বিজ্ঞাপন

‘অরক্ষিত’ জন্ম নিবন্ধন সার্ভার, ভূত কি সর্ষের ভেতর?

January 24, 2023 | 7:54 pm

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের মূল নিয়ন্ত্রণে থাকা অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমের সার্ভারে ‘অবৈধ প্রবেশের’ তথ্য পেয়েছে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কয়েকটি ওয়ার্ডে শতাধিক ভুয়া জন্ম নিবন্ধন নিয়ে তদন্তে নেমে সংস্থাটি আরও জানতে পেরেছে, সার্ভারের ‘আংশিক’ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র এসব কাজ করে আসছে।

বিজ্ঞাপন

এমন অবস্থায় জালিয়াত চক্র হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে না কি মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে আইডি-পাসওয়ার্ড নিয়ে সার্ভারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি তদন্তে নেমেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার অভিযোগে এক কিশোরসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাইরে থেকে যে সার্ভারে অ্যাটাক হয়েছে বা হচ্ছে, এটা দেখাই যাচ্ছে। এটা একদম ক্লিয়ার। এই অ্যাটাকে ভেতর থেকে কেউ সহযোগিতা করছে কি না, সেটা আমরা এখনও নিরূপণ করতে পারিনি। তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে জন্ম নিবন্ধন বিষয় আইন প্রণয়ন করে। ২০০৬ সালে ১৮টি কাজের জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করে এ আইন কার্যকর করা হয়। শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে জন্ম সনদ দেয়া হতো। ২০১১ সালে জন্ম সনদ নেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য অনলাইনে এন্ট্রি শুরু হয়। ২০১৩ সালে সরকার আইন সংশোধন করে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়কে জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়। ২০২১ সালের মার্চ থেকে নতুন সার্ভারের মাধ্যমে সবধরনের জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে করা হচ্ছে।

এর মধ্যে, গত দুই বছরে চট্টগ্রামে ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে কিছু অভিযোগ পাওয়া যায়। সর্বশেষ গত ৮ জানুয়ারি ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডে ৪০টি, ৯ জানুয়ারি ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ১০টি এবং ২১ জানুয়ারি ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডে ৮৪টি ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের অস্তিত্ব পাওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে তদন্তে নামে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী এ সংক্রান্ত এক সভায় ‘সার্ভার হ্যাক’ করে ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের অভিযোগ আনেন। তবে সার্ভার হ্যাক হওয়ার পক্ষে এখনও কোনো তথ্যপ্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছেন ‘ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের’ রহস্য উদঘাটনের দায়িত্বে থাকা সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (এডিসি) আসিফ মহিউদ্দীন।

সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও ওয়ার্ডের জন্ম নিবন্ধন সহকারীর কাছে সার্ভারে প্রবেশের আলাদা-আলাদা আইডি ও পাসওয়ার্ড আছে। জন্ম নিবন্ধন সহকারী আবেদনের তথ্য প্রাইমারি অ্যাপ্রুভাল এবং কাউন্সিলর ফাইনাল অ্যাপ্রুভাল দিলে সেটি সার্ভারে ইনপুট দেওয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে এটি হ্যাকিংয়ের কোনো ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। তবে এটুকু বলা যায় যে, সার্ভারের সেইফটি সিকিউরিটি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের ঘটনায় সোমবার ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের জন্ম নিবন্ধন সহকারী আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে নগরীর খুলশী থানায় মামলা দায়ের করেন। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এদিন রাতে নগরীর পতেঙ্গা থানার খালপাড় পকেটগেট এলাকা থেকে চার জনকে আটক করে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখায়।

গ্রেফতার চারজন হলো- আব্দুর রহমান আরিফ (২৫), দেলোয়ার হোসেন সাইমন (২৩), মোস্তাকিম (২২) এবং তার ১৬ বছর বয়সী শ্যালক। এরা ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের বাসিন্দা।

বিজ্ঞাপন

এদের মধ্যে আব্দুর রহমান আরিফ পতেঙ্গা খালপাড় এলাকায় ‘আরিফ কম্পিউটার এন্ড স্টুডিও’ নামে একটি দোকানের মালিক। ইপিজেড নারকল তলা এলাকায় ‘এস এম কম্পিউটার’ নামে সাইমনের একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। মোস্তাকিম ও তার শ্যালক এসব প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ব্যবহার করে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন করতো বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

এডিসি আসিফ মহিউদ্দীন জানান, গ্রেফতার চারজন মূলত মাঠ পর্যায়ে জন্ম নিবন্ধন করে দেওয়ার জন্য লোকজন সংগ্রহ করে। প্রাথমিক তথ্য নিবন্ধনের কাজ করে তারা। তিনটি ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে তারা সহজে জন্ম নিবন্ধন সনদ সৃষ্টি ও বিতরণের প্রলোভন দেখিয়ে লোকজন সংগ্রহ করতো। এগুলো হচ্ছে- বার্থ অ্যান্ড ডেথ রেজিস্ট্রেশন, বার্থ সার্টিফিকেট অ্যান্ড লেট রেজিস্ট্রেশন এবং হেল্প অব বার্থ অ্যান্ড ডেথ রেজিস্ট্রেশন।

জন্ম নিবন্ধনে আগ্রহীদের কাছ থেকে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে সেটা পিডিএফ ফরম্যাটে পাঠিয়ে দেওয়া হতো ‘বসের’ কাছে। কথিত বস সেটা সার্ভারে ইনপুট দিত। এডিসি মহিউদ্দীন জানান, ‘এরকম চার/পাঁচজন বস আছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। তাদের ধরতে পারলেই কিভাবে তারা সার্ভারে প্রবেশ করে সেই তথ্য পাওয়া যাবে। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যেসব ভুয়া জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছে, এর প্রায় সবগুলোর ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর ভুয়া। এ কারণে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন যাদের হয়েছে, তারা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা কি না সেটা যাচাই করা কঠিন।’

এদিকে, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, কমপক্ষে পাঁচ হাজার ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের তথ্য তারা গ্রেফতার চারজনের কাছ থেকে পেয়েছেন। প্রতিটি জন্ম নিবন্ধনের জন্য তারা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা নেন। এরা চারজন একই চক্রের সদস্য। এরকম চক্র আরও কয়েকটি চক্র আছে। প্রতিটি চক্রে ৩০ থেকে ১০০ জন কাজ করে।

সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘যে জন্ম নিবন্ধন তারা তৈরি করে সেটা আংশিক ভুয়া, আংশিক ঠিক। এর অর্থ হচ্ছে, তাদের তথ্যগুলো যেহেতু সার্ভারে থেকে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে আংশিক ঠিক আছে। তবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সেগুলো সার্ভারে দেওয়ার কারণে ভুয়া বলা হচ্ছে। এই চক্রের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের চার জন সদস্যকে আমরা গ্রেফতার করেছি। আরও কারা আছে তদন্তের মাধ্যমে সেটা আমরা বের করব।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কার্যালয়গুলোর আশপাশের কম্পিউটারের দোকানগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কমকর্তারা।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালেও নগরীর ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে সাতটি, ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গায় সাতটি এবং ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গায় চারটিসহ মোট ১৮টি ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এ সংক্রান্ত পৃথক তিনটি মামলা তদন্ত করছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন