বিজ্ঞাপন

একাকীত্বেই স্বাধীন নারী

May 23, 2018 | 2:04 pm

নারী স্বাধীনতা নিয়ে প্রতিদিন বহু বাক্যব্যয় হয়। নারীরাও মানুষ, তাদেরও সাধ আছে, আহ্লাদ আছে। আছে একা পথ চলতে পারার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। নারীকে নারী নয়, একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি হিসাবে দেখুন। নারীর প্রতি সহিংসতা পরিহার করুন। নারীকে তার শরীরের স্বাধীনতা পেতে দিন। একজন নারীরও একটি মন আছে। সেই মনে প্রেম আছে, ভালোবাসা পাবার তীব্রতা আছে। সেই মন তার নিজের মত করে বাঁচতে চায়, কারও দানে নয়, নিজের যোগ্যতায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। পরিবারে নিজের প্রাপ্য অধিকার চায়। মর্যাদার সাথে বেড়ে উঠতে চায়।

বিজ্ঞাপন

নারীও চায় রাস্তায় নামলে কেউ তার দিকে বিকৃত নজর দেবে না। কেউ তার শরীর নিয়ে বাজে মন্তব্য করবে না। নারী চায় তার ইচ্ছামত পোষাক পরবে যে পোশাক পরলে সে স্বচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারবে। নারীকে পোশাক নিয়ে কেউ গুরুগম্ভীর কথা শোনাতে আসবে না বা তাচ্ছিল্যের কোন কথা কইবে না। এমন হাজারো অপূর্ণ খায়েশ নিয়ে প্রতিনয়ত গলা তুলছে নারীরা। চিৎকার করে বলতে চাইছে। রাস্তায় নামছে। এমনকি প্রতিবাদীও হচ্ছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

সমাজ চলছে তার আপন গতিতে। পরিবার থেকে রাষ্ট্র সব জায়গাতেই নারী মানেই হচ্ছে গৃহকোণের এক জীব। তাকে কেন বাইরে বের হতে হবে? নারী আবদ্ধ থাকার জন্য জন্মেছে। তার আবার স্বাধীনতা কীসের?

বিজ্ঞাপন

এইতো সেদিন গিয়েছি দর্জির দোকানে। দর্জি ভদ্রলোক মাথায় টুপি দেয়া। বোঝাই যাচ্ছে নামাজ পড়ে এসেছে। সামনে আরও দুইজন পুরুষ নিয়ে বসে আলাপ করছিলো। দিনটি ছিলো বিশ্ব মা দিবস। মা দিবসের আলোচনায় এলো কোন এক ছেলে মা'কে দেখেনা। বয়স্ক মা খাবার কষ্ট পাচ্ছে। ছেলে কাছে থেকেও নেই। সেই ছেলে আবার ফেইসবুকে মা'কে নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে। ধরেই লোকটা বলে বসলো নিশ্চয়ই ছেলে বউয়ের কথায় চলে। সব নষ্টের গোড়া এই মেয়ে মানুষ। কত অবলীলায় সে সত্যি ঘটনা না জেনেও সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলো বউয়ের কথায় চলে বলেই ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে এবং সে তার মায়ের প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করছে। মেজাজ গরম হয়ে গেলো। প্রশ্ন করলাম কেমন করে আপনি সিদ্ধান্তে আসলেন যে ছেলের বউয়েরই দোষ? উত্তর দিলো এটাই তো হয়।

জানতে চাইলাম, আপনার একবারও মনে হয়নি যে কেমন ছেলে যে বউয়ের কথায় তার জন্ম দেয়া মা'কে অস্বীকার করে? যে মা এতবছর ধরে কষ্ট করে তাকে বড় করলো আর বউ তো এলো সেইদিন। কয়দিনেই একটা মেয়ে কেমন করে তাকে বশ করে ফেলার ক্ষমতা রাখে যদি না ছেলেটার মধ্যেই সমস্যা থাকে?

বিজ্ঞাপন

তর্ক করেই চলল লোকটা। "আপা শুনেন, অনেক সময় ছেলেরা পারে না। তারা বাধ্য হয় বউয়ের কথায় চলতে।"

পরক্ষণেই সে সম্প্রতি চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা টেনে মন্তব্য করলো, সেই মেয়ে রাতবিরাতে ছেলেদের সাথে বাইরে ঘুরতে গিয়েই এই অঘটনের জন্ম দিলো। মেয়েরাই শয়তান। মেয়ে মানুষের জন্ম হইলো ঘরের ভিতরে থাকার জন্য। আল্লাহ মেয়ে মানুষরে বানাইছে বাইরে ঘোরার জন্য না। ঘর সামলানোর জন্য। মেয়ে মানুষের কেন অত ছেলেদের সাথে ঘুরাঘুরি করবে? কেন উল্টাপাল্টা পোশাকে বাইরে আসবে? মেয়ে মানুষ যদি ছেলেদের মত পোশাক পরে তাইলেতো সমস্যা হবেই।

বিজ্ঞাপন

এটাই আমাদের বর্তমান সমাজের চিত্র। শিক্ষিত অশিক্ষিত বেশীরভাগ পুরুষই এখনও নারীকে ঘরের কোনে দেখতেই পছন্দ করে। নারী প্যান্ট পরবে এটাও তাদের আপত্তির বিষয়। এই মানসিকতা আগেও ছিলো এখনও আছে। তাহলে এই যে এত পড়াশুনা, এত বিদ্যালয়, এত মক্তব, এত শিল্প সংস্কৃতি, আচার সবকিছুই কি তাহলে বৃথা? এই মানসিকতা কি আমাদের শিক্ষিত সমাজেও নেই? একই মন্তব্য শুধু একজন দর্জি কেন, একজন শিক্ষিত ও আধুনিক বলে পরিচয় দেয়া অফিসের বড় কর্মকর্তার মাঝেও বর্তমান!

এমনি এক আবদ্ধ সমাজে নারীরা কেবলি একা হয়ে যাচ্ছে। কেবলি যেন গুটিয়ে যাচ্ছে। যেসব নারী স্বাধীনতার কথা বলে, নিজেকে মেলে ধরার কথা বলে, প্রতিযোগিতা করে সামনে এগিয়ে আসার লড়াই করে তাদেরকে কোনঠাসা করে দেয়ার পায়তারা চলছে প্রতিনয়ত। নির্যাতন করে হোক, মুখের ভাষায় হোক, যেমন করে পারছে তেমন করেই আঁটকে দেয়ার আয়োজন চলছে ঘরে ও বাইরে। প্রতিকূল পরিবেশে পড়ে নারীরা যেন আরও একা হয়ে পড়ছে। এই সমাজে একজন নারীর মনের কথা শোনার মত কোন পরিবেশ নাই। কোন বন্ধু নাই। কোন সামাজিক সংগঠন নাই। নারীরা যেন এই সমাজে অপাংক্তেয়। তাদের কষ্টের কথা তাদের হৃদয়ের কথা তাদের বেদনার কথা বলা যায় এমন কোন পরিবেশ নেই। কেউ নেই। পরিবারে যেমন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মস্থল সব জায়গাতেই একই অবস্থা। নারী আজ প্রেমিকের কাছেও নিরাপদ নয়। কোমল মনের সুযোগ নিয়ে পুরুষ কর্তৃক প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে চাপের মাঝে থাকা নারীরা ক্রমশ বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। একা একা পথ চলতে শিখছে সেটাও পারছে কই? একা চলা নারীর জন্য প্রতি পদে রয়েছে কাঁটা বিছানো। সেই কাঁটার রাস্তায় চলাতেও রয়েছে হাজার প্রতিকূলতা। এ যেন নারী তুই জন্মালি কেন, এটাই তোর পাপ।

নারীর একাকীত্ব নিয়ে কারও কোন মাথাব্যথা নেই। নারীর মনের দুনিয়ায় ঢোকার মত ইচ্ছে বা সাধ কারও নেই। অবরোধের রাস্তায়  চলাফেরা করতে করতে ক্রমশ নারী হয়ে যাচ্ছে শামুকের মত। নারীর মন বারেবারেই কেঁদে বলতে চায়,"আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ।" নারীর স্বাধীন হবার ইচ্ছা যেন অন্যের ইচ্ছার উপরেই ঝুলে রয়েছে এখনও। নারী কেবল তার নিজের জগতেই স্বাধীন। নিজের মাঝেই সে নিজেকে সুখী ভাবতে থাকে। নিজের মাঝেই সে নিজেকে বন্ধু ভাবতে শেখে। নিজের মাঝেই সে নিজেকে কর্তা ভাবতে অভ্যস্ত হয়।

নারী তুমি তোমার একাকীত্বেই স্বাধীন, সেই একাকীত্বেই তুমি থাকো। বাইরের আলো তুমি সইতে পারবে না। সে আলো তোমার জন্য নয়-  ভাবতে ভাবতেই একজন নারী আবারও একাকীত্বের মাঝেই ডুবে যায়!

 

[রোকেয়া সরণি কলামে প্রকাশিত লেখা লেখকের নিজস্ব মত]

 

সারাবাংলা/এসএস

 

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন