বিজ্ঞাপন

মৃত্যুফাঁদের মে, কাজে আসছে না বজ্রপাত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

May 21, 2018 | 9:27 am

।। জান্নাতুল ফেরদৌসী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা: বজ্রপাতে শুধু এ বছরের মে মাসের প্রথম ১৮ দিনে মারা গেছেন ৭৪ জন। বেসরকারি একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে শুধু বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ২ হজার ছাড়িয়ে গেছে। এই আট বছরে কেবল মে মাসেই মারা গেছেন আট শতাধিক মানুষ।

বজ্রপাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুখ। তিনি তার গবেষণার তথ্যের সূত্র ধরে সারাবাংলা’কে বলেন, প্রতি বছরের মে মাসেই কমপক্ষে ৪০ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছেন বজ্রপাতে।

বিজ্ঞাপন

এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মারা যান ৩০১ জন, যা বজ্রপাতে মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড। আর এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ হলেও ১৮ মে পর্যন্ত এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৪ জনে। আর ২০১০ থেকে এ বছর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ১৩০ জন।

মৃত্যুফাঁদের মে, কাজে আসছে না বজ্রপাত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন

এই গবেষক জানান, বজ্রপাতে প্রাণহানির ৯৩ শতাংশই হচ্ছে গ্রামে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশ মৃত্যুই হয় খোলা মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৮৪ শতাংশই পুরুষ, যারা সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বজ্রপাতে প্রাণহানির বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় গেল বছরই ব্রজপাতকে দুর্যোগ বলে ঘোষণা দিয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে মানুষকে বাঁচাতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকাসহ ৮ জেলায় পরীক্ষামুলকভাবে বসানো হয়েছে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর। যদিও এসব সেন্সরের কার্যক্রম এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

মৃত্যুফাঁদের মে, কাজে আসছে না বজ্রপাত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ও ঝড় পূর্বাভাস কেন্দ্রের ইনচার্জ আব্দুল মান্নান জানান, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনার কয়রা, ঢাকা, নওগাঁর বদলগাছি, সিলেট, পটুয়াখালী ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বসানো হয়েছে লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর।

বিজ্ঞাপন

আব্দুল মান্নান জানান, এসব সেন্সর থেকে আপাতত পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন তারা। পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরই কেবল তা দিয়ে বজ্রপাতের বিষয়ে মানুষকে আগাম সতর্কতা জানানো সম্ভব।

মৃত্যুফাঁদের মে, কাজে আসছে না বজ্রপাত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

এই আবহাওয়াবিদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে কেনা এই লাইটনিং ডেটেকটিভ সেন্সর শুধু চালু বা বন্ধের বিষয়টিই ভেন্ডররা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন। এর ব্যবহার বা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের বিষয়টিতে আমরা আমাদের জানা জ্ঞানই কাজে লাগাচ্ছি।’

জানা গেছে, এই লাইটনিং ডিটেকটর সেন্সর থেকে তথ্য প্রথমে ডিভাইসে ইনপুট করে সেখান থেকে তা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ পূর্বাভাস কেন্দ্রে স্থাপিত মনিটরে ডিসপ্লে করে। এই মনিটরে দেখানো হয়, একঘণ্টায় কোথায় বজ্রপাত হয়েছে, কী পরিমাণ বজ্রপাত মাটিতে পড়েছে বা মেঘের ঘর্ষণের পরিমাণ কত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো এই সেন্সর এখনও স্টাডির পর্যায়ে আছে। এই সেন্সর থেকে সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল যাবে নরওয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরে। সেখান থেকেই এ বিষয়ে কারিগরি ও পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেবেন আবহাওয়াবিদরা।’
তবে বজ্রপাত গবেষক অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুখ বলেন, ‘দেশের বাস্তবতায় কোনো কাজ দেবে না এই লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর। এটি বাস্তবসম্মত নয়।’

মৃত্যুফাঁদের মে, কাজে আসছে না বজ্রপাত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

তিনি জানান, রাডার থেকে এই সেন্সরে বজ্রপাতের ১৫/২০ মিনিট আগেই কেবল পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বজ্রমেঘ বা বজ্রপাত তৈরি হয় যে মেঘ থেকে, তা খুবই অস্থিতিশীল। এ ছাড়া বাংলাদেশ মেট্রোলজিকেল ডিপার্টমেন্ট (বিএমডি) এই পূর্বাভাস জানাতে যে ওয়েদার অ্যাপ তৈরি করেছে, তা কেবল অ্যান্ড্রয়েডে চালিত মোবাইল ফোনেই চলবে। সেক্ষেত্রে দেশের প্রান্তিক গরীব কৃষক কিভাবে এর মাধ্যমে সেবা পাবে— সেই প্রশ্ন রাখেন ড. মুরাদ।

এই বজ্রপাত গবেষক বলেন, ‘বজ্রপাতে উন্মুক্ত স্থানে মারা যান ৮৬ শতাংশ কৃষক, জেলে বা শ্রমিকরা কেউ যেহেতু অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ব্যবহার করেন না, তাই তাদের কাছে এই পূর্বাভাস পৌঁছানো সম্ভব না।’
বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে খোলা মাঠে তালগাছের সারি ও তুলনামূলক কম সময়ের বিকল্প হিসেবে সুপারি গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন এই গবেষক।

মৃত্যুফাঁদের মে, কাজে আসছে না বজ্রপাত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

তিনি বলেন, ‘মৃত্যুহার কমাতে খোলা জায়গায় কাজ করা কৃষক শ্রমিক ও জেলেদের সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই। তাদের জানাতে হবে, যেকোনো ধরনের বজ্র ঝড়ের সম্ভাবনা তৈরি হলেই তারা যেন নিরাপদ একটি জায়গায় চলে যান। কৃষি জমিতে ভারী অনেক কৃষি যন্ত্রাংশ ব্যবহার হয়, যা বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে।’ তাই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন তিনি।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় গাড়িতে থাকা অবস্থায় ধাতব যন্ত্র (মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ ইলেকট্রনিক সামগ্রী) ব্যবহার না করা পরামর্শও দেন ড. মুারদ আহমেদ ফারুখ। এ ছাড়া, বহুতল ভবনে লাইটনিং অ্যারেস্টার বা বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি।

সারাবাংলা/জেডএফ/টিআর

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন