বিজ্ঞাপন

মেসিরা আসবেন?

January 22, 2023 | 7:20 pm

মাহমুদুল হাসান শামীম

আমি আর্জেন্টিনার নিখাদ সমর্থক। লিওনেল মেসির পাঁড় ভক্ত। বার্সেলোনা আমার প্রিয় দল কিন্তু মেসির জন্য এখন নিয়মিত দেখি পিএসজির খেলা। মেসি বাংলাদেশে এলে আমি খুশি হব। খুশি হবেন বাংলাদেশে মেসির লাখো ভক্ত। কিন্তু এই খুশি কিসের বিনিময়ে? ১০০ কোটি টাকারও বেশি খরচের একটি ম্যাচের বিনিময়ে?

বিজ্ঞাপন

মেসিরা আসবেন। কেন আসবেন? বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের সমর্থকরা আর্জেন্টিনা দলকে আন্তরিক, নি:স্বার্থ সমর্থন দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতা জানাতে। তাহলে কোন আপত্তি হয়তো কারোরই থাকবে না। মেসিরা নিজের খরচে আসবেন কিংবা বাংলাদেশই হয়তো তাদের নিয়ে আসবে। এ ক্ষেত্রে মেসিরা এলে সংসদ ভবনের সামনে লাখো জনতার উপস্থিতিতে তাদের গণসম্বর্ধনা দেয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ডেকে তাদের সম্মানিত করতে পারেন। মেসিরা হয়তো বাংলাদেশের ফুটবলারদের সঙ্গে কোন ফর্মে ফুটবল ম্যাচও খেলতে পারেন। তাহলে পুর্ণ হবে ষোলকলা। বাংলাদেশের কোটি কোটি আর্জেন্টাইন ভক্তের ভালবাসার সম্মান জানাতে পারবেন মেসিরা। আবার গণসম্বর্ধনায় বিশাল সংখ্যক ভক্ত তাদের প্রিয় তারকাদের দেখতে পাবেন সামান সামনি । আর বাংলাদেশের যে কিশোর, তরুণ বা জাতীয় দলের ফুটবলার যারা মেসিদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাবেন তারা অনুপ্রাণিত হবেন। ফুটবল নিয়ে তারা বুনবেন স্বপ্নের নতুন জাল। সর্বোচ্চ স্তরের আতিথেয়তা ও সম্মাননা এবং লাখো মানুষের ভালবাসায় মেসিরা দেখবেন এক অনিন্দ্য বাংলাদেশকে।

অন্যদিকে কৃতজ্ঞতা জানাতে বা ভক্তদের দর্শন দিতে আসার জন্য তাদেরকে যদি ৭ মিলিয়ন ডলার দিতে হয় তাহলে সিংহভাগ মানুষেরই ঘোরতর আপত্তি থাকবে মেসিদের সফরের ব্যাপারে। কারণ আর্জেন্টিনাকে দিতে হবে ৭ মিলিয়ন, তাদের প্রতিপক্ষ দলকে দিতে হবে অনন্ত ৩মিলিয়ন ডলার মানে ১০ মিলিয়ন ডলার টাকার অংকে প্রায় ১০৫ কোটি টাকা। তারপর উপর আবাসন, আতিথেয়তা, ম্যাচ আয়োজনে খরচ হবে আরো অনন্ত ১০ কোটি সব মিলিয়ে খরচ ১১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বড় কথা ১০ মিলিয়ন দিতে হবে টাকায় নয় ডলারে। ডলার নিয়ে দেশে প্রবল সংকটের কথা তো সবারই জানা। ডলার বাঁচাতে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে নানান বাধ্যবাধকতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রবাসীরা যেন রেমিটেন্স ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠান সে জন্য নানা প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতি সংকট সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যেককে মিতব্যয়ী, সাশ্রয়ী এবং সঞ্চয়ী হতে অনুরোধ করছেন। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কৃচ্ছতা সাধনের কঠোর নির্দেশনা দিচ্ছেন। এমনকি এই কদিন আগে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কৃচ্ছতা সাধনের জন্য সব ফেডারেশনকে বিদেশে দল পাঠানোর ব্যাপারে সতর্ক ও হিসেবি হতে নির্দেশনা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একটি ম্যাচের জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ যৌক্তিক নয়।

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ বলবেন বাংলাদেশের আর্জেন্টাইন ভক্তরা মেসিদের সামনা সামনি দেখার সুযোগ পাবেন। ঢাকা স্টেডিয়ামে কতজন খেলা দেখার সুযোগ পাবেন। পঞ্চাশ হাজার? বাকীদের তো টিভিতেই দেখতে হবে। কেই বলবেন মেসিরা এলে ফুটবল জাগরণ ঘটবে। ১২ বছর আগে ২০১১ সালেও তো বাফুফে মেসিদের এনেছিল। নাইজেরিয়ার সঙ্গে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলেছিলেন তারা ঢাকা স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশের ফুটবলের কি জাগরণ হয়েছে? কি উন্নতি হয়েছে। তখন ফিফা র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ছিল ১৫৭ তে এখন ২১১ দেশের মধ্যে ১৯২ তে।

বাফুফের ফান্ড বাড়বে। সে সম্ভবনা কম। সেবার মেসিদের দিতে হয়েছিল ৩ মিলিয়ন ডলার। বাফুফে সেটা জোগাড় করতে পারেনি। লোন করে আয়োজন করা সে ম্যাচ থেকে লাভ তো দূরের কথা ১২ বছরেও ধার শোধ হয়নি। বিভিন্ন ইভেন্টে পাওনাদারদের ব্যানার বিলবোর্ড টাঙ্গিয়ে সেই দেনা এডজাস্ট করা হচ্ছে। এখনতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশেও ব্যবসা বাণিজ্য সব কিছুতেই টানাপোড়ান চলছে। সেবারই প্রত্যাশিত স্পনসর পাওয়া যায়নি। এবার চাপ দিয়ে , প্রভাব খাটিয়েও স্পনসর পাওয়া কঠিন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সব ক্ষেত্রেই যেখানে কৃচ্ছতা চলছে সেখানে সরকারও কি একটি ম্যাচের জন্য এত ডলার খরচ করতে চাইবে?

বিজ্ঞাপন

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন ক্রীড়া মন্থ্রণালয় এ ব্যাপারে কিছু জানে না। বাফুফে তাদের কিছু জানায়নি। বাংলাদেশে কোন দল আনতে হলে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনতে হয়। তিনি আরো বলেছেন বাফুফে এমনিতে তীব্র আর্থিক সংকটে আছে। ১০০ বা ২০০ কোটি টাকা যাই হোক না কেন বাফুফে অর্থ সংকটের কারণে যেখানে চলতে পারছে না সেখানে এত টাকা খরচ করে দল এনে দেশের ফুটবলের কি লাভ হবে সেটি অন্যদের মতো তিনিও বুঝতে পারছেন না।

অন্য দিকে ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ইমেজ বাড়বে ? সে সম্ভাবনাও কম। ১২-১৪ বছরে যেখানে ফিফা র‍্যাংকিংয়ে একটি দেশের অবস্থান দেড়শোর কাছাকাছি থেকে নামতে নামতে ১৯২ তে পৌঁছে সেই ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের সামর্থ্য, যোগ্যতা,দক্ষতা নিয়ে যে কারোরই প্রশ্ন জাগবে ? ইমেজ বাড়াতে হলে দেশের ফুটবলের মাঠের পারফরমেন্স আর সাংগঠনিক তৎপরতার দিকে নজর দিতে হবে। কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে বেশুমার অর্থ খরচ করে। তাদের আছে। খরচ করেছে। কিন্তু দলকে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন করে কাতারের ফুটবল কর্তারা তাদের আসল কাজে যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জনে, ইমেজ বাড়ানোর পথে এগিয়েছেন। সৌদি আরব বিশ্বকাপে ভালো করে এখন ইমেজ বাড়াতে স্প্যানিশ এল ক্লাসিকো, পিএসজির সঙ্গে সৌদি লিগের অল স্টার দলের ম্যাচ আয়োজন করছে। তাদের একটি লক্ষ্য আছে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক হতে চায় তারা।

বিজ্ঞাপন

সৌদি আরব যে ম্যাচগুলো আয়োজন করছে সেগুলো বাণিজ্যিক ইভেন্ট। ইমেজ বৃদ্ধির সাথে সাথে বিপুল আয়ও হচ্ছে। বাফুফেও মেসিদের নিয়ে বাণিজ্যিক ম্যাচ আয়োজন করতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে ম্যাচটি বিপণন করে যদি ডলার সংগ্রহ করতে পারে এবং তা দিয়ে মেসিদের পেমেন্ট করতে পারে তাহলে নিশ্চয়ই এমন ধরণের ম্যাচ আয়োজনে কারোর আপত্তি থাকবে না। ১১০ কোটি খরচ করে যদি ৫ কোটি টাকাও বাফুফের ফান্ডে যোগ হয় তাহলেও সবাই সাধুবাদ জানাবে। কিন্তু অর্থনৈতিক কঠিন পরিস্থিতে দেশের ডলার বাইরে পাঠিয়ে এবং লস করে এ ধরণের আয়োজন করলে কথা উঠবেই। বাফুফে কর্তাদের গেল ১২-১৪ বছরের কর্মকান্ডে মানুষের মনে ব্যাপক নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে তাদের সম্পর্কে। মেসিরা যে খেলবেন এমন একটি স্টেডিয়াম তারা এক যুগেও তৈরি করতে পারেন নি। অন্যদিকে আর্থিক লেনদেনে দুর্নীতির অভিযোগে এরই মধ্যে ফিফা বাফুফের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারিকে শোকজ করেছে। বাফুফে এই ব্যাপারটি খোলাসা করেনি। এই অবস্থায় এমন আয়োজনে মানুষ আর্থিক নয়-ছয়ের প্রশ্ন তুলবে। বলা হবে ১০০ কোটির টাকার এ ম্যাচ থেকে দেশের ফুটবলের কোন লাভ হবে হবে না। পকেট ভারী হবে কারো কারোর। আর লাভ হবে বাফুফে কর্তাদের। ফুলের মালা হাতে মেসিদের সঙ্গে হাসি মুখে ছবি তুলবেন । দেশের ফুটবলের বারোটা বাজানোর পরও সাফল্যের গান গাইবেন - একবার না দুই বার মেসিদের আমরা এনেছি বাংলাদেশে। আর জনতা সোস্যাল মিডিয়ায় হাসি-ঠাট্টা,মশকরা-বিদ্রুপে মেতে উঠবেন। এরই মধ্যে সেটি হচ্ছে।

তারচেয়ে বরং বাফুফে যদি অল ইন্ডিয়া ফেডারেশনের সঙ্গে যৌথভাবে ভারতের চারটি ও বাংলাদেশের চারটি ক্লাব নিয়ে পদ্মা-গঙ্গা কাপ চালু করতে পারে তাহলে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্পনসর মিলবে, ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা সৃষ্টি হবে, বাফুফের আয়ের উৎস তৈরি হবে, দেশের ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের খেলোয়াড়দের জমজমাট ফুটবল দেখার সুযোগ পাবেন তাতে বাফুফে, দেশের ফুটবল এবং ফুটবলারদের উপকার হবে।

বিজ্ঞাপন

একই সঙ্গে দেশের ফুটবলের উন্নতির জন্য ভারতের মতো মহাপরিকল্পনা নিতে হবে বাফুফে কর্তাদের। কি করছে ভারত?

“ ভারত ২৪ বছর মেয়াদি ভিশন-২০৪৭ ঘোষণা করেছে এই কদিন আগে। ২০২৬ সালে তারা এশিয়ার সেরা দশে থাকতে চায়। ২০৩৬ সালে এশিয়ার সেরা সাতে জায়গা নিতে চায় এবং বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে শক্তিশালী দল হয়ে উঠতে চায়। ২০৪৭ সালে চায় এশিয়ার সেরা চারে থাকতে এবং বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলতে। এজন্য তারা স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদি তিন পর্বের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে সাড়ে তিনকোটি শিশুকে গ্রাসরুট পরিকল্পনার মধ্যে ফুটবল ট্রেনিংয়ে আনছে। সব ধরণের অবকাঠামোর সুযোগসুবিধাসহ দেশ জুড়ে ৫০টি পেশাদার ক্লাব তৈরি করছে। একটি ন্যশনাল ফুটবল পার্ক, একটি জাতীয় এবং প্রতিটি রাজ্যে একটি করে সেন্টার অব এক্সিলেন্স এবং প্রতিটি রাজ্যে ৫০টি করে ফুটবল মাঠ তৈরি করছে। ১২টি স্মার্ট এবং ফিফা মানের ৩০টি স্টেডিয়াম তৈরি করছে। তাদেরও টাকা নেই। সারা বছরের বাজেট মাত্র ১০০ কোটি রুপি। এটিকে ৫০০ গুণ বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে।

কাতার বিশ্বকাপে ভারতের ফুটবল কর্তারা শুধু খেলা দেখেন নি । তারা এএফসি ও ফিফা কর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন ভিশন - ২০৪৭ নিয়ে। এএফসি ও ফিফার ট্যাকনিক্যাল সহায়তা চেয়েছেন। ফিফার ফুটবল ডেভেলপমেন্ট কমিটি তাতে সায় দিয়েছে। তাদের কোচরা আগামী মাস থেকেই ভারতের তৃণমুল পর্যায়ে কাজ শুরু করছেন। কমিটির প্রধান আর্সেনালের সাবেক কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার নিজে ভারতের ফুটবল উন্নয়নে ও সাংগঠনিক অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনায় তার দলবল নিয়ে কাজ করবেন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সংবাদ বিশ্লেষক

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন