বিজ্ঞাপন

রামপাল ও আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন ডিসেম্বরে, দূর হবে সংকট

September 30, 2022 | 12:02 pm

ঝর্ণা রায়, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আগামী বিজয় দিবসে দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। বাগেরহাটে ‘রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র’, আরেকটি ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মাণাধীন ‘আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট’। এই দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রই বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ করা হচ্ছে। এই দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন হলে এর থেকে ২ হাজার ২৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের চিন্তা করা হচ্ছে। আর এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্ত্র মোদী। এখন কিভাবে উদ্বোধন করা হবে এ নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর একটি রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করতে ব্যয় হচ্ছে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সাপমারি-কাটাখালী ও কৈর্গদাশকাঠী এলাকায় ১৮৩৪ একর জমির ওপরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারত সরকারের কনসেশনাল ফাইন্যান্সিং স্কিমের অধীনে নির্মিত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ভারতের এনটিপিসি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের-পিডিবি মধ্যে একটি ফিফটি ফিফটি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এরইমধ্যে গত ১৫ আগস্ট থেকে রামপালের প্রথম ইউনিট পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। ওইদিন প্রকল্পের ইউনিট-১ এ ৯১.৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

প্রকল্পের জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম সারাবাংলাকে জানান, এভাবে একটু একটু করে উৎপাদন বাড়তে থাকবে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রথম ইউনিট ফুল লোডে যেতে পারবে। অর্থাৎ প্রথম ইউনিটের ৬৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাবে। আর দ্বিতীয় ইউনিটের বাকি ৬৬০ মেগাওয়াট আগামী বছর ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রামপাল ও আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন ডিসেম্বরে, দূর হবে সংকট

পরিবেশগত প্রভাব রোধে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির সঙ্গে পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে জানিয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, ‘বায়ু ও পানি দূষণ কমাতে একটি ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন সিস্টেম যার মধ্যে সালফার অক্সাইডের নির্গমন নিয়ন্ত্রনের জন্য কোনো বাইপাস নেই। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে। দূষণ এড়াতে থাকছে সমন্বিত বর্জ্য এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম। পশুর নদীর দূষণ, ফ্লু গ্যাস নিগর্মমনের বিস্তৃত বিচ্ছুরণের জন্য বাংলাদেশের জাহাজ আনলোডার নির্মাণের পাশাপাশি একটি সর্ম্পূণ আচ্ছাদিত কয়লা স্টক ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে। উচ্চ গ্রেডের কয়লা আমদানি করা হয়েছে, যেখানে ছাই এবং সালফার সামগ্রীসহ কয়লার অন্যান্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, রূপকল্প ২০৪১ এবং বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় পরিস্কার বলা হয়েছে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে দেশীয় সোর্সের পাশাপাশি বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কথা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ভারত থেকে বর্তমানে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে সরকার। আরও ১৬০০ মেগাওয়াট আসার অপেক্ষায়। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার জন্য ২০১১ সালে ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতামূলক ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়। সেই চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় ভারতের বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ি আদানি গৌতম প্রতিষ্ঠিত আদানি গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণে সমঝোতা সই করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-বিপিডিবি।

এই সমঝোতা চুক্তির আওতায় শুধুমাত্র বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য ভারতের ঝাড়খন্ড প্রদেশের গোড্ডা জেলায় ১৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার একটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে আদানি গ্রুপ। বিপিডিবির তথ্যানুযায়ী ‘আদানি পাওয়ার’‌ও গত আগস্ট থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যায়। চুক্তি অনুযায়ী আদানি পাওয়ারের গত বছর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা ছিলো। কিন্তু করোনা মহামারির কারনে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

চুক্তি অনুযায়ী, আদানি পাওয়ার গোড্ডা থেকে ইন্টারকানেকশন পয়েন্ট পর্যন্ত ১০৬ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন স্থাপন হচ্ছে। ওই পয়েন্ট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের রোহনপুর ও বগুড়ায় দু’টি সাবস্টেশন নির্মাণ হচ্ছে। সে পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।

এদিকে বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, আদানি পাওয়ারের কাজ শেষের দিকে। এখন বাংলাদেশ অংশে সঞ্চালন লাইনের পরীক্ষা চালানো হবে। শিগগিরই এ কাজ শুরু করা হবে। সাবস্টেশন নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় প্রাথমিকভাবে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন দিয়ে শুরু হবে।

রামপাল ও আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন ডিসেম্বরে, দূর হবে সংকট

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সব কাজ শেষ করে আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের বাংলাদেশের অংশের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ফলে আগামী মাস থেকে পরীক্ষামূলক সঞ্চালন শুরু হবে। মূল বিদ্যুৎ ডিসেম্বরে পাবো আমরা।’

তিনি আরও জানান, রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট দুটোই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। আর এ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এখন কীভাবে উদ্বোধন হবে সেসব পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’

সরকারের সবশেষ মহাপরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে ৬২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এরমধ্যে ৩৫ শতাংশ গ্যাস থেকে, ৩৫ শতাংশ কয়লা থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিলো। বাকি ৩০ শতাংশ তেল, হাইড্রো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করা হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এখন জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত ক্যাপটিভ এবং নবায়নযোগ্য মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ২৫ হাজার ৭৩০ মেগাওয়াট। দেশের ১৫২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে।

পিডিবির তথ্যানুযায়ী, সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ৫৭টি কেন্দ্রের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১১০১৭ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাসের উৎপাদন কম হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে এসব কেন্দ্রে অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চলমান সংকট নিরসনে বিদ্যুৎ আমদানিতে সরকারের চিন্তা রয়েছে। দেশের জ্বালানি নীতিতেও মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের ১৫ শতাংশ আমদানির নির্দেশনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ভারত থেকে ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। চলতি বছরে আরও ১৬০০ মেগাওয়াট যোগ হওয়ার কথা রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল এবং ভুটান থেকে মোট ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

সারাবাংলা/জেআর/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন