বিজ্ঞাপন

বেলাল চৌধুরীর শিল্পের নিরিখ

April 26, 2018 | 3:50 pm

ওবায়েদ আকাশ ।।

বিজ্ঞাপন

জীবনের শেষ দিনগুলিতে ছিল না কোনো মুখরতা, সরবে নয়, একপ্রকার নিভৃতবাসে বসেই কাজ করে যাচ্ছিলেন কবি বেলাল চৌধুরী। যৌবনের সেই উন্মাতাল দিনগুলি পাড়ি দিয়ে সমসাময়িক বেলাল চৌধুরী যেন মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত পাতা পড়ার শব্দের মতো এদিক-ওদিক নিজের লক্ষ্যের দিকে হেঁটেছেন। তেমন একটা দেখা যায়নি বন্ধু মহলে, আড্ডায়, উৎসব ঘটনায়। হয়তো এ ছিল তাঁর এক স্বেচ্ছা নির্বাসন নিজ বাসভূমে। নীরবে কাজ করেছেন সংবাদপত্র কিংবা সাহিত্য সম্পাদনার অন্য কোনো মাধ্যমে। আর ঘরে বসে আমগ্ন ডুবে থেকেছেন লেখালেখিতে। কিন্তু তাই বলে কি তাঁর মতো মানুষ একা জীবন যাপন করতে পারেন! একাই সব স্বার্থপরের মতো চালিয়ে যেতে পারেন? না তা কখনোই ঘটবার নয়। তিনি কিন্তু বন্ধু হিসেবে হাতের কাছেই বসিয়ে রাখতেন চণ্ডীদাস, ভারতচন্দ্র, বঙ্কিম, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সতীনাথ, কমলকুমার কিংবা বিনয়-শামসুরের মতো মহত্ত্বম ব্যক্তিকে। ইচ্ছে হলেই তাঁদের সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে ফেলতেন। কিংবা দূরের কাফকা, মার্কেজ, এলিয়ট, গ্যেটে, র‌্যাঁবো কিংবা ভেরলেন, ফুয়েন্তেসের মতো কাউকে ইচ্ছে হলেই নিজের মুখোমুখি বসিয়ে আড্ডায় মশগুল হতেন পড়ার টেবিলে। অর্থাৎ পড়া আর লেখাই ছিল তাঁর এ সময়ের শ্রেষ্ঠতম আরাধ্য। আর সেই বুঁদ হয়ে থাকা ভুবনে একদিন নীল কুয়াশার মোড়ক পরে হঠাৎ নেমে এলো ঘোর অন্ধকার।

হয়তো রবীন্দ্রনাথকে না ছুঁতে পারার বেদনা কিংবা অন্য কোনো অজানা অভিমানে মাত্র ৮০ বছর বয়সে চলে গেলেন বাংলা ভাষার বিশাল বিপুল ঘটনাবহুল জীবনের কবি বেলাল চৌধুরী। এর আগের কয়েকটি বছর অসুস্থতাহেতু একরকম ঘরেই পড়ে ছিলেন। নিরন্তর নতুন নতুন চিন্তার আবিষ্কার, মেধাবী বন্ধুদের সঙ্গে মেধাকে শাণাতে শাণাতে তাকে ক্ষুরধার করে তোলা থেকে জাত বোহেমিয়ানপনা, কোনো কিছুতেই কম যাননি। লেখালেখি, সম্পাদনা, বাংলা ভাষার লেখকদের সঙ্গে সংযোগসেতু স্থাপনসহ সাহিত্যের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বেলাল চৌধুরীর ইতিবাচক ভূমিকা ছিল না। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত খবর রেখেছেন বিশ্বসাহিত্যের কোন বইটি কখন প্রকাশিত হয়েছে কিংবা কোন বইটি কবে নাগাদ প্রকাশিত হতে চলেছে। মূলত তাঁরই অনুবাদ এবং আগ্রহের ফলে তাঁর সময়ের লেখক-পাঠকগণ আজকের বহুল পঠিত ল্যাটিন ও আফ্রিকান সাহিত্য পাঠে আগ্রহী হয়ে ওঠে ও সমৃদ্ধ হয়। এমনই অগ্রসর ছিলেন প্রথম ষাটের কবি বেলাল চৌধুরী। ষাটের বলে পরিচিত হলেও বেলাল চৌধুরীর বন্ধুত্বে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন সব পঞ্চাশের কবি-লেখকগণ। এটা তাঁর আরো একটি বড় গুণ। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন কমলকুমার মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ। নোবেল বিজয়ী লেখক গুন্টার গ্রাস বাংলাদেশে এসে কবি বেলাল চৌধুরীর ছত্রছায়ায় একান্ত গোপনে ঢাকা শহর চষে বেড়ান। গ্রাস আর কোনো লেখকরে খোঁজ করার প্রয়োজন মনে করেননি। বেলাল চৌধুরী এক বিরল দৃষ্টান্ত যে, তিনি লেখার চেয়ে পড়ার দিকে অধিক মনোযোগী ছিলেন। তাই সারা জীবনই নিজের লেখাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অবহেলায় মাড়িয়ে গেছেন। ব্যক্তিজীবনের মতো লেখাকেও গোছগাছ পরিপাটি করে যত্ন করেননি। তাই, তাঁর একটি বই খুঁজে পেতেও হিমশিম খেতে হয়। প্রথম জীবনে মাছধরা ট্রলারে করে অজানার পথে দেশ ছেড়ে যাওয়া এই ধীমান কবির রচনা ও জীবনের সঠিক মূল্যায়ন কি হয়েছে? কী ছিল তাঁর অবদান? কেন আজ দেশবিদেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আজ শোকের ঝড় বইছে? আজ ছাড়া আর অন্য কোনোদিন কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি?

বিজ্ঞাপন

সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে যে জীবন পূর্ণ মণিজালে, সে জাল ছিঁড়েই এবার উড়ে গেল অধরা প্রাণপাখি। কে তারে বাঁধতে পারে আর! সকলে যেমন জানে তেমন জানতেন কবি বেলাল চৌধুরী। তবু সেই জীবনকে তিনি ঘন নীল কুয়াশায় মুড়িয়ে ফেলার আগে শেষ সূর্যোদয় পর্যন্ত ব্যক্তিগত অনুশীলন, সততা, নিবিষ্টতা এবং বোহেমিয়ানপনা দিয়ে মণিজালে পূর্ণ করতে এতটুকু আলস্য দেখাননি। জীবনকে তিনি বাজিয়ে দেখেছেন বীণায় গাঁথা সব কটি তারে। এক বিশংনাগরিকের পৃথিবী পরিভ্রমণের মতো প্রথম যৌবন থেকেই জীবনের মুখে লোভনীয় গ্রাস করে তুলে দিয়েছেন স্বাধীনতাকে। ঘুরেছেন পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত যেমন, তেমনি পাঠ করেছেন সর্বভুক পাঠকের মতো ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে রান্নার বই পর্যন্ত।

প্রিয়বন্ধু সুনীলের ভাষায় ছদ্মবেশী এই রাজকুমার শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরাকে কবিতার পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তিকে বেঁধে নিয়েছিলেন কিনা কিংবা আমৃত্যু সাহিত্য যাত্রার যে বন্ধুর পথে তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, সেই পথই তার জন্য রচিত হয়ে ছিল কিনা, এ প্রশ্নও আজ ব্যাখ্যা চাইতে পারে। আপাদমস্তক নিরাপোসী এমন সৎ সাহিত্যিকের সংখ্যা আজকাল তেমন একটা চোখে পড়ে না বললেই চলে। নিরুদ্দেশ যাত্রায় পাড়ি দেবার পর থেকে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন যে সংকল্প নিয়ে সে সংকল্প তার পূরণ হয়েছে বটে, কিন্তু আমরা তা কতটুকু ধারণে সক্ষম হয়েছি?

বিজ্ঞাপন

আমরা যা বলতে পারি, তা করতে পারি খুব কমই কিন্তু যা করতে পারি, বলতে পারি তারো চেয়ে কয়েকগুণ বাড়িয়ে। তেমনি বেলাল চৌধুরীকে নিয়ে আমাদের মৌখিক সমবেদনা একেবারেই কম ছিল না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কিংবা বাস্তবে? হলুদকে হলুদ বলার ক্ষমতা যেদিন পেলাম সেই থেকে সকারণেই হয়তো পেয়ে বসেছিল কবিতার নেশা। পাঠ্যবইয়ের কবিতা দেখে কবিতা লিখতে লিখতে একদিন সত্যিকারের কবিদের কবিতা পড়তে শিখি খবরের কাগজে। এর বাইরে বইপত্র আর তেমন একটা পড়া হতো না, বই কিংবা প্রেরণাদাতার অভাবে। কিন্তু পত্রিকার সাহিত্য পাতা দেখলেই খরগোশের মতো হামলে পড়তাম কবিতার ওপর। সেই থেকে চিনতে শিখেছি কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মোহাম্মদ রফিক, মহাদেব সাহাসহ আরো অনেকের কবিতা। একেকজন কবি একেক কারণে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিলেন। সেই দিক থেকে যতটা শামসুর রাহমান কিংবা রফিক আজাদ আগ্রহের বিষয় হয়েছিলেন সম্ভবদ্রুত, তারও চেয়ে খানিকটা বিলম্বে আগ্রহ তৈরি করেছিলেন কবি বেলাল চৌধুরী। সত্যি বলতে তাঁকে চিনতে শিখি উনিশশো নব্বই সালে স্বৈরাচার পতনের বছরে ঢাকায় আসার পর। কে এই কবি বেলাল চৌধুরী? যিনি ভারত বিচিত্রা নামে একটি পত্রিকায় চাকরি করেন, কবিতা লেখেন, দুই বাংলার লেখকদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি খোঁজখবর নেন। মনে পড়ে তার দু’এক বছর পরই আমার একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল ভারত বিচিত্রায় তাঁর সঙ্গে আমার অপরিচয়ের প্রাক্কালেই। কবিতাটি প্রয়াত সাংবাদিক ফরহাদ খাঁর হাতে দিয়েছিলাম, যিনি বেলাল ভাইয়ের সহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন একই কাগজে। একদিন তার সম্মানীস্বরূপ একটি চেকও পেয়েছিলাম ৭০ টাকার। এরপর ধীরে ধীরে জানি, তিনি প্রতিভাবান ও প্রতিশ্রুতিশীল কবিদের লেখা ছাপার ক্ষেত্রে সম্পর্ককে খুব একটা মূল্যায়ন করেননি। মূল্যায়ন করেছেন শুধু লেখাকে। একদিন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর কৃত্তিবাস-এর মতো পত্রিকার সম্পাদনার ভার বেলাল চৌধুরীর ওপর ছেড়ে দিয়ে নাকি নাক ডেকে ঘুমানোর সাহস পেয়েছিলেন। সুনীলের ভাষায় বেলাল চৌধুরী বন্ধু মহলে তো বটেই, কোনো পরিবারের সঙ্গে একবার পরিচয় হলে নাকি সেই পরিবারের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলের প্রিয় হয়ে উঠতেন। কে জানে ঈর্ষা করেই বলেছিলেন কিনা সুনীল, বিশেষ করে মেয়েদের কাছে বেলাল চৌধুরীর জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। আসলে বেলাল চৌধুরী জীবনের যা কিছু সুন্দর তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে যেমন, তেমনি সে সম্পর্ককে লালন করতে, পরিচর্চা করে সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান রাখতে তৎপর থাকতেন। এমন একজন বিশ্বনাগরিকের এসব গুণ অর্জনের পেছনের ইতিহাসটা নেহাৎ শুধু সাদা পৃষ্ঠায় অঙ্কিত এলোমেলো আঁকিবুঁকি নয়। সেই আঁকিবুঁকিতে আছে গভীর পারম্পর্য, কঠিন তাৎপর্য।

সকলের চোখে বিশ্বস্ত এই বেলাল চৌধুরী কি মাত্র একদিনেই তৈরি হয়েছিলেন? বা কোনো ঝড়ে পাওয়া মহত্ত্ব তাকে এমন আশীর্বাণী দিয়ে গেছিল? তা মোটেও নয়। আজন্ম বইপোকা বেলাল চৌধুরী দেশ বিদেশের অগণিত বই পড়ে শিল্প চিনে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছিলেন। ছিল বাবার বইয়ের সংগ্রহ, ছিল মায়ের পাঠাভ্যাস। কীভাবে ধাপে ধাপে বইয়ের সিঁড়ি ভেঙে জ্ঞানের চূড়ান্তে পৌঁছানো যায়, তা একদিন মনের অজান্তেই ভর করেছিল বেলাল চৌধুরীর ঘাড়ে। এভাবে পড়তে পড়তে একদিন কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেবার বাসনা হয়েছিল তাঁর। এবং দিয়েছিলেনও। তারপর একদিন ৯২ক ধারা জারি হবার পর জেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। জেলখানায় পেয়েছিলেন সরদার ফজলুল করিম, সন্তোষ গুপ্তদের মতো মানুষের সান্নিধ্য। বেলাল চৌধুরী মনে করেন, জেলে না গেলে তাঁর জীবন পূর্ণতা পেত না। জেলকে তাঁর কখনো জেলখানা মনে হয়নি, মনে হয়েছে শিক্ষিত মানুষদের একটা মেস। সেখানে সবাই লেখালেখি করতো, বই পড়তো। বেলাল চৌধুরীও তাদের অভ্যাস রপ্ত করেছিলেন। জেল থেকে বেরিয়ে আবার পুরো মাত্রায় পড়াশোনা লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। জেলখানার এক ভিন্ন পরিবেশ থেকে ফিরে আসার পর কী ধরনের বই পড়তেন, তরুণ কথাসাহিত্যিক হামিদ কায়সারের নেয়া এক সাক্ষাৎকারে এরকম এক প্রশ্নের জবাবে বেলাল চৌধুরী বলেন, “যা পেতাম তাই-ই পড়তাম। আগেই বলেছি বই-এর ব্যাপারে আমি সব সময়ই উভচর, সর্বভুক ও সম্পূর্ণ বাছবিচারহীন। যখন যে অবস্থায় যা পেয়েছি গোগ্রাসে তাই গলাধঃকরণে মনোনিবেশ করেছি। আমার কাছে কোনো বই-ই অস্পৃশ্য নয়। তা সে ধর্মগ্রন্থই হোক আর সচিত্র রন্ধনপ্রণালিই হোক। শক্ত খোলের পর্নোগ্রাফি দাঁতে কাটতে আমার যেমন উৎসাহ তেমন কচি নরম তাল শাঁসে ফরৎ করে টান মারতেও আমার আপত্তি নেই।” [সংবাদ সাময়িকী, ১৯৯৮]

বিজ্ঞাপন

কিছু বইয়ের নাম উল্লেখ করতে বললে তিনি বলেন, “তৎকালীন সময়ের যেসব লেখা, বিশেষ করে আমেরিকান পেপারব্যাক প্রচুর পড়েছি। যেমন এরস্কিন কল্ডওয়েল, উইলিয়াম ফকনার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, হাওয়ার্ড ফাস্ট, আপটন সিনক্লেয়ার। খুব পড়েছি এডগার এ্যালান পো, ইওজিন ও’নীল, কামু, কাফকা, স্তঁদাল, অস্কার ওয়াইল্ড, সার্ত্র প্রমুখ। আর বাংলা সাহিত্যে প্রিয় ছিলেন সুবোধ ঘোষ। সুবোধ ঘোষের শতকিয়া তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এখন এই বইয়ের নাম কেউ জানে না। তাঁর সুজাতা, কোনো একটি বইয়ের চরিত্র হোমিও হিমুকে কিছুতেই ভুলতে পারি না আজ এতকাল পরেও; পলাশের নেশা, ভারত প্রেমকথা, জতুগৃহ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সমরেশ দা’র লেখা তো ঐসময় থেকেই পড়ছি সেই বি.টি রোডের ধারে, নয়নপুরের মাটি, শ্রীমতী কাফে, ত্রিধারা গঙ্গা। সমরেশ বসু’র লেখা একটু আলাদা মনে হতো সবসময়। তারপর, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শিলালিপি, উপনিবেশ ইত্যাদি বই তখনকার সময়ে সবাই পড়ত। এই তো, সুলেখা সান্যাল, অমরেন্দ্র...” [সংবাদ সাময়িকী, ১৯৯৮]

আজ তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে যতটা সহজে একটি দুর্লভ বইও চলে আসে হাতের কাছে, বেলাল চৌধুরীর আমলে তেমনটা মোটেও ছিল না। তখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো একটি বইয়ের জন্য, একটা ডাকের জন্য। আবার ইচ্ছা করলেই দেশের বইবিপণি থেকে পছন্দের বইটি মুহূর্তে কিনে ফেলা যেত না। তৃতীয় বিশ্বের এই পিছিয়ে পড়া একটি দেশের একজন পাঠক বা লেখককের বিশ্বসাহিত্যের বইয়ের ক্ষুধা মিটাতে কী করতে হতো? বা বেলাল চৌধুরীর যে এই বিশ^সাহিত্য পাঠের নেশা সেই নেশা মেটানোর জন্য কীভাবে তিনি বই সংগ্রহ করতেন? সাক্ষাৎকারে এমন এক প্রশ্নের জবাবে বেলাল চৌধুরী বলেন, “বই ভালোবাসি বলে যারা আমাকে ভালোবাসেন, তারা যে যেখানেই থাকেন না কেন, ভালো বই হলে সুযোগ পেলে সেগুলো তারা আমাকে পাঠান। স্নেহভাজন সৈয়দ শহীদ আছে আমেরিকায়, হাসান ফেরদৌস আছে আমেরিকায়, ওখান থেকেই ওরা আমার জন্যে বই পাঠায়, সুমন রহমান থাকে জাপানে, সে পাঠায়। ভাইপো শ্রীমান রফিক উম-মুনীর চৌধুরী আছে লন্ডনে, সেও, পাঠায়। তারপর, জীবনানন্দ গবেষক ক্লিন্টন বুথ সিলি থাকেন মার্কিন মুল্লুকে। ওঁর আমার পরিচয় হয়েছিল কলকাতায়। একসময় ও পিস কোরের সদস্য হয়ে কাজ করেছিল বরিশালে। তখন আমি অবশ্য কলকাতায়। ওঁর সঙ্গে আমার বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে দেখা। সেই সময়ে আমার চিঠিপত্র নিয়ে সে বাংলাদেশে এসেছিল। আমার দেশের বাড়িতে গিয়েছিল। ক্লিন্টন-এর সঙ্গে আমার বেশ হৃদ্যতা। সে আমাকে মাঝে মাঝেই বই পাঠায়। আমাকে পাঠানো বইগুলোর ওপর ক্লিন্টন পরিষ্কার ঝরঝরে বাংলায় লিখে দেয় “এই বইগুলো বেলাল চৌধুরীর জন্য পাঠানো, কেউ যদি চুরি করে নিজের লাভের উদ্দেশ্যে বেচে দেয়, সে লোকটা এবং তার চৌদ্দ পুরুষসুদ্ধ চুলোয় (দোজখ) যাক।” আরও পাঠান শ্রীমতী রুথ ব্রাইন, প্যারির মিরিয়াম ও ব্লয়। মুম্বাইতে থাকে বন্ধু গুলান; বেরুনো মাত্রই ও পাঠিয়েছি অরুন্ধতী রায়ের গড অব অব স্মল থিঙ্কস। এমনকি আমাদের সকলেরই স্নেহাস্পদ আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন আমেরিকায় থাকাকালীন সমেয় একটি বই পাঠিয়েছিল আমার জন্য।” [সংবাদ সাময়িকী, ১৯৯৮]

বিজ্ঞাপন

এইভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে ওঠেন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও আরো বিবিধ বিষয়ের লেখক বেলাল চৌধুরী। কলকাতার সাহিত্যাঙ্গনের সেই উত্তাল সময়ে, যখন হাংরি জেনারেশনের আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল, তখন বেলাল চৌধুরী ছিলেন সে আন্দোলনের অগ্রভাগে। সত্যি বলতে হাংরি আন্দোলনের নায়কের ভূমিকায় কে ছিলেন, এমন প্রশ্ন করা হলে সর্বাগ্রে নাম উঠে আসে বেলাল চৌধুরীর। শক্তি, উৎপল, তুষারের চেয়েও তুখোড় ভূমিকায় ছিলেন কবি বেলাল চৌধুরী। এ প্রমাণ পাওয়া যায় তুষার রায় রচিত ‘শেষ নৌকা’ উপন্যাসে। সত্যি বলতে একটা সময়ে বেলাল চৌধুরীকে ভারতীয়ই মনে করা হতো। তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় ভারতে বসবাস এবং এপারে এসে ভারত বিচিত্রায় চাকরির সুবাদে তিনি এজাতীয় ভাবনায় উচ্চারিত হতেন। কলকাতা বা ভারত যাবার ব্যাপারে কারো কোনো ভিসা সমস্যা হলে শেষতক বেলাল চৌধুরীর হাতেই মিলত তার সামাধান। শুধু তাই নয়, কৃত্তিবাসসহ কলকাতার অন্যান্য পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের কবিদের লেখা নিয়ে প্রকাশ করে অপার আনন্দ পেতেন বেলাল ভাই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বেলাল ভাই যখন দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদনার দায়িত্ব নেন, তখন আমার কয়েটি কবিতা পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। এবং সেই থেকে তিনি বিভাব, কৃত্তিবাসসহ বেশ কটি পত্রিকায় আমার লেখা নিয়ে একাধিকবার মুদ্রণ করেছেন এবং তাঁর কাছে সৌজন্য কপি পৌঁছালে ফোন করে জানিয়ে দিতেন এবং পত্রিকা নিয়ে যেতে বলতেন।

সংবাদ-এর সাহিত্যপাতার দায়িত্ব নেবার পর বেলাল ভাইয়ের আরো সান্নিধ্যে আসার সুযোগ ঘটে। বেলাল চৌধুরী মনে করতেন সংবাদ তাঁদের (লেখকদের) নিজেদের পত্রিকা। যখন যে প্রয়োজনে তাঁর কাছে লেখা চেয়েছি তিনি কখনো বিমুখ করেননি। যে কোনো বিষয়ে যে কোনো সময় বেলাল ভাইকে ভরসা করে প্রাণভরে শ্বাস নিয়েছি। মাঝেসাঝে যৎসামান্য সম্মানীর খামটা হাতে ধরিয়ে দিলে তাঁর মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠতো। হেসে বলতেন, সংবাদ-এর কাছ থেকে আবার সম্মানী নিতে হবে! সংবাদে তো আমরা সম্মানীর জন্য লিখি না। সংবাদ তো আমাদের নিজেদের পত্রিকা। বাড়িতে গেলে আপন ছোটভাইয়ের মতো হাত ধরে টেনে নিয়ে আমাকে কাছে বসিয়ে গল্প করতেন। কবিতার প্রসংশা করে বলতেন, খুব ভাল লিখছ, সিরিয়াসলি কাজ করছ, তাই তোমার কাছে আমার প্রত্যাশা অনেক। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসতো জলে। আমার কবিতার প্রশসংসার জন্য নয়, কত উঁচু মনের মানুষ হলে এভাবে সাদা মনে ভালবাসতে পারেন, সেটা ভেবে আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়তাম। একজন মানুষকে যে কতটা কাছে টানতে পারতেন বেলাল ভাই, তা তার সান্নিধ্যে না গেলে কখনো বুঝতাম না। এত বড় সৎ এবং নির্লোভ মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি। বেলাল চৌধুরী ছিলেন এমন একজন মানুষ যার মিডিয়ার প্রতি সামান্যতম লোভ জন্মায়নি। তিনি কোনোদিন কোনো মিডিয়া কিংবা প্রকাশকের কাছে ধরনা দেননি। মনে আছে কয়েকবছর আগে আমার বন্ধুরা তাদের টেলিভিশনে ইন্টারভিউয়ের জন্য নিতে চাইলে তিনি অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। আমার অনুরোধও তিনি রাখেননি। একবার রাজি হয়েও আবার আমাকে ফোন করে বলেন, “ওদেরকে তুমি না করে দাও। আজ আমার একটা বিশেষ কাজ আছে।”
এখন বেলাল ভাইয়ের এই মহাপ্রয়াণ শুধু এসব শূন্যতাকেই প্রসারিত করছে না, সৃষ্টি করবে গভীর বিশাল ক্ষতের।

কেবল কবি-প্রাবন্ধিক বা অনুবাদক হিসেবে নন, বেলাল চৌধুরী ছিলেন আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে এক উৎসব ও আড্ডামুখর মানুষ। সে সময়ের আধুনিকতার চূড়ান্তে ওঠা এই কবি, এতটাই জীবনকে নেড়েচেড়ে দেখেছেন যে, তারই একটি কবিতার বইয়ের নাম রেখেছেন যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে। সত্যি বলতে বেলাল চৌধুরী মানেই উৎসব, বেলাল চৌধুরী মানেই আড্ডা, বেলাল চৌধুরী মানেই কোনো প্রকার নিয়মের তোয়াক্কা না করে, কোথাও অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে ইচ্ছে মতো কাটিয়ে আবার বিশ্বস্ত দেহে ফিরে আসা। বেলাল চৌধুরী মানেই নতুন নতুন বইয়ের খবর, নতুন নতুন আন্দোলনের খবরে বাংলা কবিতার উত্তপ্ত কড়াইতে নোনা সাগরের মাছ ভেজে খাবার উৎসব। বেলাল চৌধুরী মানেই একবার ঢাকা একবার কলকাতা, চিরবোহেমিয়ান শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিংবা ফালগুনী রায়, তুষার রায়, সুনীল গাঙ্গুলী, কমলকুমারের মতো যে কারো ইচ্ছের বাস্তবায়নে যা কিছু করা। আবার শেষতক বেলাল চৌধুরী মানে নতুন স্বরের কবিতার জন্য নিরন্তর নিরীক্ষা পরীক্ষায় গবেষণাগার ভারি করে তোলা। যেমনভাবে কবিতার নামকরণ হতে পারে সেলাই করা ছায়া। বেলাল চৌধুরী মানে বিশ্বস্ত সাহিত্যের উদ্যানে প্রতিটি বৃক্ষের পুষ্প পত্র ফলে বাংলা সাহিত্যকে সমন্বিত করে একটি নতুন বৃক্ষের ছায়ায় প্রশান্তির বিশ্রাম।

এই একই মানুষ আবার একজন আদর্শ পিতা, আদর্শ স্বামী আবার আমাদের আজকের একজন আদর্শ অভিভাবক। তাঁকে হারানোর আমাদের আজকের বেদনা মানে মাথার ওপর থেকে একজন বৃক্ষের ছায়া সরে যাওয়া।

আজ বেলাল চৌধুরী নেই, আমরা জানবো না, কেমন নকশায় জীবনকে কবিতার মতো করে, কাব্যপঙ্ক্তির দৃঢ়তা দিয়ে সম্পূর্ণ নির্লোভ হয়ে যাপন করা যায়। আমরা হয়তো আর খুঁড়ে তুলে দেখবো না যে, লেখক হিসেবে সততা মানে নিজেকে চেনা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে নিজের লেখার দায় সবার আগে নিজের ওপর বর্তানো। নিজের সীমাবদ্ধতাকে পাঠকের ওপর চাপিয়ে দায় শোধ করা মানে সততা নয়। বেলাল চৌধুরী এতটা সৎ ও আদর্শবান ছিলেন বলে নিজের বিশাল ব্যাপক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কখনো আত্মপ্রচার করেননি। নির্লজ্জের মতো আত্মপ্রশংসাও করেননি। বরং আমৃত্যু নিজের রচনার প্রতি অবহেলা ও উদাসীনতাই প্রকাশ করেছেন। তাঁর শিল্পের নিরিখ ছিল সত্যিকার অর্থে নিজে সৎ কিংবা মানুষ হিসেবে সৎ থেকে যতটা পারা যায়, ঠিক ততটুকুই সাহিত্য করা। তাঁর মতো এমন বিরল উদাহরণ কিংবা এমন সান্নিধ্য থেকে আমরা যথার্থ মূল্যেই বঞ্চিত হলাম।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন