বিজ্ঞাপন

এনজিওরা শ্রমিক আন্দোলন ‘খেয়ে ফেলেছে’

May 1, 2024 | 6:28 pm

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন মৃণাল চৌধুরী। ছাত্র রাজনীতির অধ্যায় শেষ করে চাকরি-ব্যবসা বা বিত্তবৈভবের পথে হাঁটেননি। যোগ দিয়েছিলেন শ্রমিক রাজনীতিতে। পাঁচ দশক ধরে মেহনতি মানুষদের নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন পথচলার মধ্য দিয়ে পরিণত হয়েছেন শ্রমিক আন্দোলনের কিংবদন্তি সংগঠকে। পরিবহণ শ্রমিকদের আন্দোলনে সামনের কাতারে থেকে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। রিকশা-অটোরিকশা-টেম্পু, ভ্যানটানা মজুর, বাস-মিনিবাসের চালক-সহকারী, আপামর শ্রমিকের শ্রদ্ধা আর নির্ভরতার মানুষটি তাদের প্রিয় ‘মৃণালদা’, আবার কারও কাছে কমরেড মৃণাল চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

মে দিবস সামনে রেখে সারাবাংলার মুখোমুখি হয়েছিলেন মৃণাল চৌধুরী। ছাত্র আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান বাস্তবতা, পুঁজির দৌরাত্ম্য, শ্রম আন্দোলন ঠেকাতে রাষ্ট্রের আগ্রাসী ভূমিকা, গণতন্ত্রহীনতা, মৌলবাদ— প্রায় সব বিষয়ই উঠে এসেছে আলাপে। পড়ন্ত বেলায় এসে সত্তরোর্ধ্ব এই শ্রমিক নেতার আক্ষেপ, গণতন্ত্রহীনতার কারণে শ্রমিক আন্দোলন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে, এনজিওগুলো শ্রমিক আন্দোলন ‘খেয়ে ফেলেছে’।

ছাত্র রাজনীতিতে মস্কোপন্থি, কমিউনিস্ট রাজনীতিতে চীনপন্থিদের সংস্পর্শে

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার নাটমুড়া গ্রামে জন্ম। মামার বাড়ি বাণীগ্রামে সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ১৯৬৬ সালে ভর্তি হন পাশের উপজেলায় সাতকানিয়া কলেজে। কারণ তখন পর্যন্ত বাঁশখালীতে কোনো কলেজ ছিল না। স্কুলে ফুটবল খেলতেন, গ্রামে মঞ্চনাটক-যাত্রাপালা, গানও করেছেন। কলেজে ভর্তি হয়েই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে। এর আগেই অবশ্য ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন মস্কোপন্থি-পিকিংপন্থি অর্থাৎ মতিয়া-মেনন গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। তবে সাতকানিয়া কলেজে ১৯৬৬ সালেও বিভক্তির প্রভাব তেমন ছিল না। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ডিগ্রিতে ভর্তি হওয়ার পরপরই তিনি সাতকানিয়া কলেজ শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হন।

ছাত্র ইউনিয়নের পর কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন মৃণাল চৌধুরী। পরে যুক্ত হন শ্রমিক রাজনীতিতে। সেসব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কখনো আবেগাপ্লুতও হয়ে উঠছিলেন বর্ষীয়ান এই শ্রমিক নেতা। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

স্কুলজীবনেই তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতা ও নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য অধ্যাপক আসহাব উদ্দিনের সংস্পর্শে আসেন। মৃণাল চৌধুরীর রাজনীতির প্রথম পাঠ মূলত তার কাছেই। কাছাকাছি সময়ে তিনি আরও একজনের সান্নিধ্যে আসেন— এম এম শহীদুল্লাহ। তিনি তখন ছাত্র ইউনিয়নের অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘১৯৬৬ সালে আমি যখন ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হই, তখনো সাতকানিয়া কলেজে ভাঙনের প্রভাব পড়েনি। আমরা ভাবতাম, ঐক্য হয়ে যাবে। এখন যেমন ছাত্র ইউনিয়নে বিভক্তি তৈরি হয়েছে, তখনো তেমনই ছিল। কিন্তু ঐক্য হয়নি। পরে অবশ্য মতিয়া গ্রুপের অর্থাৎ মস্কোপন্থিদের প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল। সে অর্থে সাতকানিয়া কলেজে পিকিংপন্থি কোনো গ্রুপ ছিল না। আমি ছাত্র ইউনিয়নে মস্কোপন্থি গ্রুপের নেতা ছিলাম।’

‘কিন্তু এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে। কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন হয়। তোহা-সুখেন্দু গ্রুপ বেরিয়ে আলাদা পার্টি করল, তারা চীনপন্থি ছিলেন। অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন সাহেব চীনপন্থিদের সঙ্গে ছিলেন। উনি এবং আরেকজন এমএনএ সুধাংশু দত্ত, উনারা আমার সঙ্গে সাতকানিয়া কলেজের হোস্টেলে এসে বৈঠক করেছিলেন কয়েকবার। উনাদের মুখে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, গ্রাম থেকে শহর ঘেরাও— এসব কথা শুনেছিলাম।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘তখন মতিয়া গ্রুপ বা মস্কোপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ছিলেন আবু তাহের মাসুদ আর সেক্রেটারি মুছা। তাদের সঙ্গে কিন্তু আমার মতের অমিল হচ্ছিল। আমি মস্কো নাকি চীন— কোনদিকে যাব, সেটা নিয়ে সংশয়ে ছিলাম। মাসুদরা আমাকে চীনপন্থি হিসেবে আখ্যায়িত করল। কিন্তু ছাত্র রাজনীতিতে আমি মস্কোপন্থিদের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু কমিউনিস্ট রাজনীতির ক্ষেত্রে আমার ওপর চীনপন্থিদের প্রভাব ছিল।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় চীনপন্থিদের সঙ্গত্যাগ

১৯৭০ সালে সাতকানিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে লড়েন মৃণাল চৌধুরী। কিন্তু জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একজন শিক্ষকের কারচুপির কারণে মাত্র এক ভোটে ছাত্রসংঘের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। ওই বছরই আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজ সাতকানিয়ায় গিয়ে জনসভা করেন। কয়েকদিন পর জামায়াত ইসলামী একই স্থানে জনসভা ডাকে। তখন ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী (ফাঁসিতে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী)। তিনি সেই জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন। জনসভা শেষে জামায়াত ও ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীরা শহর অভিমুখে মিছিল বের করলে ছাত্রলীগ হামলা করে। নিজামীকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আসামিদের ১০ জন ছাত্রলীগের, বাকি একজন ছাত্র ইউনিয়নের— মৃণাল চৌধুরী।

প্রথম মামলার আসামি হয়েই আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় মৃণালের। কখনো সাতকানিয়া কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে, কখনো বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীর বাড়িতে আত্মগোপনে থেকেছেন। এর মধ্যে ডিগ্রি চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হলো। জামিন নিয়ে তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে লাগলেন। তখন ঘটল আরেক ঘটনা, যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় জেলজীবনও।

শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যাওয়ার পর আর কখনো চাকরি বা ব্যবসার দিকে তাকাননি মৃণাল চৌধুরী। আজীবন শ্রমিকদের রাজনীতিই করে আসছেন। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

‘নদভী নামে ইসলামী ছাত্রসংঘের সাতকানিয়ার এক নেতা মার্শাল ল কোর্টে আবেদন করল, আমি মুক্ত থাকলে নাকি তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। আদালত আমার জামিন বাতিল করে দিলেন। গণিত প্রথম পত্র পরীক্ষার দিন আমাকে হলরুম থেকে গ্রেফতার করা হলো। আমি আর পরীক্ষা দিতে পারলাম না। মামলায় আমার ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড হয়ে গেল। জেলখানায় আমার সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়,’— বলেন মৃণাল চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

সাজা খেটে জেল থেকে যখন বের হলেন, ততদিনে সত্তরের নির্বাচন শেষ, মুক্তিসংগ্রামে দেশ উত্তাল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে বাঁশখালীতে গ্রামে ফিরে যান। জামাল নামে এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে দুটি রাইফেল কিনে ফেলেন। কয়েকদিনের মধ্যে সেই জামাল নিজের রাজাকার মামার ‍গুলিতে শহিদ হন। তখন আসহাব উদ্দিন, সুধাংশু দত্ত, পরিবহন শ্রমিক নেতা রইসুল আলমের মতো চীনপন্থি কমিউনিস্টদের নেতাদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়।

‘বাঁশখালী মূলত চীনপন্থিদের ঘাঁটি ছিল। তারা আমাকে বললেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছে তারা সবাই ভারতে পালিয়ে গেছে। এখন চীনপন্থিদের নেতৃত্বে দেশে থেকে যুদ্ধ করতে হবে। এটাকে আসহাব উদ্দিনরা একেবারে ক্যাম্পেইনে পরিণত করলেন। আমিও তাদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। অছি মিয়া নামে আরেক চীনপন্থি নেতা ছিলেন। নাপোড়া পাহাড়ে উনার খামারে আমরা একটা ঘাঁটি করলাম। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় আমি চীনপন্থিদের সঙ্গে ছিলাম।’

মৃণাল চৌধুরী আরও বলেন, ‘শেষপর্যায়ে এসে আমার কিছু রিয়েলাইজেশন হয়। পাকিস্তানি মিলিটারি চীনা বন্দুক দিয়ে আমার বাবাকে অকথ্য নির্যাতন করে। এটা আমার মনোজগতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। যখন দেখলাম সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কথা বলে চীন আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাকিস্তানকে অস্ত্র দিলো, আবার সেই অস্ত্র দিয়ে আমার দেশের নাগরিকদের হত্যা-নির্যাতন করা হচ্ছে, তখন বুঝতে পারলাম— এতদিন যা জেনে এসেছি, এতদিন আমাকে যা বোঝানো হয়েছে, সেটা ছিল ভুল। এ পথ আমার নয়। তখন আমি চীনপন্থিদের কাছ থেকে সরে যাই।’

স্বাধীন দেশে যুক্ত হন শ্রমিক রাজনীতিতে

দেশ স্বাধীনের পর মৃণাল চৌধুরী তল্পিতল্পা নিয়ে বাঁশখালী ছেড়ে চলে যান চট্টগ্রাম শহরে। যাওয়ার সময় বাবাকে বলেন, ‘বাবা, কোনোদিন আপনার কাছ থেকে এক টাকা নেব না, কোনোদিন এক টাকা দেবোও না।’ আবার ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ঘটল বিপত্তি।

মৃণাল চৌধুরী বললেন, ‘আমি চীনপন্থিদের সঙ্গ ছাড়লেও তকমাটা তো রয়ে গিয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব তখনো আমাকে চীনপন্থি হিসেবে সন্দেহ করছিল। উনারা ভাবলেন, আমাকে রাখা ঠিক হবে না। প্যারেড ময়দানে ছাত্র ইউনিয়নের বিশাল সম্মেলন হলো। আমি চেষ্টা করেও আর যুক্ত হতে পারলাম না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমি শ্রমিক আন্দোলন করব।’

‘তখন ১৯৭২ সাল। তপন দত্ত, আবু তাহের মাসুদ— উনারা ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র বা টিইউসির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তখন তো ট্রেড ইউনিয়নের রমরমা অবস্থা। আমি আন্দরকিল্লায় নিয়মিত ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে যাই। টিইউসিভুক্ত সংগঠন স মিল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফজল আজিম। আমি তাকে বললাম, আমাকে একটু ট্রেড ইউনিয়ন করা শেখান। খুব বেশি সহযোগিতা পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘তখন শহরে খোরশেদুল আলম রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন সংঘটিত করছেন। পেচু মিয়া গলিতে একজন রিকশা শ্রমিককে একজন যাত্রী মারধর করেন। ওই রিকশা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে এসে অভিযোগ করেন। খোরশেদ ভাই আমাকে সেখানে পাঠালেন। আমি একাই গেলাম। ওই যাত্রীকে খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, তিনি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন, বারবার ক্ষমা চাচ্ছেন। রিকশা শ্রমিক খুশি হয়ে গেলেন, আর আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বুঝলাম, এটাই শ্রমিক রাজনীতি। শ্রমিকের পাশে থাকতে হবে।’

মৃণাল চৌধুরী জানালেন, ওই সময় চট্টগ্রামে সুবীর নন্দী হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন ও চিত্ত মজুমদার বেকারি শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠিত করছিলেন। পেট্রল পাম্প শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে উঠছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ব্ল্যাকস্মিথ শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে উঠছিল। সব শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গেই তিনি মোটামুটি সম্পর্ক গড়ে তোলেন। রাতে আন্দরকিল্লায় টিইউসি অফিসের ফ্লোরে ঘুমাতেন। ১৯৭৩ সালে বেকারি শ্রমিকদের নিয়ে ডিসি হিল ঘেরাও করে একেবারে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলেন। সব শ্রমিক ইউনিয়নে তখন কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র আধিপত্য।

‘আমি চাকরি-বাকরির চেষ্টা করিনি। ব্যবসা করার চেষ্টা করিনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, শ্রমিক রাজনীতিই করব। কিন্তু পেটে ভাত তো দিতে হবে। ১৯৭৬ সালে বিয়ে করি। গ্রামে-শহরে পরিচিতজনদের কাছে গিয়ে রশিদ কেটে এক টাকা, দুই টাকা, আট আনা চাঁদা তুলতাম। দুমুঠো ভাতের জন্য কত কষ্ট করেছি! পরে আমাকে টিইউসির দফতর সম্পাদক করা হয়।’

১৯৭৩ সালে সিনেমা হল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নে যোগ দেন মৃণাল। তাকে চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। একই সময়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ছয় মাসের মধ্যে পার্টির সংগঠক এবং দ্বিতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধি হন। শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর চীনপন্থি তকমা মুছে যায়।

এ সময়ের মধ্যে টিইউসির বড় কর্মকাণ্ড ছিল রাঙ্গুনিয়া-চন্দ্রঘোনা এলাকায়। কর্ণফুলী জুটমিলের সভাপতি ছিলেন আবু তাহের মাসুদ, সেক্রেটারি মো. হাছান। কর্ণফুলী রেয়ন মিলের সিবিএ নির্বাচনে শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষে কাজ করার দায়িত্ব পান মৃণাল চৌধুরী। সেখানে শ্রমিক ইউনিয়ন জিতে যায়। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ১৮ বছর তিনি সেখানে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেন। কর্ণফুলী জুট মিল, রেয়ন মিল, ফোরাত কার্পেট, পেপার মিল— সবখানেই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় টিইউসি।

আলাপে সংগঠন হাতছাড়া হওয়ার বেদনার অভিজ্ঞতাও জানালেন। স মিল শ্রমিকদের মধ্যে তখন টিইউসির একক আধিপত্য ছিল। একদিন স মিল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা শুনলেন, চামড়ার গুদাম এলাকায় একটি স মিলে বসে শ্রমিক লীগ কমিটি গঠন করছে। লাঠিসোঠা নিয়ে শত শত শ্রমিক সেখানে গিয়ে হামলা করলেন। মৃণাল চৌধুরীকেও তারা নিয়ে গেলেন। পরদিন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের নির্দেশে কালুরঘাট থেকে ট্রাকে ট্রাকে শ্রমিক গিয়ে স মিল শ্রমিকদের ধরে ধরে মারধর করল, পুলিশ শত শত শ্রমিককে গ্রেফতার করল। মামলা-হামলা থেকে বাঁচতে এক রাতের মধ্যেই শ্রমিকরা ইউনিয়ন ছেড়ে আওয়ামী লীগের মৌলভী ছৈয়দ-মহিউদ্দিন গ্রুপের শ্রমিক লীগে যোগ দিলো। ওই সময়ই স মিল শ্রমিক ইউনিয়ন টিইউসির হাতছাড়া হয়ে গেল।

পরিবহণ শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে মৃণাল চৌধুরী জানালেন, কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি ২০০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছিলেন। ১২০ টাকায় শহরে একটি বাসা ভাড়া নেন। একইসঙ্গে একই ভাড়ায় আরেকটি বাসা নেন আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা নেতাদের রাখার জন্য। স্ত্রী রেখা চৌধুরী সবাইকে রান্নাবান্না করে খাওয়াতেন। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা নেতাদের মধ্যে একসময় মতভিন্নতা হয়। তারা ওই বাসা ছেড়ে দেন। তখন রইসুল আলম ওই বাসায় ওঠেন, যিনি একসময় চীনপন্থি থাকলেও পরে সেই বলয় ত্যাগ করে মূল কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হন। তিনি তখন সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন।

গণতন্ত্রহীনতার পাশাপাশি পুঁজির দাপট আর এনজিওবাদের সূত্র ধরে নয়া সাম্রাজ্যবাদী উদারনীতিকেই শ্রমিক আন্দোলনের এখনকার দুর্দশাগ্রস্ত বাস্তবতার জন্য দায়ী করছেন মৃণাল চৌধুরী। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

‘কমিউনিস্ট পার্টির ভাতা আর মানুষের কাছ থেকে হাত পেতে দু-চার-পাঁচ টাকা নিয়ে যখন চলতে হিমশিম খাচ্ছিলাম, তখন রইসুল আলম একদিন আমাকে সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের অফিসে নিয়ে যান। মূলত তিনিই আমাকে পরিবহণ শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত করেন। মাসে ৩০০ টাকা ভাতার ব্যবস্থা দেন। তখন আমি কমিউনিস্ট পার্টির ভাতা নেওয়া বন্ধ করে দিই। সেই থেকে এখনো পরিবহণ শ্রমিকদের সঙ্গে আছি।’

মৃণাল চৌধুরী বর্তমানে পূর্বাঞ্চলীয় সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি। টিইউসির চট্টগ্রাম জেলার কার্যকরী সভাপতি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সদস্য। তার অভিমত, পূর্বাঞ্চলে সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন এখন আর আগের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘এখন সে অর্থে পূর্বাঞ্চলে কোনো কাজ নেই। এটা আগে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল নিয়ে ছিল। এখন তো দুটো বিভাগ হয়ে গেছে। প্রশাসনিক অঞ্চল আলাদা হয়ে গেছে। আরেকটি বিষয়, একসময় মনজুরুল আহসান খানের সারা দেশে পরিবহণ শ্রমিকদের ওপর একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু তিনি সেটা ছেড়ে দিলেন। তিনি বলছেন, তিনি সেটা আর করবেন না। এটা এখন শাজাহান খানদের দখলে চলে গেছে। আমিও আছি, শাজাহান খানও আছেন। কেউ কাউকে বের করার মতো পরিস্থিতি নেই।’

শ্রমিক আন্দোলন করতে গিয়ে মস্কো, চেকশ্লোভাকিয়া, নেপাল, চীন, ভারতসহ আরও বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন মৃণাল চৌধুরী। যোগ দিয়েছেন নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে।

শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে এখন পদে-পদে বাধা

বর্তমান বাস্তবতায় দেশে শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেন মৃণাল চৌধুরী। অভিযোগ করলেন, সরকার শ্রমিকদের অধিকারকে মালিকের মর্জির ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কল-কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। আগে ট্রেড ইউনিয়ন তো আমরা স্বাধীনভাবে করতাম, এটা রেজিস্ট্রেশেন নেওয়ার পর মালিক জানতে পারত। এখন আমি যখন শ্রম অধিদফতরে আবেদন করতে যাই, শ্রম দফতর মালিককে জানাবে আগে— এটা আইন বলছে। সরকার মালিকদের এ সুযোগ করে দিয়েছে। মালিক এটা জানার পর যারা যারা নেতা, তাদের চাকরিচ্যুত করছে। অবস্থা এমন হয়েছে, মালিকই ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করে দিচ্ছে। মালিকের দালাল ছাড়া কারও ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ নেই। মালিকের পছন্দের ট্রেড ইউনিয়ন করার ব্যবস্থা সরকারই করে দিয়েছে।’

শ্রমিক আন্দোলন ঠেকাতে নতুন নতুন আইন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটা অসদাচরণ আইন করা হয়েছে। অসদাচরণ কী? ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, কাজে বাধা দেওয়া— এগুলো নাকি অসদাচরণ। এগুলো করলে মালিক যে কাউকে চাকরিচ্যুত করতে পারবে। এখন যে কাউকেও তো এ ধারায় ফেলে দিতে পারবে। কে এখন আর শ্রমিক আন্দোলন করতে আসবে? বেকার হয়ে যাওয়ার ভয়েও তো কেউ আসবে না।

‘বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কোথায় গণতান্ত্রিক শ্রম আইন? বরং ২০০৬ সালে বিএনপি শ্রমিক স্বার্থের বিপক্ষে যে আইনটা করেছিল, সেটাও বাতিল করেনি। তারা এখন অত্যাবশ্যকীয় পরিসেবা আইন নামে নতুন একটা আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেটা কী? সেটা হচ্ছে— বিদ্যুৎ, রেল, বন্দর, পরিবহণ, ওয়াপদা, ওয়াসা— জরুরি যেসব সেবা আছে, সেখানে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে না। এটা মন্ত্রিসভায় পাসও হয়েছে, পার্লামেন্টে পাসের জন্য যাচ্ছে। মানে সেখানেও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জায়গাটা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’

এর ফলে পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে অভিযোগ করে মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘চা শ্রমিকরা ১২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা মজুরি দাবি করেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মধ্যস্থতা করে সেটা ১৫০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেন। বাড়ল মাত্র ২৫ টাকা। এ টাকায় কি একজন শ্রমিকের পেট চলে? গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বছরে ৫ শতাংশ বাড়ানোর বিষয়টি আইনে আছে। কিন্তু মালিক পাত্তাই দেয় না। আন্দোলন-সংগ্রাম করে যে বেতন বাড়ানো হয়, সেটা হিসাব করলে ওই পাঁচ শতাংশের অনেক কম। সব খাতেই শ্রমিকদের এখন এমন দুর্বিষণহ অবস্থা। অথচ মন্ত্রী-এমপির বেতন বাড়ছে, আমলাদের বেতন বাড়ছে।’

‘সরকার নিজে শ্রম আইন মানে না, রাষ্ট্র মানে না। শ্রম অধিদফতর নিজেই শ্রম আইন মানে না, মালিকও শ্রম আইন মানে না। কিন্তু মানতে হবে শ্রমিকদের! শ্রম আইন যেটা হওয়ার কথা শ্রমিকদের স্বার্থে, সেটা হয়ে গেছে মালিকদের স্বার্থে। মালিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে শ্রম আইন। হাস্যকর হচ্ছে, এরা আবার মে দিবস পালন করে। মে দিবসের স্লোগান হচ্ছে— মালিক-শ্রমিক ভাই ভাই, উন্নয়ন ছাড়া গতি নাই! এটা কি মে দিবসের ইতিহাস?’ হে মার্কেটের চত্বরে কি এজন্য শ্রমিকরা রক্ত দিয়েছিল?— প্রশ্নের সুরে আক্ষেপ আর ক্ষোভ বেরিয়ে আসে মৃণাল চৌধুরীর কণ্ঠে।

শ্রমিক আন্দোলনের সেই স্পিরিট আর নেই

মৃণাল চৌধুরীর কাছে প্রশ্ন ছিল, বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলনের বাস্তবতা কী? জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও কেন মনে হচ্ছে এখন ভাটার টান চলছে? এখনকার বাস্তবতায় শ্রমিক নেতাদের স্বরূপই বা কী?

জবাবটা দীর্ঘ। টানলেন পুঁজির আগ্রাসন থেকে সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, আগ্রাসী পুঁজিপতির উত্থান, নয়া উদারীকরণ নীতি, এনজিওর ভূমিকা, গণতন্ত্রহীনতা, কর্তৃত্ববাদসহ নানা প্রসঙ্গ।

মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘১৮৮৬ সালে মে দিবসের পূর্বাপর বিশ্বজুড়ে কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। শ্রমিকরাই করেছেন। কিন্তু বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের ফলে পুঁজি ক্রমাগত শোষণ করতে করতে বিশ্বকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি আজ দাঁড় করিয়েছে যে এখানে শ্রমিকের সর্বশেষ অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। পুঁজি শোষণ করতে করতে যখন একটা দেশকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সেটা পুঁজিবাদ হয়। পুঁজি শোষণ করতে করতে যখন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে, তখন সেটা সাম্রাজ্যবাদ হয়।’

‘এখন মোট পুঁজির সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ উৎপাদনে আছে। বাকিটার পুরোটাই সামরিক যুদ্ধ খাতে ব্যয় হচ্ছে। কারণ পুঁজির আর কোনো বিকল্প নেই। যুদ্ধ বাঁধাতেই হবে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হচ্ছে না, কারণ এখানে আক্রমণকারী পুঁজিরও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এমন এক পরিস্থিতি, পুঁজি একচেটিয়া থেকে একচ্ছত্র আধিপত্যে চলে গেছে। এর ফলে শ্রমিক শ্রেণি তো বটেই, সব নাগরিকের অধিকারই পুঁজির দখলে চলে গেছে। আরও দুঃখের বিষয়, এর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণিকে সংগঠিত করে এগিয়ে নেওয়ার যে সংগ্রাম, সেটাও আজ অনুপস্থিত। সেটা হতে দিচ্ছে না, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি, গণতন্ত্রহীনতা।’

তিনি বলেন, ‘ইন্ডিয়ার মতো জায়গায় আজ হিন্দুত্ববাদের স্লোগান ছাড়া মোদির আর কোনো জায়গা নেই। বাংলাদেশেও একইভাবে কখনো কখনো মৌলবাদের কিছু কথা বলা ছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের ব্যবসা ছাড়া এখানেও রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার আর কোনো জায়গা নেই। এ জায়গায় তারা আইনকানুন যা আছে, গণতন্ত্র বলতে যা আছে, সবকিছুকে একবারে ধ্বংস করে দিয়েছে।’

বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনের বাস্তবতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে শ্রমিক আন্দোলন, সেটা খেয়ে ফেলেছে এনজিও। গার্মেন্টস সেক্টরে ৫৬টা ট্রেড ইউনিয়ন আছে, তার মধ্যে ৫০টা এনজিও। জাহাজ ভাঙা খাত— সেখানে শ্রমিক আন্দোলন কারা করছে? কেউ যখন সেখানে শ্রমিকদের সংগঠিত করছে না, সেখানে এনজিও ঢুকে গেছে। এনজিও বার্গেইনিং করে শ্রমিকদের কিছু পাইয়ে দিচ্ছে। অথবা তার সুখে-দুঃখে এনজিও তাকে কিছু সাহায্য করছে।’

‘কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন মানে তো একজন শ্রমিকের সার্বিক শোষণ মুক্তির আন্দোলন। এটা তো এনজিও দিয়ে হবে না। বরং তার শোষণমুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্যই এনজিওর প্রবেশ। শ্রম শোষণ থেকে মুক্তিই হচ্ছে শ্রমিক আন্দোলনের মূল স্পিরিট। এটা যেন না হয় সে জন্য এনজিও ঢুকিয়ে দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উদারীকরণের নীতি সাম্রাজ্যবাদের।’

এনজিওর খপ্পড়ে পড়ে শ্রমিক আন্দোলন ‘সিরিয়াসনেস’ হারিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ভারতের কৃষক আন্দোলন তো দেখেছেন, ২০-২২ দিন ধরে, চললাম বলে কৃষকরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। তারা তো নিজেরা বের হননি, তাদের সংগঠিত করা হয়েছে। আমরা সর্বশেষ চট্টগ্রামে ৪৮ ঘণ্টার পরিবহণ ধর্মঘট ডাকলাম। আমি ব্যাগের মধ্যে ১৫-২০ দিনের ওষুধ নিয়ে বের হয়ে গেছি।’

১৯৮৫ সালে মে দিবসে সামরিক শাসকের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘দারুল ফজল মার্কেটের সামনে থেকে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে মিছিল করে আমরা শহিদ মিনারের দিকে যাচ্ছিলাম। অপর্ণাচরণ স্কুলের সামনে আমাদের ওপর তিন দিক থেকে আক্রমণ করে পুলিশ। আমি আর বিএনপির শ্রমিক দলের নাজিমকে ধরে এক দড়িতে বেঁধে ফেলে। রেল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম এস হককেও আটক করে। ১৫ দিন পর সবাইকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু আমাকে দুমাস আটকে রেখে প্রচণ্ড নির্যাতন করে।’

‘শ্রমিক আন্দোলনের সিরিয়াসনেসের জায়গাটা তো এখন আর দেখি না। অথচ শ্রমিকরা কিন্তু প্রতিদিন লড়াই করছে। তারা জেলে যাচ্ছে, মার খাচ্ছে, ধর্ষণের মামলার আসামি হচ্ছে, গুলি করে মেরে ফেলছে শ্রমিকদের। তারপরও তো আন্দোলন থেকে তারা পিছপা হচ্ছে না। এ জায়গায় যদি বাম আন্দোলন না দাঁড়ায়, তাহলে তো হবে না। আমরা গতিহারা হয়ে গেছি। সামগ্রিক শ্রমিক আন্দোলনও গতিহারা হয়ে গেছে। কারণ তাদের সংগঠিত করার কেউ নেই। ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা এখন আর শ্রমিক আন্দোলনে আসছে না। তাহলে শ্রমিকদের সংগঠিত করবে কারা?’

মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) একটা বিশাল ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সেটা তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। শ্রমিক আন্দোলন করার সক্ষমতা তার নেই। স্কপ সাম্রাজ্যবাদের জালে বন্দি। স্কপের নেতারা পুঁজিপতির দালালে পরিণত হয়েছেন। স্কপে আজ কারা আছে? বিএনপির প্রতিনিধি আছে, আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি আছে। তাদের আর শ্রমিক আন্দোলন করার কোনো সুযোগ নেই।’

‘এরপর আছে বামপন্থিরা। তাদের মধ্যেও আছে নানা দুর্বলতা। এনজিও বামদের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। সুবিধাবাদী বাম দিয়ে বিপ্লবী আন্দোলন হবে না। সুবিধাবাদীদের হাত ধরে বাম আন্দোলনে গতি আসবে না। ওই যে সাম্রাজ্যবাদের একচ্ছত্র জায়গা, সেখানে পুঁজিবাদ দূষিত, পুঁজিবাদ ধ্বংসোন্মুখ। সে আর নিজেকে টেনে নিতে পারছে না, পুঁজিবাদের সহোদর ভাই মৌলবাদ। সুতরাং মৌলবাদ নিয়ে আলাদাভাবে বলার কিছু নেই। বুঝতে হবে এটাই— হয় পুঁজিবাদ থাকবে, না হলে বাম আন্দোলন থাকবে।’

কেন উঠে আসছে না উদাহরণযোগ্য শ্রমিক নেতৃত্ব?

ষাট-সত্তরের দশকের মতো শ্রমিক নেতৃত্ব উঠে আসছে না কেন— জানতে চাইলে মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামের একটি ঘটনা বলি। একসময়ের এক বাসমালিক, একই টেবিলে বসে আধাপাকা কাঁচকলা কেটে খেয়েছি। এখন তিনি কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক। নাম বলছি না, দেশেও থাকেন না, পা দুটো বাংলাদেশের দিকে দিয়ে সিঙ্গাপুরে বসে থাকেন। চাইলে অনেক কিছু করতে পারতাম। জীবন একটাই— কেউ ত্যাগের জীবন চায়, কেউ চায় ভোগের জীবন। ত্যাগ ছাড়া শ্রমিক আন্দোলন হয় না।’

‘ষাটের দশকে তখন পুঁজিবাদের এত চরম বিকাশ হয়নি। পুঁজির এখন আর দেওয়ার ক্ষমতা নেই। পুঁজি এখন ভাসছে শেয়ার মার্কেটে, পুঁজি এখন ভাসছে অস্ত্রের বাজারে। আমেরিকায় শিক্ষার্থীদের অস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পুঁজি এমন অমানবিকতার জায়গায় চলে গেছে। ফলে তরুণ সমাজ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ ভোগবাদে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ত্যাগের জায়গা, মানবিকতার জায়গা, অন্যের জন্য চিন্তার জায়গাটা ধ্বংস হয়ে গেছে।’

গণতন্ত্র আর শ্রমিক আন্দোলন এক সূত্রে গাঁথা উল্লেখ করে মৃণাল চৌধুরী বলছেন, গণতন্ত্র না ফিরলে চূড়ান্ত সর্বনাশ ঠেকানোর আর কোনো পথ থাকবে না। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

একইসঙ্গে গণতন্ত্র ও রাজনীতিহীনতাকেও দায়ী করলেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নেই। সব কর্তৃত্ববাদী আন্দোলন। অন্যান্য দেশে সেটা জনতুষ্টিবাদ। গণতন্ত্রের জন্য একটা লড়াই এগিয়ে নেওয়া জরুরি। তাহলে শ্রমিক আন্দোলনেও গতি আসবে। গণতন্ত্রহীনতার কারণে শ্রমিক আন্দোলন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এখন কে করবে গণতন্ত্রের আন্দোলন? ডেমোক্রেসির আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন— এগুলো গরীব মানুষের আন্দোলন। গণতান্ত্রিক আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলো করতে পারছে না। শ্রমিক শ্রেণি-মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করা ছাড়া গণতন্ত্রের আন্দোলন হবে না। দুটি আন্দোলন সমান্তরালে সংগঠিত করতে হবে। কিন্তু এটা হচ্ছে না।’

‘আজ রাজনীতি রাজনীতির চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। শ্রমিক আন্দোলন শ্রমিক আন্দোলনের চরিত্র হারিয়েছে। সাংস্কৃতিক আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র যদি আসে, তাহলে অনেক ফুলের মধ্যে কিছু ফুল হয়তো ফিরে আসবে। অনেক ফুল হয়তো ঝরে যাবে, কিছু ফুল ফেরত আসতেও পারে। না হলে চূড়ান্ত সর্বনাশ ঠেকানোর আর কোনো উপায় থাকবে না,’— বলেন মৃণাল চৌধুরী।

সারাবাংলা/আরডি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন