বিজ্ঞাপন

গত বছর ৫৬০ শিশু ধর্ষণ, বেশিরভাগের বয়স ১২ বছরের মধ্যে

January 25, 2023 | 12:07 am

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ২০২২ সালে ৫৬০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৮১ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮৮ জনকে এবং ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করেছে ৩১৭ জন। অত্যন্ত কম বয়সী শিশুদের ধর্ষণের শিকার হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার শিশুর সর্বনিম্ন বয়স দুই। এ ছাড়া তিন/চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০২২: সংবাদপত্রের পাতা থেকে’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) পাঁচটি জাতীয় বাংলা দৈনিক ও তিনটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত শিশু অধিকার বিষয়ক সংবাদ পর্যালোচনা করে এই উপাত্ত তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

সংগঠনটি ২০১১ সাল থেকেই সংবাদপত্রকে উৎস ধরে শিশু সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের সংবাদ নিয়মিত সংরক্ষণ করে থাকে। তবে সংবাদ সম্মেলনে ২০২১ সালের সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে 'বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০২২' এর সার্বিকচিত্র উপস্থাপন করেন এমজেএফের কো-অর্ডিনেটর রাফেজা শাহীন।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অধিকাংশ শিশু-ধর্ষণ পারিবারিক পরিবেশে পরিচিতদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। পরিবারের পরিচিত লোকদের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হওয়া ছাড়াও, প্রতিবেশীদের হাতে শিশুদের একটি বড় অংশ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বেশিরভাগ শিশুকে খেলার সময় লোভ দেখিয়ে পরিচিতরা ধর্ষণ করছে। কিশোরীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বন্ধুদের দ্বারা, কর্মক্ষেত্রে, স্কুল যাওয়ার পথে ও পরিবারের ভেতরে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ এর তুলনায় ২০২২ সালে শিশু ধর্ষণের হার কমেছে ৩১.৫ শতাংশ। ২০২২ এর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৫৬০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৯৮ জন শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ১২ টি মেয়েশিশু। ২০২১ সালে শিশুধর্ষণের এই সংখ্যা ছিল ৮১৮ জন।

বিজ্ঞাপন

যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর সংখ্যা ২০২১ এর তুলনায় ২০২২ সালে কমে গেলেও, এই বছর ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার হার বেড়েছে। ২০২২ সালে মোট ৯৬ টি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে ছেলেশিশুর সংখ্যা ২০ জন, যা ২০২১ সালে ছিল ছয়জন।

২০২২ সালে বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে ২০৩১ জন শিশু। আর বাল্যবিয়ে আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত পারিবারিক কারণে। তবে বাল্য বিয়ের হার ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে এসে ৯৪ শতাংশ কমেছে। ২০২১ এ দেশের ২৩ টি জেলায় ৪১,০৯৫ টি বাল্যবিয়ের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালে বাল্যবিয়ের সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ২৩০১ টি। করোনার সময় অর্থাৎ ২০২০/২১ সালে স্কুল বন্ধ থাকায় ও অভাব-অনটনের কারণে বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পেলেও ২০২২ এসে তা অনেক কমে গেছে।

বিজ্ঞাপন

২০২২ সালে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার আশংকাজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে পানিতে ডুবে ৪০৫ জন শিশু মারা গিয়েছিল, ২০২২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১১৫২ জন। এদেরমধ্যে ৫২০ টি মেয়েশিশু ও ৬৩২ টি ছেলেশিশু।

বিভিন্ন কারণে রিপোর্টকালীন সময়ে আত্মহত্যা করেছে ৪৪ টি শিশু, যা ২০২১ তুলনায় কম। এদের মধ্যে ২৭ জন মেয়ে ও ১৩ জন ছেলে। ২০২১ সালে আত্মহত্যা করা শিশুর সংখ্যা ছিল বেশি অর্থাৎ ৭৮ জন। এদের মধ্যে ছেলেশিশু ৫৭ জন ও মেয়েশিশু ২১ জন।

মূলত পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়, পরিবারের উপর রাগ, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, উত্ত্যক্ত হওয়ার, ধর্ষণের শিকার হওয়ায় বা ধর্ষণ চেষ্টা করায়, ধর্ষণের বা শ্লীলতাহানির বিচার না পাওয়ায় এবং সাইবার ক্রাইম বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

২০২২ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে। ২০২২ সালে ৩১১ জন শিশু হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে এবং হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৪২ টি শিশুকে। ২০২১ সালে হত্যার শিকার হয়েছিল ১৮৩ জন শিশু।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিয়ে আলাদাভাবে আধেয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২২ সালে মোট ১১টি এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা ১৫ জন এবং সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। ১৫ জন গৃহকর্মী ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচজন নিহত, সাতজন আহত ও তিনজন আত্মহত্যা করেছে। নিহত গৃহকর্মীদের মধ্যে তিনজন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। দুইজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গৃহশ্রমে নিযুক্ত বেশিরভাগই শিশু এবং তারা শতভাগ নির্যাতনের শিকার জানিয়ে গৃহ শ্রমকে শিশুশ্রমের তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে এমজেএফ।

সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২১ সালে ৬৯ শিশু নিহত হলেও ২০২২ সালে এসে সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৯৬। ২০২২ সালে মোট নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ২০ জন। এরমধ্যে মেয়েশিশু ছয়জন ও ছেলেশিশু ১৪ জন। ২০২১ সালে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ছিল ৩৮ জন। এরমধ্যে মেয়েশিশু ৩১ জন ও ছেলেশিশু সাতজন।

২০২২ সালে যে ৩৫ টি শিশু অপরাধমূলক কাজে জড়িত, এদের মধ্যে ছয়জন মেয়েশিশুও আছে। তবে ২০২১ সালে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল ১২০ জন। এদের সবাই ছেলেশিশু।

২০২২ সালে অপহরণের শিকার হয়েছে ৩০ জন শিশু। অপহরণের কারণ হিসেবে টাকা, প্রেম, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, প্রতিশোধ গ্রহণ, পাচার ও মুক্তিপন দাবির কথা সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে।

শিশু নির্যাতনের ৬৬টি ঘটনার মাধ্যমে ৬৮ জন শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। ২০২১ সালে শিশু নির্যাতনের ১৬ টি ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতনকারী হিসেবে গৃহকর্তা, বাবা-মা, শিক্ষক, উত্ত্যক্তকারী, স্থানীয় চেয়ারম্যান, চাকরিদাতা, প্রতিবেশী এবং সৎ মা।

শিশুকে নিয়ে ২৬ টি বিষয়ের উপর নেতিবাচক খবর ছাপা হয়েছে ২০২৮টি। অন্যদিকে ইতিবাচক সংবাদ ছাপা হয়েছে ১২টি বিষয়ের ওপর ৬৭টি।

সংবাদ সম্মেলনে এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, এমজেএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী শিশুরা নিজের বাসায় নিরাপদ নয়। শিশু ধর্ষণ ও শিশুকে যৌন হয়রানি বন্ধ করার জন্য সবাইকে এখুনি জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে, নাহলে এই হার বাড়তেই থাকবে।

তিনি শিশু সুরক্ষায় নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের সবাইকে আরও বেশি সহৃদয়বান হওয়ার পাশাপাশি শিশু অধিকার রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আমরান খান, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স এর নির্বাহী পরিচালক রোকসানা বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা ও এমজেএফ এর সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর শাহানা হুদা রঞ্জনা।

প্রসঙ্গত, এমজেএফের বার্ষিক ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্য হলো শিশু সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতি নির্ধারণী সুপারিশ তুলে ধরা। জাতিসংঘ শিশু অধিকার কমিটি ২০০৯ সালে প্রণীত তাদের ‘বাংলাদেশ বিষয়ক সমাপনী পর্যবেক্ষণ’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি নিরূপণের জন্য নিয়মিত তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের একটি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল।

সারাবাংলা/আরএফ/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন