বিজ্ঞাপন

‘৮৮ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আলট্রাসনোগ্রামের সুবিধা নেই’

January 24, 2023 | 12:39 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশের ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলট্রাসনোগ্রামের সুবিধা নেই৷ জেলা পর্যায়েও ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলট্রাসনোগ্রাম সুবিধা পাওয়া যায় না। অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই সুবিধা থাকলেও তা মেশিন নষ্ট থাকায় তা ব্যবহার করা হয় না। আর তাই রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহের সুপারিশ জানানো হয়েছে এক গবেষণা প্রতিবেদনে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২৩ জানুয়ারি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিকস বিভাগের এপিডেমিওলজি শাখা থেকে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য জানা গেছে।

‘বাংলাদেশের জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে চিকিৎসকদের চ্যালেঞ্জ’—শীর্ষক গবেষণাটি স্বাস্থ্য অধিদফতরের হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট বিভাগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে সম্পন্ন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণাটি করেন বিএসএমএমইউ পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান ও তার সহযোগী দল।

২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশের ৯টি জেলা হাসপাতাল ও ১৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এতে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্ভে চেকলিস্টের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ৭৭ জন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন, সুপারিনটেনডেন্ট ও মেডিকেল অফিসার, আবাসিক মেডিকেল অফিসারদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সংগৃহীত তথা পর্যালোচনা করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ জেলা হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাম সুবিধা পাওয়া গেছে। মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাওয়া গেছে আলট্রাসনোগ্রাম সুবিধা।

বিজ্ঞাপন

গবেষণা প্রতিবেদন বিষয়ে জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের বড় সংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানে সেবা দেওয়ার সময় চিকিৎসকেরা বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ বা সমস্যার মুখোমুখি হন, যা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দেখা দেয়।’

গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশের বেশিরভাগ সংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল। এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসকরা বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। যা সঠিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের অন্তরায়। এ চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করা গেলে কর্মস্থলে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি কমিয়ে উন্নত সেবা দেওয়ার পরিবেশ তৈরি সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

শতকরা ৭৭ দশমিক ৮ ভাগ জেলা হাসপাতালে এবং শতকরা ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নারী রোগীদের, অ্যাটেনডেন্টদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি— উল্লেখ করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।

এতে জানানো হয়, দেশের শতভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের জন্য ডরমেটরি, কোয়ার্টার সুবিধা থাকলেও জেলা হাসপাতালে এর উপস্থিতি শতভাগ ৪৪ দশমিক ৪ ভাগ। শতকরা ৫২ দশমিক ৯ ভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের জন্য ব্যবহার উপযোগী ডরমিটরি, শতকরা ১৭ দশমিক ৬ ভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের জন্য থাকা ডরমিটরি ও কোয়ার্টারে গার্ড থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, অনুমোদিত পদের বিপরীতে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে শতকরা ৩০ ভাগ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতকরা ৬৩ ভাগ আবাসিক মেডিকেল অফিসারের পদ শূন্য রয়েছে। জেলা হাসপাতালে শতভাগ ৫১ ভাগ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতকরা ৭৭ ভাগ জুনিয়র-সিনিয়র কনসালটেন্ট শূন্য রয়েছে। জেলা হাসপাতালে শতকরা ৬৫ ভাগ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতকরা ৩৮ ভাগ মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন পদ শূন্য রয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, নার্সিং স্টাফ-মিডওয়াইফ পদের ক্ষেত্রে জেলা হাসপাতালে শতভাগ ১৫ ভাগ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতকরা ২৫ ভাগ পদ শূন্য পাওয়া গেছে। জেলা হাসপাতালে শতকরা ৫১ ভাগ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতকরা ৪২ ভাগ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও টেকনিশিয়ান পদ শূন্য।

এ ছাড়া জেলা হাসপাতালে শতকরা ২০ ভাগ ক্লিনার পদ শূন্য থাকলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য ক্লিনার পদের পরিমাণ শত ৬৬ ভাগ— এমন চিত্র উঠে আসে গবেষণার প্রতিবেদনে।

এছাড়াও রাজনৈতিক নেতাদের অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ ও প্রভাব, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কিছু গণমাধ্যমকর্মীর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ চিকিৎসকদের সেবা দানে বাধা সৃষ্টি করে বলে উল্লেখ করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।

স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে গবেষকরা কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন প্রতিবেদনে। এগুলো হলো-

১. মানসম্পন্ন স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সকল স্তরের শূন্য পদ পূরণ করা প্রয়োজন।

২. অর্জিত দক্ষতা অনুযায়ী চিকিৎসকদের যথাযথ পোস্টিং নিশ্চিত করা উচিত।

৩. পৃথক পরামর্শ রং, ওয়েটিং রুম, ডাক্তারের কক্ষ, চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের জন্য পরিস্কার টয়লেট সুবিধা,নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের উন্নতি করা প্রয়োজন।

৪. প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি রসদ, প্রশিক্ষিত জনবল, ল্যাবরেটরি পরিষেবাগুলি উন্নত করা দরকার।

৫. কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৬. চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর অ্যাটেনডেন্ট, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি করতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

৭. হাসপাতালের উপযুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৮. চিকিৎসকদের জন্য মানসম্মত আবসন সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৯. চিকিৎসকদের পোস্টিং, বদলি এবং পদোন্নতির জন্য যুগোপযোগী নীতিমালা তৈরি এবং বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

১০. চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রয়োজনীয় সংশোধন করা এবং চিকিৎসকদেরকে পূর্বশর্ত সম্পূর্ণ করার সাথে সাথে পছন্দসই বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুষলেন উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জনবল সঙ্কটের কথা স্বীকার করলেও দেশের উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অব্যবস্থাপনার জন্য সেসব প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ও সিভিল সার্জনদের দুষছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানপ্রধান ভালো হলে বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী, দুই তৃতীয়াংশ হাসপাতালের এক্স-রেসহ সব মেশিনপত্র নষ্ট। এগুলোর দায় সিভিল সার্জন এবং ইউএইচএফপিওদের নিতে হবে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি যদি ফাংশনাল না থাকে তাহলে তার কাজটা কী? বেশিরভাগ রোগী পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন বাইরে করে?’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিভাগ নিয়ে আমরা গর্ব করি। আমাদের সবার সম্মিলিত ইচ্ছা থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও ভালো এবং পরিবর্তন করতে পারি। এই পরিবর্তন আমাদেরই করতে হবে। অন্যকেউ এসে পরিবর্তন করবে না। চিকিৎসকরা যেন জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে থাকেন সেজন্য যা যা করা প্রয়োজন, আমরা পর্যায়ক্রমে সেটা করে দেওয়ার চেষ্টা করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘রোগীরাও যেন হাসপাতালে এসে ভালো পরিবেশ এবং চিকিৎসা পায়। হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে এসে কেউ যদি দেখে ডাক্তার নাই, তাহলে তার অনুভূতিটা কেমন হবে? পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা এক্সরে করতে গিয়ে যদি দেখে মেশিন খারাপ, এই বিষয়গুলো যেন না ঘটে সেই দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’

হাসপাতালগুলোর নোংরা পরিবেশ ও অস্বাস্থ্যকর টয়লেটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে একজন পরিচালক রয়েছেন, টয়লেট যদি অপরিষ্কার থাকে, হাসপাতাল যদি অপরিচ্ছন্ন থাকে, হাসপাতালে যদি পানি না থাকে, তাহলে সেই পরিচালকের কাজ কী, তিনি কী করেন। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি যদি ফাংশনাল না থাকে তাহলে তার কাজটা কী? বেশিরভাগ রোগী পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন বাইরে করে?’

জাহিদ মালেক বলেন, ‘সারাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক কম। অনেক হাসপাতালে রোগী বেশি হওয়ায় চিকিৎসকদের কাজের চাপ বেশি থাকে। যেখানে ২০ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে যদি ১০ জন বা আটজন থাকে, তাহলে চাপতো বাড়বেই। যত চিকিৎসক থাকার কথা কথা, সেখানে আমাদের কিছু ঘাটতি রয়েছে, এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা হাসপাতাল তৈরি করেছি মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। মানুষ চিকিৎসা পেলে আমাদের চাকরি থাকবে। জনগণের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করলে আগামীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও ভালো হবে।’

সারাবাংলা/এসবি/ইআ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন