বিজ্ঞাপন

পোশাক রফতানিতে হোঁচট, সূচক উল্টোপথে

September 22, 2022 | 7:29 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: করোনাভাইরাস পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠেলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ফের অস্থিরতায় পুরো বিশ্ব। আর এই অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এবার সেই শঙ্কা সত্য প্রমাণিত হলো। ক্রমাগত প্রবৃদ্ধির পথে থাকা অর্থনীতির এই সূচক এবার উল্টোপথে হাঁটছে। দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক রফতানিতে এবার হোঁচট খেঁয়েছে বাংলাদেশ। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৮ দিনে পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। মাস শেষ হলে এই অংক আরও বাড়তে পারে। আর আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক রফতানি হ্রাসের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা খাত সংশ্লিষ্টদের।

বিজ্ঞাপন

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৮ দিনে ১৭২ কোটি ২৩ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অর্থাৎ চলতি মাসের প্রথম ১৮ দিনে পোশাক রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০২০ সালে কারোনা মহামারি মধ্যে পোশাক রফতানি তলানিতে ঠেকে। ওই বছরের প্রথম ১৮ দিনে ১১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পোশাক রফতানি হয়েছিল। সেই তুলনায় ২০২২ সালে রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

এদিকে, গেল ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের ক্লাবে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। একক মাস হিসাবে চলতি বছরের জুনে দেশের রফতানি আয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের (৪৯০) চূড়ায় পৌঁছায়। পরের মাস জুলাই অর্থাৎ চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাসে রফতানি আয় কমে ৩৯২ কোটি ডলারে ঠেকে। আর আগস্টে ৪৬০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। তবে জুলাই ও আগস্ট দুই মাসেই দেশের রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে এসে অন্যতম প্রধান খাত পোশাক রফতানিতে হোঁচট খেয়েছে বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

প্রসঙ্গত, গেলে কয়েক মাস ধরেই পোশাকের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) কমছে বলে জানিয়ে আসছিলেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের কেউ কেউ বলছিলেন, ক্রয়াদেশ কমেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। আবার কেউ কেউ বলেছিলেন, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্ডার কমেছে। খাতটির শীর্ষ নেতারা কয়েক মাস ধরেই বলে আসছিলেন, সেপ্টেম্বর থেকে দেশের রফতানি আয় কমতে শুরু করবে। ইপিবি থেকে পাওয়া এক তথ্যে সেই শঙ্কারই প্রমাণ মিলেছে।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজীম সারাবাংলাকে বলেন, ‘জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় ৮০০ মিলিয়ন ডলার কমবে বলে ধারণা করছি। আর গত মাসের তুলনায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার কমতে পারে। জুনে আমাদের রফতানি আয় ছিল ৪ বিলিয়ন ডলার। গত মাসে তা ছিল ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরে তা ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নামতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩০ শতাংশ ক্রয়াদেশ কমে গেছে। বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা আগের চেয়ে পণ্য কম নিচ্ছে। রফতানি আয় কমার এই প্রবণতা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’

এ প্রসঙ্গে দেশের নিট গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় অনেক কমবে। গত মাসে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশ। আমি মনে করছি, এই মাসে কোনো প্রবৃদ্ধি হবে না। কারণ গ্যাস সংকটের কারণে রফতানিমুখী খাত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ঠিকভাবে উৎপাদন কাজ চালাতে পারিনি।’

বিজ্ঞাপন

আর বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘রফতানি আপাতত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নিম্নমুখী হবে বলে ধারণা করছি। করোনার পরে এখন কিছু ক্রয়াদেশ (অর্ডার) আসছে। তবে জুনের পর থেকে অর্ডার সবচেয়ে কম গতিতে আসছে। অর্থাৎ এখন ক্রয়াদেশের গতি খুবই স্লথ।’

বিজিএমইএ’র পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই রফতানি আয় তুলামূলকভাবে কমছিল। কারণ জুন পর্যন্ত যে আয় হয়েছে, মাসভিত্তিক হিসাবে পরের দুই মাসে রফতানি আয় তার চেয়ে কমেছে। যদিও আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করলে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রফতানি আয় নেগেটিভের দিকে রয়েছে। আমরা ধারণা করছি আগামী কয়েক মাস এটি আরও কমবে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্বেই প্রভাব পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় পোশাকের চাহিদা কমছে। আমরা চেষ্টা করছি ইউরোপ আমেরিয়া যা কমেছে অন্য বাজারে রফতানি বাড়িয়ে সেটা স্বাভাবিক রাখতে।’

মন্তব্য জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘পোশাকসহ দেশের রফতানি আয় কমছে। ২০ থেকে ২২ শতাংশ অর্ডার ড্রপ করেছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে ক্রেতারা সতর্কতা অবলম্বন করছে। নভেম্বর থেকে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের কারণে পোশাকের চাহিদা আরও কমতে পারে। তখন রফতানি আয় আরও কমে যাবে।’

পোশাকের রফতানি মাত্র কমা শুরু করেছে। আগামী কয়েক মাস ধরেই সেটি কমবে এবং ক্রমান্বয়ে এই প্রবণতা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

সারাবাংলা/ইএইচটি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন