বিজ্ঞাপন

তাসফিয়ার মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ

May 3, 2018 | 10:08 pm

।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম ব্যুরো: মরদেহ উদ্ধারের প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের (১৬) মৃত্যু কী-ভাবে হয়েছে সেটা বের করতে পারেনি পুলিশ।

তাসফিয়ার বাবা হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করলেও পুলিশের সন্দেহ অন্যদিকে। নিবিড় তদন্তে নেমে পুলিশ এখন উত্তর খুঁজছে একটি প্রশ্নের। প্রশ্নটি হচ্ছে, চট্টগ্রাম নগরীর গোলপাহাড় মোড়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে তাসফিয়া কেন এবং কী-ভাবে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় গেল।

বিজ্ঞাপন

এই প্রশ্নের উত্তর পেলে তাসফিয়া খুন হয়েছে না-কি অন্য কোনোভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সেটা জানা যাবে বলে মনে করছেন নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি-কর্ণফুলী জোন) জাহেদুল ইসলাম। তিনি সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি ১ মে বিকেলে তাসফিয়া রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যে অটোরিকশায় উঠেছিলেন সেই অটোরিকশার চালককেও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

বৃহস্পতিবার (০৩ মে) সন্ধ্যায় এসি জাহেদুলের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল নগরীর গোলপাহাড় মোড়ে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে যান। ভিডিও ফুটেজ আবারও পর্যালোচনা করেন। এ ছাড়া তাসফিয়ার বাবা-মাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

বিজ্ঞাপন

এসি জাহেদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল, রেস্টুরেন্টে তাসফিয়া সালোয়ার-কামিজ পরে গিয়েছিলেন। কিন্তু লাশ পাওয়া গেছে ভিন্ন পোশাকে, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট এবং টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায়। এই তথ্য পাবার পর আমরা দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে গিয়ে ময়নাতদন্তের আগে পোশাকের ছবি আবারও সংগ্রহ করি। সন্ধ্যায় ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, পোশাক একই।

তিনি বলেন, পোশাকের বিষয়ে তদন্তের কিছু নেই। এখন শুধু মেয়েটি গোলপাহাড় থেকে কেন ও কিভাবে নেভালে গেল সেই প্রশ্নের উত্তরই আমরা খুঁজছি। অটোরিকশা চালককে পেলে সুবিধা হবে। আর একদিন-দুইদিন সময় পেলে আমরা রহস্য উদঘাটন করতে পারব।

বিজ্ঞাপন

তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, রেস্টুরেন্টের পোশাক এবং মরদেহ উদ্ধারের সময় তাসফিয়ার পোশাকের মধ্যে ভিন্নতা আছে। তদন্তে প্রভাব পড়বে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা সেই বিষয়টি খোলাসা করছেন না। এই অবস্থায় রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে তাসফিয়া সোজা পতেঙ্গায় গিয়েছিলেন না-কি মাঝখানে নিজের বাসা কিংবা অন্য কোথাও গিয়েছিলেন, সেটাও তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, তিন জন প্রত্যক্ষদর্শী আমাদের জানিয়েছেন, সেদিন সন্ধ্যায় তারা তাসফিয়াকে লাশ উদ্ধারের স্থানে একা বসে থাকতে দেখেছিলেন। মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সূত্রগুলো ধারণা করছে, সম্ভবত ঘুমের ওষুধ জাতীয় কিছু খাওয়ার পর তাসফিয়ার মৃত্যু হয়েছে। পাথরের উপর ঢলে পড়ার কারণেই মুখে আঘাত লেগেছে। অথবা রাতের অন্ধকারে তাকে ওইস্থানেই খুন করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক আলামত দেখে খুনের বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না।

বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে পতেঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গাজী ফৌজুল আমিন চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, তদন্ত করতে গেলে আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলতে হয়। সুনির্দিষ্ট তথ্য কিংবা ধারণা শেয়ার করতে হয়। সেই ধারণা থেকে অনেকে অনেককিছু বলছেন এবং আমরা সেগুলো নোট রাখছি। তবে আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতিতেই তদন্ত করছি।

এদিকে বৃহস্পতিবার তাসফিয়ার বাবা পতেঙ্গা থানায় যে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তাতে আসামি হিসেবে মো. ফিরোজ নামে এক কথিত যুবলীগ নেতার নামও আছে। এই মামলার পর আলোচনা আবার ভিন্নদিকে মোড় নিচ্ছে।

পুলিশ পরিদর্শক ফৌজুল আমিন সারাবাংলাকে বলেন, ফিরোজ নামে মুরাদপুর এলাকার এক যুবককে আসামি করা হয়েছে মামলায়। আমরা তাকে গ্রেফতারের জন্য খুঁজছি। তাকে কেন মামলায় আসামি করা হল, সেটা তদন্তের স্বার্থে আমরা এখনই প্রকাশ করতে পারব না।

মামলার মোট ৬ আসামির মধ্যে বাকিরা হলেন, গ্রেফতার হওয়া তাসফিয়ার বন্ধু ও এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান মির্জা (১৬), সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র শওকত মিরাজ ও আসিফ মিজান, আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসির ছাত্র ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম এবং ফিরোজের সহযোগী কথিত যুবলীগ কর্মী সোহায়েল ওরফে সোহেল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আদনান, শওকত, আসিফ এবং ইকরাম নাসিরাবাদ-মুরাদপুরকেন্দ্রীক একটি কিশোর গ্রুপের সদস্য। ‘রিচ কিডস’ নামে এই কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রক ফিরোজ। মোটর সাইকেলে করে ঘোরাঘুরি, তুচ্ছ ঘটনায় মারামারি, এলাকায় হিরোইজম প্রদর্শন করে এই গ্রুপের সদস্যরা।

পুলিশ সূত্রমতে, ১ মে বিকেল থেকে তাসফিয়া নিখোঁজের পর তার মায়ের ফোন পেয়ে আদনান তাদের বাসায় যান। এ সময় তাসফিয়ার বাবা মো. আমিন প্রথমে আদনানকে নিয়ে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে যান। পরে সেখান থেকে আবারও বাসায় যান। সেখানে আদনানকে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে ফিরোজ ও ইকরাম তাসফিয়াদের বাসায় গিয়ে দুই ঘন্টার মধ্যে তাকে খুঁজে দেওয়ার কথা বলে আদনানকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। এরপর রাতে তারা লাপাত্তা হয়ে যান।

পুলিশ পরিদর্শক ফৌজুল আমিন সারাবাংলাকে বলেন, ফিরোজ রাতে তাসফিয়াদের বাসায় গিয়েছিল, এটা আমরা শুনেছি। এগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজেকে যুবলীগ নেতা দাবি করা মো. ফিরোজ একসময় ভারতে বন্দি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের সহযোগী ছিলেন। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অস্ত্রসহ দুবার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। জেল থেকে বেরিয়ে ২০১৫ সাল থেকে ফিরোজ যুবলীগের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের ছবি ব্যবহার করে বিলবোর্ড টাঙিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন ফিরোজ।

বুধবার (০২ মে) সকালে নগরীর পতেঙ্গায় নেভাল একাডেমির অদূরে ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় চোখ, নাক-মুখ থ্যাতলানো অবস্থায় তাসফিয়ার মরদেহ পায় পুলিশ। প্রথমে পরিচয় নিশ্চিত না হলেও দুপুরে পরিবারের লোকজন থানায় গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।

তাসফিয়া কক্সবাজার জেলা সদরের ডেইলপাড়া এলাকার মো. আমিনের মেয়ে। চট্টগ্রাম নগরীর ও আর নিজাম রোডে তাদের বাসা। তাসফিয়া সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী।

এই ঘটনার পর বুধবার রাতে পুলিশ তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাকে আটক করেছে। বৃহস্পতিবার আদনান মির্জাকে আদালতে হাজির করা হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

সারাবাংলা/আরডি/এমআই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন