বিজ্ঞাপন

স্মৃতিতে নূর হোসেন

November 10, 2022 | 1:42 pm

আজমল হক হেলাল

আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা। আমি তখন সাংবাদিকতায় নতুন। সাপ্তাহিক সুগন্ধা পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার। রিপোর্টিয়ের পাশাপাশি ছবিও তুলি। কাঁধে থাকতো খয়েরি রংয়ের একটি ব্যাগ। ব্যাগের মধ্যে সবসময় নিউজপ্রিন্টের কাগজ ও একটি ইলেকট্রো ৩৫ ক্যামরো থাকতো। ক্যামেরার মধ্যে ইলেকট্রো ৩৫ নামের ক্যামেরাটি ছিল সবচেয়ে নিম্নমানের। পরবর্তিতে ইলেকট্রো ৩৫ ক্যাামেরাটি পাল্টিয়ে এফএক্স ৩ ক্যামেরা ব্যবহার করি।

বিজ্ঞাপন

তখন দেশ পরিচালনা করছেন সেনা শাসক এইচ এম এরশাদ। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তখন তিনি পুলিশ বাহিনীসহ তার নিজস্ব দলীয় বাহিনীকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষনেতা থেকে শুরু করে তৃণমুল নেতা-কর্মীদের অমানবিক নির্যাতন করতে থাকে।

১৯৮৭ সালের শুরু থেকে রাজপথ উত্তপ্ত। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, কবি-সাহিত্যিক সকলের কন্ঠে একই সুর... ‘হটাও এরশাদ, বাঁচাও দেশ’। এই দাবিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়েত, কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ, বাসদ-সহ সকল দলের মিছিল মিটিং সভা সমাবেশ প্রতিদিনই থাকতো।

বিজ্ঞাপন

প্রতিদিনই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশী হামলা চলতো। রাতে নেমে আসতো বিরোধীদলের নেতাদের ওপর নির্যাতন। সকল বিরোধীদলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে চোখ বেঁধে নেওয়া হত অজ্ঞাতস্থানে।

১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর দেশের তিনটি রাজনৈতিক জোট... আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দল ও জাসদ নেত্রত্বাধীন ৫ দল যুগপৎভাবে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করে। ডাক দেয় ‘চল চল ঢাকা চল’ কর্মসূচি।

বিজ্ঞাপন

আমি ওই দিন খুব সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে চলে আসি। ক্লাবের বাইরে দাড়িয়ে থাকি। আস্তে আস্তে মিছিল আসতে থাকে চারিদিক থেকে। খাকি পোষাকে পুলিশ বেতের ঢাল নিয়ে দাড়িয়ে আছে। ওই সময় মিছিলকারীরা পুলিশকে ‘ঠোলা’ বলে ডাকতো।

সকাল থেকেই রাজধানীরে চারিদিক থেকে মিছিল আসতে থাকে। ফটোসাংবাদিকরা তৎপর। আমি যেহেতু নতুন এবং সবার চেয়ে ছোট তাই আমাকে কেউ পাত্তা দিত না। অনেক সময়ই তারা ধমক দিয়ে কথা বলতেন। বড়দের সালাম দিতে দিতে অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ার মত অবস্থা হতো। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন তুখোড় ফটোসাংবাদিক বুলবুল আহমেদ, পাভেল আলমাঝি। তারা আমাকে দেখলে কেমন আছ? বলে গাড়ীতে (মটরবাইকে) তুলে নিতেন। এই দুই জনের মধ্যে হিংসা দেমাক অহংকার ছিল না। ওই দিন তারাও আমাকে আগের মত কাছে টেনে নেননি।

বিজ্ঞাপন

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বেলা যত বাড়ছে ততই মিছিল মিটিংয়ে লোক সমাগম বাড়ছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী। হঠাৎ করে মিছিলের মধ্যে একটি যুবককে দেখতে পাই। তার খোচা খোচা দাড়ি, গায়ের শার্ট কোমড়ে বাধা। বুকে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, পিঠে লেখা গণতন্ত্র মুক্তিপাক’। ওই যুবকই নূর হোসেন।

উপস্থিত ফটোসাংবাদিকরা নূর হোসেনের ছবি তোলার জন্য তৎপর হয়ে উঠলো। তখন নিউ নেশনের ফটোসাংবাদিক পাভেল রহমান দ্রুত মিছিলের মধ্যে ঢুকে নূর হোসেনের ছবি তুলেছেন। এরপর তাকে দেখলাম দৌড়ে গিয়ে মিছিলের সামনে অবস্থান নিয়ে ছবি তুলছেন। অন্যান্য ফটোসাংবাদিকরারা ছবি তুলছেন।দেশের খ্যাতমান ফটো সাংবাদিক রশিদ তালুকদার, মো: আলমসহ অনেকেই মিছিলের সামনে গিয়ে দৌড়াচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ওই সময় পুলিশের ওয়াকিটকিতে ম্যাসেজ আসছে ‘গায়ে স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক লেখা ছেলেটিকে ফলো করো’। পুরানা পল্টপন মোড় ঘুরে মিছিলটি জিরো পয়েন্টর কাছে যাওয়ার সময় একটি সাদা গাড়ী আসে। হঠাৎ গুলির শব্দ। মিছিল ভেঙে যায়। গুলি খেয়ে নূর হোসেন বুক চেপে কিছু সমানে গিয়ে পড়ে। নূর হোসেনকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

এরপরই বিরোধীদলগুলো ১১ ও ১২ই নভেম্বর সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করে। ফলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরও ত্বরান্বিত হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করেন।

এরপর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী-শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয় দেশে। এর পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। এক বছর পর সরকারের পক্ষ থেকে নূর হোসেনের মৃত্যুর দিনটি সরকারিভাবে উদযাপনে উদ্যোগ গৃহীত হয়। দিনটিকে প্রথমে ঐতিহাসিক ১০ই নভেম্বর দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলেও আওয়ামী লীগ এটিকে শহিদ নূর হোসেন দিবস করার জন্য সমর্থন প্রদান করে এবং এই নামটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে।

১৯৯৬ সালে এরশাদ জাতীয় সংসদে নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তার দল জাতীয়পার্টি এখন ১০ই নভেম্বরকে গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করে।

লেখক: স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট; সারাবাংলা ডট নেট

সারাবাংলা/রমু/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন