রবিবার ১৮ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৩ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

‘আমি হাসির স্কুলের হেডমাস্টার’

মে ৬, ২০১৮ | ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ

উন্মাদের প্রথম সংখ্যার গল্প

উন্মাদের প্রকাশনার ৪০ বছর হলো। ১৯৭৮ সালের মে মাসে প্রথম উন্মাদ বের হয়। আমার দুই বন্ধু কাজী খালিদ আশরাফ ও ইশতিয়াক হোসেন উন্মাদ বের করেন। তারপর আমিও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। আমরা সবাই তখন ইন্টারমিডিয়েট পাস করে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। আমরা কার্টুন আঁকতাম। আমি ছোটবেলা থেকেই কার্টুন আঁকি। ১৯৭৮ সাল থেকে আমি  পেশাদারিত্বের সঙ্গে কার্টুন আঁকা শুরু করি। আসলে আমার পরিবারের সবাই প্রায় ছবি আঁকত। তাই দেখেই কার্টুন আঁকা শুরু করি।

তখন টেন্সিল পেপার বলে একরকমের কাগজ ছিল। সেই কাগজে ছবি আঁকা যেতো এবং প্রিন্ট করা যেতো। খুবই কষ্টসাধ্য একটা ব্যাপার ছিল সেটি। আমরা সেই টেন্সিল পেপারেই বিভিন্ন রকম পত্রিকা বের করতাম। সেই থেকেই সম্ভবত এই ধারণাটা মাথায় এসেছিল যে একটা প্রফেশনাল পত্রিকা করলে কেমন হয়।

উন্মাদের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ৩ হাজার কপি। এবং সেই তিন হাজার কপিই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সেটা আমাদের জন্য একটা মিরাকল ছিল। তিন হাজার কপিই বিক্রি হয়ে গেছে! পরের বছর আমরা ছয় হাজার কপি ছাপলাম। বিক্রি হলো সেই তিন হাজার কপিই। আমরা তখন উপলব্দি করলাম ব্যবসা আসলে অন্য জিনিস। প্রথম ধাক্কাটা সেখানেই খেলাম।

বিজ্ঞাপন

পেশা উন্মাদ

উন্মাদের যাত্রা শুরু হয়ে গেল। নবম সংখ্যা পর্যন্ত আমরা সবাই একসঙ্গে করলাম। তখন এত কার্টুনিস্ট ছিল না। আমি, ভাস্কর সুলতানুল ইসলাম, শিশুবিশেষজ্ঞ নওশাদ নবী, রফিকুন নবী স্যারের ছোট ভাই রেজাউন নবী আর কাজী খালেদ আশরাফ- এই চার পাঁচজনই ছিলাম আমরা। ঘুরে ফিরে আমরাই আঁকতাম। নবম সংখ্যা পর্যন্ত এভাবেই চললো। কখনো কখনো পত্রিকা বের হতে অনেক দেরী হতো। তখন সাধারণত আমরা তিন মাস পর পর একটা সংখ্যা বের করার চেষ্টা করতাম। নবম সংখ্যার পর আমি এটার দায়িত্ব নিলাম।

তখন আমি চাকরি করতাম একটি ব্যাংকে। ওই চাকরিটি আমার পছন্দ হলো না। আমি ভাবলাম ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে উন্মাদই করবো। ততদিনে উন্মাদের সঙ্গে যারা ছিল, কাজী খালেদ আশরাফ বিদেশ চলে গেল। ইশতিয়াক হোসেন রিয়েল স্টেটের ব্যবসায় নেমে গেল। সবাই তখন নানাভাবে ব্যস্ত। আর উন্মাদ যে কারো পেশা হতে পারে সেটা কেউ কখনো ভাবেনি। ভাবার কথাও না।

আমি দায়িত্ব নিয়ে তিনমাসের মধ্যে এটাকে মাসিক হিসেবে প্রকাশ করতে লাগলাম। আমাদেরকে তো টিকে থাকতে হবে। তখন অবশ্য ভালো বিক্রি হতো উন্মাদ। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত চলছে উন্মাদ। ৪০ বছর হলো এই মে মাসে। আমার বয়স ৬০ আর উন্মাদের বয়স ৪০। এটা একটা মিরাকল।

বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কার্টুন পত্রিকাগুলো

বিশ্বে কার্টুন পত্রিকার দুর্দিন চলছে অনেকদিন ধরেই। ভারতে এই ধরণের তিনটা কার্টুন পত্রিকা ছিল- ওয়াইজক্রাক, দিওয়ানা আর সরস কার্টুন। তিনটা পত্রিকাই বন্ধ। পাকিস্তানে কোনো পত্রিকা নাই। নেপালেও নাই।

এমনকি ইন্টারন্যাশনালিও একই প্রবলেম। আমাদের ছোটবেলায় বিশ্বখ্যাত আমেরিকান ‘ম্যাড’ ম্যাগাজিন পড়তাম- তাদের এখন আরো ক্রাইসিস। তারা এখন মার্কেটেই পত্রিকা দেয় না। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘পাঞ্চ’ ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে গেছে। আামেরিকান আরেকটা ম্যাগাজিন আছে ‘ক্রাকড’ এটাও বন্ধ হয়ে গেছে। আরেকটা ম্যাগাজিন ছিল ‘ন্যাশনাল ল্যাম্পেন’ এটাও বন্ধ হয়ে গেছে। সারা বিশ্বেই ফান ম্যাগাজিনের একটা দুর্দিন চলছে। তবে বাংলাদেশে উন্মাদ টিকে আছে ৪০ বছর। এটা আমাদের একটা সফলতা।

বাংলাদেশে অবশ্য বিভিন্ন সময়ে আরো কিছু পত্রিকা বের হয়েছিল। আমাদেরই বন্ধু হারুনুর রশিদ একটা পত্রিকা বের করেছিল ‘কার্টুন’ নামে। আর্ট কলেজ থেকে ইত্যাদিখ্যাত মামুন জিয়াদি বের করতো ‘ব্যাঙ্গ’ নামে একটি পত্রিকা। জাকির হাসান সেলিম নামে একজন চিকিৎসক ‘আঙ্গুর’ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন। রেজাউন নবী নিজে একটা আলাদা পত্রিকা বের করতেন। মহিবুল আলম নামে আরেকজন- এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন তিনি ‘বিচ্ছু’ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন।

বাংলাদেশে একসময় অনেকগুলো কার্টুন পত্রিকা বের হতো। সবগুলোই এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি সময় প্রায় ১১ বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছিল কার্টুন পত্রিকাটি।  পত্রিকাটির সম্পাদক হারুনুর রশিদ এখন আমেরিকায়। তবে এখনও উন্মাদ চলে- বয়স ৪০ বছর হলো। প্রতি বছর আমরা উন্মাদ থেকে কার্টুন প্রদর্শনীর আয়োজন করি। একজন কার্টুনিস্টকে ‘সেরা কার্টুনিস্ট’ পদক দেই। এভাবেই চলছে আমাদের কর্মকাণ্ড।

৪০ বছরের টিকে থাকা,  সংকট- সম্ভাবনা

তবে কার্টুন পত্রিকা যে কেবল ম্যাগাজিনেই সীমাবদ্ধ ছিল তা কিন্তু নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে পত্রিকাগুলো রম্য নিয়ে আলাদা পাতা আর ছোট আকারের ম্যাগাজিন বের করতে শুরু করে। আমাদের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন কাজী তাপস- সে এখন একটি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের বড় কর্মকর্তা; তাকে আমি একবার আইডিয়া দিয়েছিলাম- তোমরা একটা কাজ করতে পারো। এতো পত্রিকা বের হচ্ছে পত্রিকার পুরো পাতায় যদি কার্টুন দেওয়া যায় তাহলে ভালো হবে। এরপর আমার কথায় না নিশ্চয়ই, পত্রিকা যারা চালাম তাদের সিদ্ধান্তেই ভোরের কাগজ পত্রিকায় ‘রঙ্গব্যাংক’ নামে একটা পুরো পাতা বের হতো। সেটা দিয়ে শুরু। এরপর প্রথম আলো করল। প্রথম আলো ঘোষণা দিল তারা পত্রিকা করবে। তখন আমার মাথায় একটা সিক্সথ সেন্স কাজ করল, বললাম- দেখবা ওরা নিশ্চয়ই একটা ম্যাগাজিন করবে। তাই হলো। ওরা ‘আলপিন’ নামে একটি ম্যাগাজিন করলো। এরপর অন্য অনেকেই।

অনেকেরই ধারণা ছিল, এসব ফান ম্যাগাজিন বের হওয়ার কারণে উন্মাদের বিক্রি কমে গেছে। এটা আসলে ঠিক। আমি নিজেই দেখেছি- বইমেলায় উন্মাদের স্টলে বাচ্চাটা কার্টুনের বই কিনতে চাইছে, কিন্তু বাবা বলছে, না না তুমি তো ঘরে আলপিন পাচ্ছ, প্যাচাল পাচ্ছ, বিচ্ছু পাচ্ছ- এসবে কাজ কি! ছেলেটাকে আশাহত করে বাবা কিনতে দেন না। তবে এর জন্য যে উন্মাদের বিক্রি কমেছে তা মনে করি না। ওইসব সাপ্লিমেন্ট বের হওয়াতে সুযোগ আরো বেড়েছে। কার্টুনিস্টদের সুযোগ বেড়েছে। যারা রম্য লিখেন তাদের সুযোগ বেড়েছে। আর পাশাপাশি আমরাও আছি।

পাঠক এখন নিজেরাই ফান করেন

এটা ঠিক যে, উন্মাদের পাঠক কমে গেছে। কারণ মানুষ এখন পত্রিকা খুব কম পড়ে। মানুষ এখন ফেসবুক এসব ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে গেছে। ওই জগতের কারণে এই জগতটা একটু ক্রাইসিসে আছে। আরেকটা কারণ হচ্ছে পত্রিকার হকাররা কিন্তু এখন ওইভাবে বসতে পারে না। নানা জায়গায় হকার উঠে গেছে। আরেকটা কারণ হচ্ছে আমরা যে পোস্টাল ব্যবস্থায় ভিপি করে পত্রিকা বিভিন্ন জায়গায় পাঠাই ওইটার মধ্যেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঠিকমতো ভিপি যায় না- সবকিছু মিলিয়েই পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের জগতে একটা ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে। এসব কারণে আমাদের সার্কুলেশন কমে গেছে। আগে আমাদের সার্কুলেশন ছিল ৩০ হাজার। এখন সেটা প্রায় অর্ধেকে এসে ঠেকেছে। তবে এই সমস্যা যে কেবল উন্মাদের ক্ষেত্রে তা নয়। সবার ক্ষেত্রেই তাই।

এই পাঠক হারানোর কারণ যেটা মনে হয়, পাঠক এখন নিজেরাই ফান করেন। ইউটিউবে, ফেসবুকে মানুষ রেডিমেড অনেক কিছু পেয়ে যাচ্ছে। তারা ওইখানে ম্যাক্সিমাম সময় দেয়। ফেসবুক তাদের ম্যাক্সিমাম সময় নিয়ে নিচ্ছে। আমরাও অবশ্য ডিজিটাল হওয়ার চেষ্টা করছি। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা একটি ওয়েবসাইট করেছি, ফেসবুকে একটা ভেরিফায়েড পেইজ আছে।  তারপরও কিছু পাঠক এখনও ছাপা উন্মাদ কিনে। এ কারণেই আমরা ৪০ বছর ধরে সারভাইব করছি।

হাসির স্কুলের হেডমাস্টার

এখন যারা ইয়াং কার্টুনিস্ট আছেন সবাই একসময় উন্মাদে কাজ করেছেন। কারণ একজন তরুণ কার্টুনিস্ট যখন আঁকেন তখন তার আঁকা হুট করেই প্রথম আলো বা কালের কন্ঠ এরা ছাপবে না। তখন আমরা প্লাটফর্মের কাজ করি। আমাদের কাছে আসলে আমরা সেই কার্টুনকে মেরামত করে, হয়তো সংলাপটা বদলে দিয়ে তাকে একটু সাজেশন দিয়ে আমরা ওটা ছাপি। তখন সে একটা ইন্সপারেশন পায়।

প্রায় সব ইয়াং কার্টুনিস্ট কিন্তু উন্মাদে কাজ করেছে। এখনকার বিখ্যাত আর্টিস্ট মানিক-রতন ছিল, আবু ছিল, আর্কিটেক্ট এনামুল করিম নির্ঝর ছিল, ওয়াহিদ ইবনে রেজা বাপ্পি ছিল সে এখন মোশন পিকচার্সে কাজ করে- আমাদের এখানেই অনেকেই ছিল যারা এখন বড় বড় জায়গায় কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করছে। এটা ভাবলে ভালো লাগে।

আমার অবস্থা অনেকটা হাসির স্কুলের হেডমাস্টারের মতো। হেডমাস্টারকে যেমন রাস্তায় অনেক সাবেক ছাত্রই থামায়, সালাম দেয়- বলে স্যার চিনতে পারছেন? বৃদ্ধ স্যার জিজ্ঞেস করে- তুমি যেন কোন ব্যাচের। তখন ছাত্র উত্তর দেয়, আমি তো স্যার ১৯৪০ সালে কিংবা ১৯৫০ সালে আপনার ছাত্র ছিলাম। আমিও এইরকম। অনেকেই আমাকে থামায়- জিজ্ঞেস করে স্যার চিনতে পারছেন? আমিও বলি, তুমি কোন সংখ্যায় কাজ করতা বলো তো? তখন সে বলে আমি তো ২৩২ থেকে ২৪০ সংখ্যায় ছিলাম আপনার সাথে। তখন ভালোই লাগে।

উন্মাদের ৪০ বছর, বিরাট পরিকল্পনা

উন্মাদের ৪০ বছর উপলক্ষ্যে আমরা দৃক গ্যালারিতে দুইটা গ্যালারি ভাড়া নিয়ে বিশাল প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা আছে। পাঁচ দিনের আয়োজনে সেখানে থ্রিডি কার্টুন থাকবে, নরমাল কার্টুন থাকবে, ফানি ফটো থাকবে, কার্টুন নিয়ে আলোচনাও হবে। আমরা এওয়ার্ডও দেবো। বিদেশ থেকে সম্ভবত দুই-একজন কার্টুনিস্ট আসবেন। এমন নানা বিশাল পরিকল্পনা আছে আর কি।

আরেকটা জিনিস জানাই, সম্প্রতি একটা চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে আমাদের উন্মাদ চরিত্রটা নিয়ে একটি অ্যানিমেশন ফিল্ম বানানোর। গল্পটা আমাদের। নির্মান করবে ওরা। এটা একটা বড় সাফল্য।

 

আহসান হাবীব, সম্পাদক- উন্মাদ

শ্রুতিলিখন : সন্দীপন বসু

 

সারাবাংলা/ এসবি

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন