বিজ্ঞাপন

বছরব্যাপী কার্যক্রম, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখার আশাবাদ রাসিকের

June 21, 2024 | 11:29 pm

মাহী ইলাহি, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

রাজশাহী: গত বছরের জুলাইয়ে রাজশাহী নগরীর পাঁচটি স্থানে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। এরপর নড়েচড়ে বসে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নখ্যাত রাজশাহী নগরীতেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সারা দেশের মতো বেড়ে গিয়েছিল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মৃত্যুর ঘটনাও ছিল নিত্যনৈমত্তিক।

বিজ্ঞাপন

ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল রাসিক। শুরু হয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম। চলে নানা অভিযান। সিটি করপোরেশন বলছে, ডেঙ্গুর এখন আর কোনো মৌসুম নেই। তাই বছরব্যাপী পরিকল্পিত নানা কর্মসূচি তারা পালন করেছে। এ কারণে রাজশাহী সিটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপও নিয়ন্ত্রণে আছে।

সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের আইসিটি শাখার তত্ত্বাবধানে ওয়েবসাইট ও স্বাস্থ্য বিভাগের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গু নিয়ে সতর্কতামূলক বার্তা দিয়ে আসছে। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নগরীর ৩০ ওয়ার্ডের স্কুল, কলেজ ও পাড়া-মহল্লার জনসাধারণের মাঝে প্রায় দুই লাখ সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রম চলবে চলতি জুন পর্যন্ত। এ ছাড়া এ বছরের মার্চ থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে সিটি পর্যায়ে ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই কর্মসূচিও চলমান থাকবে জুন মাস পর্যন্ত।

আরও পড়ুন- খুলনা সিটির দাবি ডেঙ্গু প্রতিরোধে তৎপর, নগরবাসীর দ্বিমত

বিজ্ঞাপন

এদিকে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগ সূত্র জানায়, রাজশাহী নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই একজন স্বাস্থ্য সহকারীর নেতৃত্বে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ওয়ার্ডের প্রতিটি ব্লক অনুযায়ী উঠান বৈঠক কর্মসূচি চলছে। এ ছাড়া ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রোধে চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সচেতনতা তৈরিতে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে স্কুল পর্যায়ে ওরিয়েন্টশন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। রাসিকের জনসংযোগ শাখার উদ্যোগে আগামী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে।

সূত্র জানায়, আগামী জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে মেডিকেল সেন্টার, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্লাব প্রতিনিধি, স্থানীয় সুশীল সমাজ ও স্বাস্থ্য সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে ওরিয়েন্টশন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেও নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে ওয়ার্ড কাউন্সিলদের সমন্বয়ে ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠিত ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

রাজশাহী সিটি হাসপাতালসহ নগরীর ১৩টি বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই সারা বছর বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা রেখেছে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া এই ১৩টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সারা বছরই ডেঙ্গু রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থায়ী কমিটির উদ্যোগে চলমান কাজের অংশ হিসেবে সারা বছরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতার লক্ষ্যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিভিন্ন পদক্ষেপও অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- বর্ষা শুরু, মশার উৎপাতে ডেঙ্গুর শঙ্কা— তবু হাত গুটিয়ে চসিক

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার লার্ভা যেন কোথাও জন্মাতে না পারে, সেজন্য নগরীর প্রতিটি আনাচে-কানাচ সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্ন রাখতে সারা বছর সিটি করপোরেশনের একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ও এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে সিটি করপোরেশন এলাকায় বাসাবাড়ির বাইরে ফেলে রাখা ফুলের টব, ভাঙা হাড়ি-পাতিল, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, ভাঙা কলস, ড্রাম, ডাব-নারিকেলের খোসা, এয়ারকন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটারের তলায় পানি যেন জমে থাকতে না পারে, সেজন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এই বিশেষ টিম কয়েকদিন পরপর সিটি করপোরেশন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আসছে।

এ ছাড়া প্রতি মাসে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে সিটি পর্যায়ে গঠিত ডেঙ্গু ও মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি সামগ্রিক কাজের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন তৈরি করে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে হালনাগাদও হয়ে থাকে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের অব্যাহত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের তত্ত্বাবধানে মসজিদগুলো ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রোধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর তিন মাসব্যাপী মাইকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। শুধু তাই নয়, মসজিদে খতবার সময় ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতামূলক নানা বার্তা মসজিদের ঈমামের মাধ্যমেও দিয়ে আসছে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া ডেঙ্গুর চিকিৎসা সেবা সচল রাখতে সিটি করপোরেশনের ৪০ জন স্বাস্থ্য সহকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা সিটি এলাকার বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর এখন আর কোনো সময় বা মৌসুম নেই। যেকোনো সময় মহামারি আকার ধারণ করতেই পারে। সেজন্য রাসিক সারা বছরই সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে শুরু করে বিনামূল্যে ডেঙ্গু চিকিৎসাসহ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে।’

বিজ্ঞাপন

সিটি করপোরেশনের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মেয়র ও কাউন্সিলর যখন যেই প্রোগ্রামই করুন না কেন, সেখানে ডেঙ্গু নিয়ে একটু হলেও সচেতনামূলক আলোচনা হয়। শুধু তাই নয়, এডিস মশার লার্ভা ও ডিম ধ্বংস করার কাজ আমরা সারা বছরই করছি। এ ছাড়া আমাদের পরিচ্ছন্ন বিভাগের ছোট্ট একটি টিম সিটি করপোরেশনের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে নিয়মিত বাসা-বাড়ি ও এর আশপাশের ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার রাখতে অনুরোধ জানাচ্ছে এবং এই কার্যক্রম সারা বছরই চলমান। পাশাপাশি আমাদের যেসব স্বাস্থ্যকর্মী গর্ভবতী মা ও শিশুদের নিয়ে কাজ করেন, তারাও ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতামূলক বার্তা দিয়ে আসছেন।’

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফ এ এম আঞ্জুমান আরা বেগম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। নগরীর ১৩টি পয়েন্টে ফ্রিতে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা সারা বছরই রাখা হয়েছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসাও বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য কর্মীরা নানা ধরনের সচেতনতামূলক নানা কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে রাজশাহীতে ডেঙ্গু বেশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’

এদিকে রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে মোট ৫২৯ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এই হাসপাতালে। এদের মধ্যে ৫২৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। মারা গেছেন ছয়জন।

এরপর ২০২৩ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৪৩১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে রাজশাহী জেলার আক্রা ছিলেন চার হাজার ১৯৮ জন। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল চারঘাট ও বাঘা উপজেলার। মহানগরের রোগী ছিল তুলনামূলকভাবে কম। মৌসুমটিতে রামেক হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন পাঁচ হাজার ৩৯৩ জন।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। ৯ জানুয়ারি সবশেষ রোগী ভর্তি হয়েছিল। এরপর আর নতুন কোনো রোগী ভর্তি হয়নি।

জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম এ শামীম আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত মৌসুমে হাসপাতালে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের জন্য তখন আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছিল। এবার বর্ষা শুরুর আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। সবাই যদি সচেতন হয় তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

সারাবাংলা/টিআর

Tags: , , , , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন