বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯ ইং , ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

আমার দেখা খুলনা সিটি নির্বাচন ও একটি কঠিন প্রশ্ন

মে ২০, ২০১৮ | ৮:০৩ অপরাহ্ণ

খুলনা সিটি নির্বাচন কাভার করে যখন ঢাকায় ফিরছিলাম তখন ফেরিতে এক ভদ্রলোক আমাকে প্রশ্ন করলেন, খুলনার নির্বাচন কী ফেয়ার হয়েছে? আমি বললাম, খুব কঠিন প্রশ্ন করেছেন। ভদ্রলোক কী বুঝলেন জানি না, বললেন, তার মানে পুরোপুরি ফেয়ার হয়নি। আমি আর কথা বাড়ালাম না।

খুলনা সিটি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সারাদেশে এই নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা চলছে এবং আরো কিছুদিন চলবে সেটা বলা যায় নিঃসন্দেহে। তবে, আলোচনাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক। কেউ মনে করছেন নির্বাচনে সরকারি দল জোর করে এই সিটিতে বিজয়ী হয়েছে, কারো দাবি বিএনপি হেরে গেলেই মনে করে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। কিন্তু খুলনা নির্বাচন সরাসরি কাভার করেছি বলে বলছি, এই নির্বাচন নতুন কিছু বিষয় আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।

নির্বাচনের চারদিন আগে আমি খুলনা সিটি নির্বাচন কাভার করতে সেখানে যাই। চারদিনে সেখানকার অধিকাংশ ওয়ার্ডে ঘুরেছি। মানুষের সাথে কথা বলেছি। নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। বুঝতে চেষ্টা করেছি আসলে এবারের নির্বাচনে ভোট দেয়া বা না দেয়ার মুল কারণ কী হতে পারে।

খুলনা সিটি নির্বাচনে এবারে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক ছিল যে ১৮দিন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা হয়েছে সেখানে কোন প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে বড় কোন সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। এমনকি নির্বাচনে কাউন্সিলের মধ্যে্ও বড় কোন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। এই নির্বাচনের তিনদিন আগে থেকেই ঢাকা ও খুলনার অন্তঃত দুই থেকে আড়াইশ সংবাদকর্মী কাজ করতে শুরু করেন। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার এ সাংবাদিকরা যার যার মত বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছেন। নিজের রিপোর্টের স্বার্থেই মানুষের সাথে কথা বলেছেন। নির্বাচনকে কেউ প্রভাবিত করছে কিনা জানার চেষ্টা করেছেন।কেউ কোন ভয়-ভীতি দেখাচ্ছেন কীনা তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুই প্রার্থীর মিডিয়ার সামনে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ছাড়া বড় কোন অভিযোগ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। এমনকি ভোটের আগের দিন্ও আমি অনেক সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, যেহেতু নির্বাচনে প্রচারণা চলাকালীন পরিবেশটি ভাল ছিল তাই তারা ভোট দিতে যাবেন। গণমাধ্যমগুলোতেও নির্বাচনী প্রচারণার পরিবেশ নিয়ে বড় কোন নেতিবাচক খবর দেখা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

এরচেয়ে সহনশীল প্রচারণা পরিবেশ সাম্প্রতিক কোন নির্বাচনেই চোখে পড়েনি। যেকারণে মানুষের মধ্যে একধরণের আত্মবিশ্বাস জন্মায় যে নির্বাচনটি ভাল হবে।

এবার আসা যাক নির্বাচনের দিনের কথায়। এই নির্বাচনটি যেহেতু সব দিক থেকেই গুরুত্বপুর্ণ ছিল তাই গণমাধ্যমগুলো নির্বাচনের খবর সংগ্রহে নেয় বাড়তি ব্যবস্থা। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ডজন ডজন ক্যামেরা সকাল থেকেই ঘুরতে শুরু করে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র।

সকালে আমরা যখন ভোট কেন্দ্রগুলোতে যাই তখন অনেক কেন্দ্রেই ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। আবার কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল হতাশাজনক। এমনকি খুলনা জিলা স্কুলের পাশাপাশি দুটি কেন্দ্রের মধ্যেই এই পার্থক্য চোখে পড়ে। অনেক জায়গায় আবার ছোট-খাটো গোলযোগের মধ্যে্ও দেখেছি ভোটারদের লম্বা লাইনে দাড়িয়ে ভোটের জন্য অপেক্ষা করতে। বস্তি এলাকা বাস্তুহারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গণ্ডগোল হচ্ছে এমন খবর পেয়ে আমরা ১৫ মিনিটের মধ্যে সেখানে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি সেখানে ততক্ষণে হাজির পুলিশ ও র‌্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স। কয়েকটি লাইনে দাড়িয়ে আছেন শ’ খানেক ভোটার। পাচ মিনিট বন্ধ রাখার পর আবার শুরু হলো ভোটগ্রহণ। অর্থাৎ আইন-শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত। প্রায় সব কেন্দ্রেই ছিল প্রার্থীদের নির্ধারিত এজেন্টরা। ছিল কর্মী-সমর্থকরা্ও।

খুলনা কলিজিয়েট স্কুল কেন্দ্রে দুটি প্রধান দলের কর্মীদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ভোট চাওয়ার দৃশ্য ছিল আশাব্যঞ্জক।

প্রশ্ন হলো এমন একটি ইতিবাচক পরিবেশে ভোট শুরুর পরও কেন শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হলো?

আমার নিজের পর্যবেক্ষণ যেটি বলে, প্রতিটি কেন্দ্রের আশ-পাশে সরকারি দলের প্রার্থীর সমর্থকদের নির্বাচনী ক্যাম্পে দল ধরে অবস্থান, কোথাও কোথাও মোটর সাইকেল নিয়ে শো-ডাউন বিপরীত দলের সমর্থক ও ভোটারদের উপর কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছে। বাড়তি ঝামেলা এড়াতে অনেকে আসেননি ভোট কেন্দ্রে।

বেলা ১১টার পর কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কমতে থাকে। এই ফাঁকে কিছু কেন্দ্রেই ঘটে জাল ভোটের ঘটনা। বিশেষ করে যে তিনটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায় সেই কেন্দ্রগুলোতে জাল ভোটের ঘটনাগুলো ঘটে ১১টা থেকে দেড়টার মধ্যে। ইতিমধ্যে এই খবর যেহেতু গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার পায় ফলে এরপর আর নতুন করে ভোট কেন্দ্রগুলোতে খুব বেশি ভোটাররা আসেননি।

যেকোন নির্বাচনে সাধারণত দেখা যায় বিকেলের দিকে অনেক মানুষ ভোট দিতে আসেন। কিন্তু এরমধ্যেই যেহেতু পরিবেশ কিছুটা বদলে যায়, তাই পরবর্তীতে অনেকেই ভোট কেন্দ্রে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে বিকেলের দিকে বেশিরভাগ ভোট কেন্দ্রেই উপস্থিতি ছিল খুব কম।

নির্বাচনের আরেকটি বড় দিক ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এমনকি বিএনপির অন্তঃত সাতজন কাউন্সিলর প্রার্থী সরাসরি তালুকদার খালেকের পক্ষে কাজ করেছেন। একারণে বিএনপির অনেক কর্মী-সমর্থক্ ও ভোটারই হতাশা থেকে ভোট কেন্দ্রে আসেননি।

বিপরীতে এবারে নির্বাচনে সরকারি দলের কর্মীরা ছিলেন অনেক অতিমাত্রায় সক্রিয়। কারণ ২০১৩ সালে অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিছটুা হলেও তালুকতার আব্দুল খালেকের পরাজয়ের পেছনে কাজ করে। তাই এবার দলীয় হাইকমান্ডের কড়া নির্দেশ ছিল ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে কাজ করার। দলীয় নেতা-কর্মীদের এই ঐক্য তালুকতার খালেকের পক্ষে বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। এটিও কিছুটা চাপে ফেলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের।

আর যেকোন কারণেই হোক খুলনার নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে মাঠে খুব বেশি সক্রিয় ছিলনা দলটির প্রধান শরীক জামায়াত।

খুলনায় নির্বাচনে কাজ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষেরে কাছে একটি বাক্য বার বার শুনেছি, খুলনার যেটুকু উন্নয়ন তার মুলে তালুকদার আব্দুল খালেক। তাই সাধারণ মানুষের একটা ধারণা তালুকদার আব্দুল খালেক নির্বাচিত হলে খুলনায় আবার কিছুটা উন্নয়ন হবে। এটাও নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলে।
এবার আসা যাক, নির্বাচনে কারচুপির বিষয়ে। হ্যাঁ নির্বাচনে কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে জালভোটের ঘটনা ঘটেছে। একারণে ব্ন্ধ করা হয় কয়েকটি কেন্দ্র।

তবে, এটি পুরো নির্বাচনের চিত্র নয়। নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোন অভিযোগ ছিলনা। কয়েকটি কেন্দ্র ছাড়া প্রায় পুরো খুলনা সিটি চষে বেড়ানো টেলিভিশন ক্যামেরাগুলোতেও ধরা পরেনি বড় কোন অনিয়ম। তাই নির্বাচন থেকেও সরে যাননি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এমনকি অন্য যে আরো তিনজন মেয়র প্রার্থী ছিলেন তাদের কাছ থেকেও বড় কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

তাই সাধারণ দৃষ্টিতে এই নির্বাচনকে এক কথায় কারচুপির নির্বাচন যেমন বলা যাবেনা। আবার পুরোপুরি বিশুদ্ধ নির্বাচনও বলা যাবেনা। কমিশন যদি আরেকটু শক্ত হতে পারতো, সরকারি দলের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারতো তাহলে জাতীয় নির্বাচনের আগে গর্ব করার মত একটি নির্বাচন উপহার দিতে পারতো নির্বাচন কমিশন।

সাইদুল ইসলাম, সিনিয়র রিপোর্টার, জিটিভি

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন