বিজ্ঞাপন

গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণ: পুলিশের অজ্ঞতাকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা

September 21, 2022 | 12:53 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘পুলিশের দায়িত্ব চিঠি দিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করা এবং যারা গ্যাস বেলুন ফোলায় তাদের ধরা। কিন্তু সেই পুলিশ কিভাবে ওই হাইড্রোজেন গ্যাসের বেলুন ব্যবহার করে!— এটা কোনোভাবেই মাথায় আসছে না। এটা অজ্ঞতা ও পাগলামি ছাড়া কিছুই না। হাইড্রোজেন গ্যাস এমনিতেই অতিমাত্রায় দাহ্য। সেখানে কেউ আগুন লাগিয়ে থাকলে তো অতিমাত্রায় বিস্ফোরণ ঘটবেই। আর এমন ঘটনাই ঘটেছে গাজীপুরে।’— এভাবেই বলছিলেন বিস্ফোরক অধিদফতরের সাবেক প্রধান বিস্ফোরক কর্মকর্তা শামসুল আলম।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শামসুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০১৭-১৮ সালের দিকে আমরা থানাগুলোকে চিঠি দিয়েছিলাম। বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে সিলিন্ডারে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদন করে এক শ্রেণির লোক। পরে ওই গ্যাস দিয়ে বেলুন ফুলিয়ে বিক্রি করে থাকে অনেকেই। এই গ্যাস বেলুনে ভরার ফলে ওই বেলুনের গায়ে এক ধরনের বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়ে থাকে। এর পর যদি এক বেলুনের সঙ্গে আরেক বেলুনের ঘর্ষণ হয় তাতে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বেলুনের ভেতরে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরপুর থাকায় তা অতিমাত্রায় বিস্ফোরণে রূপ নেয়।’

তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণে ছয় থেকে সাত হাত এলাকায় আগুনের ফ্লাশ তৈরি হয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, সিলিন্ডারের-ই বিস্ফোরণ ঘটে। তখন এর ভয়াবহতা অনেক বেশি হয়। এজন্য আমরা পুলিশকে চিঠি দিয়ে বলেছিলাম। চিঠিতে বলা হয়েছিল, গ্যাস বেলুনের উৎপাদন বন্ধ করতে হবে এবং কাউকে গ্যাস দিয়ে বেলুন ফোলাতে দেখলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। হাইড্রোজেন গ্যাস বেলুন যাতে কেউ তৈরিও করতে না পারে সেজন্য পুলিশকে প্রতিরোধ করতে বলা হয়েছিল।’

বিজ্ঞাপন

শামসুল আলম বলেন, ‘তবে কেউ চাইলে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করতে পারে। হিলিয়াম গ্যাসেও বেলুন ওড়ে। সেটি দাহ্য নয়। বেলুন ফেটে গেলেও আগুন ধরবে না, বিস্ফেরণ ঘটবে না। পুলিশের সতর্ক থাকা উচিত ছিল। পুলিশই যদি অজ্ঞের মতো কাজ করে তাহলে সাধারণ মানুষ তো আরও বুঝবে না। গাজীপুরে হাইড্রোজেন গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে।’

গ্যাস বেলুনগুলো বার বার উড়িয়ে দেওয়া হলেও সেগুলো উড়ছিল না— এর কারণ জানতে চাইলে সাবেক বিস্ফোরক কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো একটি বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস অথবা হিলিয়াম গ্যাসের পরিবর্তে বাতাস ঢুকানো ছিল। একটি বেলুনেও যদি বাতাস থাকে তাহলে সেগুলো আর উড়বে না। কারণ, বাতাস ঢুকানো বেলুনের সঙ্গে হাইড্রোজেন গ্যাসের বেলুনগুলো বাঁধা ছিল। এক্ষেত্রে বাতাস ঢুকানো বেলুনটি আলাদা করলেই বাকিগুলো উড়তো।’

বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সময়ে এক পুলিশ সদস্য ও বেলুনওয়ালা মিলে বেলুন বাঁধা সুতায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, যাতে বেলুনগুলো উড়ে যায়। আসলে কি তাই? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাগলামি ছাড়া কিছুই নয়। অজ্ঞতা ছাড়া কিছু নয়। হাইড্রোজেন গ্যাসের সামনে যখনই আগুন ধরেছে তখনই ওটা ভয়াবহ আকারে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ফলে আশেপাশে যারাই ছিল সকলেই দগ্ধ হয়েছেন। কারণ কয়েক হাত এলাকা জুড়ে আগুনের ফ্লাশ তৈরি হয়েছিল।’

পুলিশ কেন এটি করল? এখানে প্রশিক্ষণের কি অভাব রয়েছে? জানতে চাইলে সাবেক বিস্ফোরক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি প্রশিক্ষণ তো বটেই। তবে সাধারণ সেন্স থাকাটাও জরুরি। প্রাকটিক্যাল প্রশিক্ষণে হয়তো এটি নাও শেখানো হতে পারে। তবে সাধারণভাবেও এটি সবার জানা থাকা জরুরি। এক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদফতরের সারাদেশে আরও বেশি সচেতনতা ক্যাম্পেইন বাড়ানো দরকার বলে মনে করি।’

বিজ্ঞাপন

গত ১৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) চার বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে উদ্ধোধনী মঞ্চের পাশে একগুচ্ছ গ্যাসের বেলুন বিস্ফোরণে কৌতুক অভিনেতা আবু হেনা রনি ও পুলিশের চার সদস্য দগ্ধ হন। গাজীপুর জেলা পুলিশ লাইনস মাঠে বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান ও নাগরিক সম্মেলন শুরুর আগে এ ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে দগ্ধরা হলেন- কৌতুক অভিনেতা আবু হেনা রনি (৩০), পুলিশ সদস্য মোশারফ হোসেন- রুবেল মিয়া, জিল্লুর রহমান ও ইমরান হোসেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, জিএমপির চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার গাজীপুর পুলিশ লাইনস মাঠে নাগরিক সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়াপ্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আখতার হোসেন। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিদের উদ্বোধনী মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রধান অতিথির হাতে একগুচ্ছ বেলুন দেওয়া হয়। কিন্তু বার বার চেষ্টা করলেও বেলুনগুলো উড়ছিল না। পরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে সেই বেলুনগুলো মঞ্চের পেছনে ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের সামনে নিয়ে যান। পরে পায়রা উড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্য অতিথিরা অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চে চলে যান।

কিছুক্ষণ পর কয়েকজন পুলিশ সদস্য বেলুন বিক্রেতাকে বকাঝকা করলে বেলুন বিক্রেতা নিজেই আগুন লাগিয়ে ফেস্টুনের সুতা বিছিন্ন করে বেলুনগুলো ওড়ানোর চেষ্টা করেন এবং এ সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে পাশে বসে থাকা কৌতুক অভিনেতা আবু হেনা রনিসহ পাঁচ জন দগ্ধ হন। এ সময় আশপাশের পুলিশ সদস্যরা তাদের গায়ে পানি ঢেলে আগুন নেভান। পরে তাদের গাড়িতে করে দ্রুত শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে কয়েকজনকে ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

কৌতুক অভিনেতা ও পুলিশ সদস্য দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছে— তাহলে পুলিশের কি প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ঢাকা মেট্টো) দেবাশীষ বর্ধন সারাবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশের অনুষ্ঠানে হাইড্রোজেন গ্যাস সম্বলিত বেলুন ব্যবহার করাই উচিত হয়নি। পুলিশের দায়িত্বশীল কাউকে এ বিষয়ে কেয়ার করার দরকার ছিল। যে বেলুনগুলো ব্যবহার করা হবে সেগুলো হিলিয়াম নাকি হাইড্রোজেন গ্যাস দিয়ে তৈরি হবে— তা তদারকি করা দরকার ছিল। ওখানে গ্যাস বেলুন তৈরি করে এমন একজনকে সিলিন্ডারসহ ডেকে আনা হয়েছিল বলে জানা গেছে। কাজটি সঠিক হয়নি।’

যদিও পুলিশ বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলা করেছে। তবে সাধারণ মানুষ মামলার চেয়ে এ ধরনের গ্যাস সিলিন্ডার উৎপাদন বন্ধ এবং যারা বেলুনে গ্যাস ভরে বিক্রি করে তাদের নিবৃত করতে বলছেন। না হলে ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এর আগেও ঢাকাসহ সারাদেশে এরকম বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনায় শিশুসহ অনেকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন