রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

শ্রম কেনাবেচার হাটে একবেলা

এপ্রিল ৩০, ২০১৮ | ১১:২৭ অপরাহ্ণ

।। রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম ব্যুরো: রোববার (২৯ এপ্রিল) ভোর সাড়ে ৬টা। চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার তেলিপট্টি মোড়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ভোরের নীরবতা ভেঙ্গে একদল মানুষের হাকডাক চলছে।

মানুষগুলোর কারও হাতে কাস্তে-কোদাল, কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি, কারও হাতে দড়ি আর কাঠ দিয়ে বানানো ভারি জিনিস টানার বাহন। ওগুলো সরঞ্জাম। তবে মূল যা নিয়ে তারা এখানে বসেছেন তা তাদের শরীর। কেউ লম্বা, কেউ বেটে। কেউ সুস্থ্য-সবল, কেউ রোগা-পাতলা। ওটাই মূলত বিক্রি হয়।

এ এক নিত্যদিনের চিত্র। প্রতিটি ভোরেই এখানে বসে এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর হাট, যে হাটে প্রতিদিন কেনাবেচা হয় তাদের শ্রম। আসলে প্রতিটি মানুষই তাদের নিজেদের বিক্রি করে দরকষাকষির হাটে।

বিজ্ঞাপন

তেলিপট্টির মোড়ে প্রতিদিন ভোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকে মানুষগুলো। সামনে থাকে সরঞ্জাম। ভোর গড়িয়ে সকাল হতেই ক্রেতার আনাগোণা বাড়তে থাকে।

‘অ্যাই তুই যাবি? কত নিবি? তোর বয়স হয়ে গেছে, তোকে নেব না।’

‘মাঝি আমারে নেন, আমারে নেন, পোষাই দিমু।’

এমনই সে দরকষাকষির ভাষা। আর সফল দরকষাকষিতে বিকোয় শ্রম।

সময় গড়ায়। ধীরে ধীরে খালি হতে থাকে হাট। কেউ কেউ কাজ পেয়ে চলে যান ঠিকাদারের (মাঝি) সঙ্গে। কেউ কেউ কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকেন। এর মধ্যে বয়ষ্করাই বেশি। তবে অভিজ্ঞতার দরেও বিক্রি হয় কারো কারো শ্রম।

দিনের শ্রম বেচতে না পেরে কেউ কেউ ঘরে ফিরে যান। কেউ কেউ আবার অন্য কোন কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। একসময় খালি হয়ে যায় তেলিপট্টি মোড়ের শ্রম বাজার।

এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর বড় অংশই নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে ইট-বালু, সিমেন্ট, লোহার রড টানার কাজ করেন। কেউ কেউ ভবন ভাঙার কাজে। কেউ কেউ বিক্রি হন অন্য কোন কাজের জন্য। চট্টগ্রামে তাদের ডাকা হয় ‘সিটকাবারি’। নোয়াখালী-কুমিল্লার লোকজন বলেন ‘বদলা’। জামালপুর-রংপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন ডাকেন ‘কামলা’ বলে। তবে ঠিকাদার আর শ্রমজীবী মানুষগুলোর অধিকাংশই চট্টগ্রামের বাইরের হওয়ায় বদলা আর কামলা ডাকই চলে বেশি। বদলা আর কামলা ডাকের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় তাদের মানুষ পরিচয়।

তেলিপট্টির মোড়ে কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে। নওগাঁ জেলার আত্রাই থেকে আসা মো. মিলন (২৮) গত ৮ বছর ধরে এই হাটে নিজেকে তুলে শ্রম বিক্রি করছেন। চট্টগ্রাম নগরীর রাহাত্তাপুল এলাকায় আরও কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে বাসা ভাড়া করে থাকেন। স্ত্রী-ছেলেমেয়ে থাকেন বাড়িতে।

মিলন সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের এলাকায় কাজের সুযোগ কম। সেজন্য চট্টগ্রাম শহরে এসেছিলাম। মাসে অন্তত ১৫ দিন কাজ পাই। কয়েকজন মাঝি আছেন আমাকে বেছে নেন। মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা ইনকাম করি।

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের ইউনূস (৩৩) কাজ করছেন ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি অবশ্য স্ত্রী, তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে বাকলিয়া এলাকায় থাকেন।

ইউনূস সারাবাংলাকে বলেন, মাঝি ডাক দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজে চলে যাই। কোনদিন সকাল ৮টা থেকে, কোনদিন ৯টা থেকে কাজ শুরু করি। আমাদের কাজ হচ্ছে, বিল্ডিংয়ের উপর ইট-বালু, সিমেন্ট তুলে দেওয়া। সন্ধ্যা ৬টা-৭টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কোনদিন ৭০০, কোনদিন ৮০০ টাকা পাই। রাত পর্যন্ত কাজ করলে ১০০০ টাকা পর্যন্ত পাই।

নওগাঁর আত্রাইয়ের অপর শ্রমিক মো.রাজ্জাক (৩৬) সারাবাংলাকে বলেন, মাঝি এককভাবে কাউকে নেন না। উনার যদি ১০ জন লাগে, বেছে বেছে ১০ জনকে নেন। ৫ জন লাগলে ৫ জন নেন। দরদাম করেই তারপর আমাদের কাজ দেন।

কয়েকজন মাঝির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঝি কিংবা ঠিকাদার মানে মূলত রাজমিস্ত্রি ও নির্মাণ কারিগর। বিভিন্ন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি মালিকের কাছ থেকে তারা ভবন তৈরি করে দেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। নিজস্ব শ্রমিকের বাইরে সহকারী হিসেবে নেওয়া হয় তেলিপট্টির হাট থেকে।

জামালপুরের বাসিন্দা মাঝি ফুল মিয়া (৪৫) আগে তেলিপট্টির মোড়েই শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ১৫ বছর আগে থেকে তিনি রাজমিস্ত্রির পেশায় থিতু হয়েছেন।

ফুল মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, বিল্ডিংয়ের মালিক আমাদের অর্ডার দেন। আমরা কাজ বুঝিয়ে দিই। একটা বিল্ডিং বানাতে অনেক সহকারী লাগে। সেই সহকারী কোন সরবরাহকারীর কাছ থেকে আমরা নিই না। নিজেরাই তেলিপট্টির মোড়ে এসে নিয়ে যায়।

এই শ্রমিক কেনাবেচার হাটে আবার বৈষম্য আর বঞ্চনার দুঃখগাঁথাও আছে। শ্রমিকরা জানালেন, এই হাটের অনেক শ্রমিক আছেন যারা জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে পৌঁছেছেন। সাধারণত চল্লিশোর্দ্ধ শ্রমিদের চাহিদা এই হাটে নেই বললেই চলে। ২০ বছর থেকে ৪০ বছর বয়সী শ্রমিকরাই থাকে মাঝিদের টার্গেট। এরপরও চল্লিশোর্ধ শ্রমিকদের যদি কাজে ডাকাও হয়, তাদের বেতন অন্যদের চেয়ে কমপক্ষে ২০০ টাকা কম হয়। তাও স্রেফ অভিজ্ঞতার খাতিরে।

চল্লিশ পেরুনো এমনই একজন বগুড়া জেলার মো. রফিক। কাজের সন্ধানে আসা এই শ্রমিকের চোখেমুখে একরাশ হতাশার ছাপ। দীর্ঘশ্বাস চেপে সারাবাংলাকে বলেন, মাসে ভালো করে সাতদিনও কাজ পাই না। কাজ দিলেও সারাদিন পরিশ্রমের পর ৫০০ টাকা বেতন দেয়। পোষায় না। ভাবছি বাড়ি চলে যাব। ক্ষেতেখামারে কাজ করব।

মাঝি কুমিল্লার কামাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, বয়স বাড়লে কাজ কমে যাবে, এটা তো খুবই স্বাভাবিক। একজন যুবক যেভাবে ইট-বালু টানতে পারে, বয়স্ক একজন লোক কি সেভাবে পারবে? কাজ যে বেশি করবে, সে-ই তো বেশি টাকা পাবে।
তবে মাঝি ফুল মিয়া এই যুক্তি মানতে নারাজ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, বয়স হয়ে গেছে মানে তো একজন শ্রমিক ফেলনা না। যে লোক ২০-৩০ বছর ধরে এই কাজ করছে তার অভিজ্ঞতা অনেক। একটা ইয়াং ছেলে পরিশ্রম করে কিন্তু কাজ বুঝে না। একজন বয়স্ক শ্রমিক তার চেয়ে কাজ কম করতে পারলেও বুঝে বেশি। বয়স্করা কাজে ফাঁকি দেন না।

ঠিক কবে থেকে তেলিপট্টির মোড়ে এই শ্রমিক কেনাবেচার হাট বসছে, তার হিসেব জানা নেই কারও কাছে। তবে কেনাবেচার হাটে দরদামে বিক্রি হওয়া এই মানুষগুলোই নগর সভ্যতার নেপথ্য কারিগর। কারণ তাদের ঘামেশ্রমেই এই শহর হয়ে্ উঠেছে কথিত শহুরে সভ্য নাগরিকদের আবাসস্থল।

সারাবাংলা/আরডি/এমএম

** দ্রুত খবর জানতে ও পেতে সারাবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখুন: Sarabangla/Facebook

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন