বড় ধরণের বেফাস মন্তব্য। বাংলাদেশের সরকার পরিচালনায় কে আসবে আর কে যাবে এটা কী ভারত নির্ধারণ করে দিবে? দেশের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এসব মেরুদণ্ডহীন কথাবার্তা সরকারের জন্য দারুণ বিব্রতকর। এই মুহূর্তে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ পদধারী দায়িত্বশীল ব্যক্তির এভাবে কথা বলে সরকারকে বিব্রত করার হেতু কী? তার এসব কথায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সরকারের উপর মানুষ ক্ষব্ধ হয়েছে। মানুষের মনে প্রশ্নে উদ্রেক করছে সরকার পরিচালনায় কারা আছে? বিতর্ক যখন চলছে তারই মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেছেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন দলের কেউ নন’। আর এক হাস্যকার কথা। মোমেন যদি দলের কেউ না হন তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হলেন কী করে? পররাষ্ট্র মন্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন কী করে? বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য না দিয়ে বিষয়গুলোর পরিস্কার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। দলগতভাবে আওয়ামী লীগ এই জায়গাটিও পরিস্কার করতে পারছে না। অবশ্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বিষয়টি সুন্দর করে ব্যখ্যা দিয়েছিলেন তার এক বক্তব্যে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমানের এ মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ড. হাছান বলেছিলেন, ‘আব্দুল মোমেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য অবশ্যই, কিন্তু তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তো কেউ নন। তাই তার সাম্প্রতিক বক্তব্য (শেখ হাসিনার প্রতি ভারতীয় সমর্থন চাওয়া) দলীয় বক্তব্য নয়।’ কথা ক্লিয়ার। অর্থাৎ মোমেন অযাচিতভাবে এসব কথা বলেছেন বিষয়টি এমনই দাঁড়ায়।

মোমেন সাহেবের মত এসব উড়ো টাইপের বক্তাকে রুখতে সরকার প্রধান এবং আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার উচিত হবে সকল মন্ত্রী-নেতাদের জিহ্বা সংবরণ করার নির্দেশ দেওয়া। নিজ মন্ত্রণালয় এবং দলীয় নিজ পদের দায়িত্বের বাহিরে কেউ কোন কথা বলতে পারবে না। বল্লেই তাকে জবাবদিহিতায় আনতে হবে। সরকার এবং দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ভাবমূর্তিক্ষুন্নকারী কথা যথেষ্ট আমলে নিয়েছিলেন বলেই মনে হয়। যার কারণে সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে নজিরবিহীনভাবে শেষ মুহূর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাদ দিয়েছিলেন। সরকার প্রধান বিদেশ সফরে যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর সঙ্গী থাকবেন না এমনটা রেওয়াজ নেই। যা দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম। এমনকি ভারতে চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রীদের দেখা গেলেও দেখা যায়নি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনকে।

বিজ্ঞাপন

কথা হচ্ছে- মন্ত্রণালয় এবং দলীয় নিজ পদের দায়িত্বের বাহিরে কেউ কোন কথা বলতে না পারলে সরকারের বিভিন্ন বিষয় এবং একই সাথে দলীয় বিষয় জনগণকে অবহিত করবে কে? এই অবহিত করার জন্য সরকার এবং দলের পক্ষ থেকে একজন করে মোট দুজন মুখপাত্র নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকের পরে যেমন করে মন্ত্রী পরিষদ সচিব বৈঠকের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অবহিত করেন ঠিক তেমনিভাবে সার্বিক বিষয়ে সপ্তাহে একদিন বা দুইদিন নিয়োজিত দুই মুখপাত্র প্রেস মিট করে সরকার এবং দলের সার্বিক কর্মপরিকল্পনা অবহিত করবেন। এতে করে কোন বিভ্রান্তি সৃষ্টির অবকাশ থাকবে না।

বিশ্বব্যাপী পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়া, ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ধাপে ধাপে না বাড়িয়ে হঠাৎ করে এক লাফে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং এরই প্রভাবে বলি আর অজুহাতে বলি দ্রব্যমূল্যের নাভিশ্বাস। অজুহাতে এই কারণে বলছি যে খবরে প্রকাশ জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে চালের কেজিতে বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ৭০ পয়সা সেখানে চালকল মালিকরা বাড়িয়েছে কেজিতে ৫ টাকা। আবার ডিমের দাম হালিতে বাড়তে পারে ১০-১৫ পয়সা সেখানে ডিম সিন্ডিকেট বাড়িয়েছিল হালিতে ১০ টাকা। সরকারের হুমকি-ধমকিতে ডিমের দাম একটু কমলেও ক’দিন হল আবারও চোখ রাঙাচ্ছে। শুধু চাল, ডিমই নয় এমন করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম যতটা না জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে বেড়েছে তার চাইতে ঢের বেশি অজুহাতেই আকাশ ছুঁয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে ব্যবসা করতে আসা বিদেশি কোম্পানিগুলোও কম যায় না। উদহারণস্বরূপ ইউনিলিভারের প্রতিটি পণ্য মূল্য আকাশ ছোঁবার কথা বলা যায়। বাংলাদেশে শুধুমাত্র একটি অজুহাত দরকার তাহলেই খবর আছে। কারণ এখানকার ব্যবসায়ীদের কোন প্রকার নীতি-নৈতিকতা নেই। এজন্যই সবক্ষেত্রে সরকারকে নজর দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

বিজ্ঞাপন

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে বাজার মনিটরিংয়ে বিচারিক ক্ষমতাসহ একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠণ করা যেতে পারে। হতে পারে সেটি সেনাবহিনীর একজন মেজর জেনারেল/লেফটেনেন্ট জেনারেলের নেতৃত্বে। কারণ একমাত্র এই বাহিনীর প্রতিই মানুষের আস্থা, বিশ্বাস, ভয় সবটাই আছে। এই টাস্কফোর্সের নেটওয়ার্ক সারা দেশেই থাকতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে এমনকি খোলা বাজারে ডলার, শেয়ার মার্কেটের মূল্য কোথাও কোন অসংগতি দেখলেই সাথে সাথে কারসাজিকারীকে প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই যদি সম্ভব হয় দেশের মানুষের কষ্ট লাঘব করা। কারণ কোন কিছুতেই যে কিছু হচ্ছে না। এই কিছু না হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ হচ্ছে- আমাদের মানবিক মানুষ তৈরী করতে না পারা।

লেখক: নির্মাতা, উপস্থাপক, কলামিস্ট ও লেখক

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন