বুধবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

তাপদ্বীপ ঢাকা: কালবৈশাখী চক্রে নিজেই নিজের ধ্বংসের কারণ

এপ্রিল ২৮, ২০১৮ | ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ

।। মাকসুদা আজীজ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর ।।

বিজ্ঞাপন

বৈশাখ গরমের মাস, কালবৈশাখীর মাস। গরমে অতিষ্ঠ প্রাণে শান্তির পরশ বুলায় বৈশাখ। এ বছর চিত্র ভিন্ন। কালবৈশাখীর তাণ্ডবে শঙ্কিত প্রাণ। পহেলা বৈশাখ থেকে এমন একটি দিন যায়নি যেদিন ঝড় হয়নি। শুধুমাত্র এপ্রিল মাসে সারা দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ জন। শহর জুড়ে ভেঙে পড়েছে গাছের দেহ, বিরান হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত উদ্যান। কেন হচ্ছে এতো ঝড়? ঝড়ের এ প্রলয় থেকে কীভাবে রক্ষা পাবে মহানগরী ঢাকা? এ বিষয় সারাবাংলা কথা বলেছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে।

ঝড় বেড়েছে ঢাকায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ও ভালনারাবিলিটি স্টাডিজের অধ্যাপক ড. খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরের আবহাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করলে দেখা যায় এতে পরিবর্তন ঘটেছে। খুব বড় ধরনের জলবায়ুর পরিবর্তনগুলো খুব বার বার হচ্ছে, যেমন অতি বৃষ্টি, সময়ের আগে বর্ষা, ঝড় বেড়ে যাওয়া, বলেন এ গবেষক।

ঢাকায় ঝড় বেড়েছে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন আবহাওয়াবিদ মো. শাহিনূর ইসলামও। তিনি জানান ঢাকায় এ বছর যত ঝড় হচ্ছে তা আগে কখনও হয়নি।

বিজ্ঞাপন

অধিক তাপমাত্রায় ঢাকা পরিণত হয়েছে তাপদ্বীপে

ড. মোকাদ্দেম হোসেনের মতে ঝড় বাড়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা কয়েক বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও গ্রিন হাউজ তথা কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস বৃদ্ধির ফল। এ গ্যাস পার করে পৃথিবী থেকে তাপ বের হয়ে পারে না।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের গ্রিন ঢাকা প্রোজেক্টের সমন্বয়কারী ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন জানান, ঢাকা একটা তাপদ্বীপ এ পরিণত হয়েছে। এর একমাত্র কারণ কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নয়। ঢাকার বহুতল ভবনও এগুলোর কারণে বায়ু স্বাভাবিক নিয়মে প্রবাহিত হতে পারে না আর ঢাকা কিছুতেই ঠাণ্ডা হতে পারে না। এ গরম বাতাস উপরে গিয়ে দ্রুত ঠাণ্ডা হয়, অধিক পরিমাণে মেঘ তৈরি করে। মেঘ এখানে তৈরি হয়, এখানেই ঠাণ্ডা হয় এখানেই ঝড় হয়, মত ড. জামাল উদ্দিনের।

আবহাওয়াবিদ শাহিনূরও সমর্থন করেন ড. জামাল উদ্দিনের ব্যাখ্যা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যত ঝড় হয় তার অধিকাংশ তৈরি হয় ভারতে। সেগুলো পথে শক্তি সঞ্চয় করে উত্তরবঙ্গ, সিলেট বা উপকূল অঞ্চলে আসে। তবে এই বছর ঢাকার উপরেই অনেক ঝড় তৈরি হচ্ছে বলে জানান এ অবহাওয়াবিদ।

‘ ঢাকায় যত ঝড় হচ্ছে তার শতকরা ১০ ভাগ ঢাকায় তৈরি হচ্ছে’, বলেন আবহাওয়াবিদ শাহিনূর।

ঝড় কেন এতো ভয়াল?

আবহাওয়াবিদ শাহিনূর জানান, ঢাকায় যত ঝড় এখন পর্যন্ত হচ্ছে কোনোটাই ঝড়ের তীব্রতার সংজ্ঞায় মাঝারি বা তীব্র নয়। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রতি ঘণ্টায় ৮৩ কিলোমিটার বেগের ঝড় হয়েছে যেটা তীব্রতার সংজ্ঞায় মৃদু ঝড়।

এরপরেও কেন ঢাকায় উপড়ে যাচ্ছে গাছপালা? এ প্রশ্নের জবাবে ড. জামাল উদ্দিন বলেন, লক্ষ্য করলে দেখবেন গাছগুলো একদম মুচড়ে ভেঙেছে। এর কারণ উঁচু ভবনে বাতাস বাঁধা পেয়ে ক্রমাগত পাক খাচ্ছে। চারিদিক থেকে পাক খেয়ে আসা বাতাস গাছের উপর আছড়ে পরে আর গাছকে মুচড়ে ভাঙে।

তিনি বলেন, গ্রাম-গঞ্জে দেখবেন ঝড়ে গাছ এমন মুচড়ে ভাঙে না। এমনকি সিডোর বা আইলার মতো হারিকেনেও গাছ এভাবে মুচড়ে যায়নি যা এখন মৃদু ঝড়েই হচ্ছে।

ড. মোকাদ্দেম বলেন, একটা শহরে ২৫ শতাংশ খোলা স্থান থাকা দরকার ঢাকায় তা এখন আর ২ শতাংশও নেই। এছাড়া শহরে যে পরিমাণ জলাশয় থাকা দরকার ছিল তা এখন আর নেই।

জলাশয়ের সঙ্গে গাছের উপড়ানোর সম্পর্ক আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেন ড. জামাল। তিনি বলেন, আমরা ঢাকায় পানি সংগ্রহ করি ভূ-গর্ভ থেকে কিন্তু ব্যবহারের পরে সে পানি ফেলি বুড়িগঙ্গায়। এভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের ভূ-গর্ভের পানির উচ্চতা কমে যাচ্ছে। গাছের শিকড় পানি পায় শুধু বৃষ্টি থেকে মাটির উপরে। এতে প্রধান মূল নিচের দিকে না নেমে পাশে ছড়ায়, এমন একটি গাছ চারিদিকের বাতাসে আর নিজেকে দাড় করে রাখতে পারে না।

নিজের তৈরি ধ্বংসের দুষ্ট চক্রে ঢাকা

ড. মোকাদ্দেম বলেন, ঢাকা দুর্যোগের একটা দুষ্ট চক্রে নিজেকে এনে ফেলেছে। এখানে গাছ নেই, খোলা জায়গা নেই ফলে এখানে অনেক গরম। গরমের ফলে এখানে ঝড় বেড়েছে। এই ঝড়ের ফলে আরও গাছ কমে যাচ্ছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপড়ে পরা গাছের জায়গায় আরেকটা গাছ লাগানো হয় না।
ফলাফল আরও গরম আরও ঝড় এবং আরও কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি।

কীভাবে বাঁচানো যাবে ঢাকাকে?

ড. জামাল বলেন, এটা সম্ভবত ঢাকার শেষ ডাক যে ঢাকাকে আমাদের বাঁচাতে হবে। আমাদের শুধু গাছ লাগালে হবে না সে গাছ টিকিয়ে রাখতে হবে। ঢাকার মাঝে খাল, নালা খনন করে ব্যবহারের পরে পানি আবার মাটিতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। উদ্যান, সড়কের পাশে এবং সড়কের মাঝের গাছগুলোকে নিয়মিত ছেঁটে একটা ঝোপের আকারে রাখতে হবে যেন তাদের মাঝে যাওয়া বাতাস তাদের দুর্বল অংশ খুঁজে না পায়। মাটিতে ঘাসের আবরণ তৈরি করতে হবে যেন মাটি আরও পানি ধরে রাখতে পারে। 'মনে রাখতে হবে, ঢাকা বাঁচলে তবেই আমরা বাঁচব।' বলেন এ উদ্যানবিদ।

সারাবাংলা/এমএ/এমএইচ

** দ্রুত খবর জানতে ও পেতে সারাবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখুন: Sarabangla/Facebook

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন