বিজ্ঞাপন

মেয়র-কমিশনারের হুংকারেও বন্ধ হয়নি অবৈধ পশুর হাট

June 14, 2024 | 5:34 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির মেয়র এবং ডিএমপি কমিশনারের হুংকারেও বন্ধ হয়নি অবৈধ পশুর হাট। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস ও উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছিলেন, রাজধানীতে অনুমতি ছাড়া কেউ পশুর হাট বসাতে পারবে না। অবৈধ পশুর হাট বসালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে ডিএমপি কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান এক ধাপ এগিয়ে অবৈধ পশুর হাট বিষয়ে বলেছিলেন, অনুমতি ছাড়া ডিএমপি এলাকায় কেউ পশুর হাট বসালে পশুসহ হাট সংশ্লিষ্টদের ধরে আনা হবে।

কিন্তু রাজধানীতে পশুর হাট শুরু হওয়ার নির্ধারিত দিন তারিখের আগেই অনুমোদিত পশুর হাটের পাশাপাশি অবৈধভাবেও বসানো হয়েছে পশুর হাট। এমনকি কমিশনার ঘোষণা দিয়েছিলেন, খামারি যে হাটে পশু নিতে ইচ্ছা পোষণ করবে সেই হাটেই যেতে পারবেন। এতে কেউ বাধা দিলে বা কেউ জোর করে এক হাটের পশুর ট্রাক আরেক হাটে নিয়ে গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি চাইলে ওই খামারি থানায় ছিনতাই মামলা করতে পারবেন। থানা পুলিশ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। এসবের পরও ঠিক এক হাটের পশু আরেক হাটে জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (১১ জুন) দিবাগত মধ্যরাত সোয়া ৩টার দিকে রাজধানীর উত্তরা হাউজ বিল্ডিং সংলগ্ন এক্সপ্রেসওয়েতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক লাঠিসোটা হাতে গরুর ট্রাক থামিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। একপর্যায়ে গরুর ট্রাক দাঁড় করিয়ে চালক ওই যুবকদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে।

একই রাতে রাজধানীর তুরাগ এলাকায় এক হাটের পশু জোর করে আরেক হাটে নিয়ে যাওয়ার সময় ছবি তুলতে গেলে দৈনিক আজকের পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার (উত্তরা) নুরুল আমিন হাসানের ওপর হামলা করে দুর্বৃত্তরা।

নুরুল আমিন হাসান অভিযোগ করেছেন, পুলিশের সামনেই ওই যুবকরা জোরপূর্বক এক হাটের পশু আরেক হাটে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তবুও কিছু বলেনি পুলিশ। ছবি তুলতে গিয়ে মার খেয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানালেও এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (১২ জুন) মধ্য রাতে রাজধানীর ধলপুর এলাকায় দৈনিক যুগান্তরের রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘লাঠি হাতে এক দল যুবক সড়ক দিয়ে যাওয়া গরুর ট্রাক জোরপূর্বক অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছেন। এর আশপাশে কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখতে পাননি।’

এক হাটের পশু অন্য হাটে জোর করে নেওয়ার চেষ্টা বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে ফোন করে পাওয়া যায়নি। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) ড. খন্দকার মোহিদ উদ্দিনও কোনো রেসপন্স করেননি।

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুন্সি ছাব্বির আহম্মদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘পশুর হাটের বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত এলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর মিরপুর মডেল থানাধীন পশ্চিম শ্যাওড়াপাড়া মধ্য পীরেরবাগে নির্মাণাধীন একটি ভবনের নিচে অবৈধ পশুর হাট বসানো হয়েছে। সেখানে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া গরুর ট্রাকই হচ্ছে মূল ভরসা।

বুধবার (১২ জুন) সকালে এবং বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) দুপুরে দেখা যায়, শ্যাওড়াপাড়া মেট্টোরেল স্টেশনের নিচ থেকে রাজধানীর অন্যান্য হাটে নিয়ে যাওয়া গরুর গাড়ি জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পীরেরবাগের ওই হাটে।

জানতে চাইলে হাট সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ুন রশিদ কাউকে তোয়াক্কা না করে এই অবৈধ পশুর হাট বসিয়েছেন। এই হাটের কোনো ইজারা নেওয়া হয়নি। এমনকি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এই হাটটি লিখিত বা মৌখিক কোনো অনুমতি দেয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর হুমায়ুন রশিদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এলাকা ভিত্তিক এ রকম অনেক হাট ঢাকা শহরে বসে থাকে। এটি ঐতিহ্য ঢাকা শহরের। অনুমতি নিয়ে এরকম হাট বসানো হয় না। এটি মহল্লাভিত্তিক। বিল্ডিংয়ের নিচে কয়েকটি পশু আমরা নিজেরা মিলে কেনাবেচা করছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে কাউন্সিলর বলেন, ‘সম্পর্কের ভিত্তিতে বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েকজন খামারি গরু নিয়ে আসছে। আমরা এর বাইরে কোনো গরু এখানে আসতে দেই না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে সাদেক হোসেন খোকা মাঠ নামে একটি হাটের ইজারা দেওয়া হলেও আদতে মাঠের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই কাগজে কলমে এই নামে প্রতি বছর হাটের ইজারা দেওয়া হলেও মূলত হাট বসে সড়ক বন্ধ করে। তবে এবার এই নামে হাট ইজারা না দিলেও সড়কের দুই পাশে বাঁশ ও ত্রিপল খাটিয়ে পশু রাখা হয়েছে। এই হাটের সীমানা ছড়িয়ে পড়ে দয়াগঞ্জ মোড় থেকে মুরগীটোলা হয়ে কাঠেরপুল এবং লোহারপুল পর্যন্ত। কোনো কোনোবার সুত্রাপুর থানার সামনের সড়ক পর্যন্ত পশুর হাট বিস্তৃত হয়।

প্রায় কাছাকাছি ধোলাইখাল মাঠ নামে আরেকটি হাটের ইজারা দিয়েছে ডিএসসিসি। অথচ বাস্তবে ধোলাইখাল নামে কোনো মাঠ নেই। সেখানে ধোলাইখাল এলাকার সড়কের দুই পাশের সড়কে পশুর হাট বসানো হয়ে থাকে। এই হাটের বিস্তৃতি রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে শুরু করে মুরগীটোলা পর্যন্ত।

ফলে পুরো এলাকার ৫/৭ কিলোমিটার এলাকার সড়ক দিয়ে ১০ দিন কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। বছরের পর বছর এরকম অবৈধ পশুর হাটের কর্মকান্ড চললেও পুলিশ কিংবা সিটি করপোরেশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ধোলাইখাল হাটের ম্যানেজার আব্দুল আউয়াল সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাঠ নেই তাই সড়কে হাট বসানো হয়েছে। সিটি করপোরেশন ইজারা দিয়েছে তাই ইজারার টাকা ‍তুলতে যেখানে ইচ্ছা সেখানে হাট বসানো দোষের কিছু নয়।’

ডিএসসিসির ইজারা দেওয়া হাটগুলো হলো খিলগাঁও রেলগেইট মৈত্রী সংঘ ক্লাবসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি মাঠ, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট পাশের খালি জায়গা, বনশ্রীর মেরাদিয়া বাজারের পাশের খালি জায়গা, লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব ও কমলাপুর স্টেডিয়ামের পাশের খালি জায়গা, দনিয়া কলেজের আশপাশের খালি জায়গা, ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের পাশের খালি জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউন, রহমতগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশের খালি জায়গা এবং ডেমরার সারুলিয়ায় সিটি করপোরেশনের স্থায়ী হাট।

ঢাকা উত্তর সিটির মধ্যে সবচেয়ে বড় হাটটি হলো গাবতলী হাট। পাশাপাশি আগের মতো থাকছে অস্থায়ী হাট। অস্থায়ী হাটগুলো হলো, উত্তরা দিয়াবাড়ীর ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরের পাশের খালি জায়গা, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশের খালি জায়গা, মস্তুল চেকপোস্ট এলাকা, মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গা, ভাটারার সুতিভোলা খালের কাছের খোলা জায়গা, মোহাম্মদপুরের বছিলায় ৪০ ফুট সড়কের পাশের খালি জায়গা, ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে রানাভোলা স্লুইচগেট পর্যন্ত খালি জায়গা ও দক্ষিণখানের জামুন এলাকার খালি জায়গা।

অবৈধ পশুর হাটের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের চৌধুরীকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।

সারাবাংলা/ইউজে/একে

Tags: , , , , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন