বিজ্ঞাপন

বিল দেয় না ১৭ সরকারি সংস্থা, বকেয়া ১৩০ কোটি টাকা

June 25, 2024 | 8:56 pm

ইমরান চৌধুরী, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে ১৭ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পাওনা বিল প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি বিল বকেয়া রেখেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরনা দিয়েও সরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে পুরোপুরি বকেয়া আদায় করতে পারছে না পিডিবি। শেষপর্যন্ত পাওনা আদায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে অন্যদের বার্তা দিয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

একদিকে বকেয়া বিল আদায় করতে পারছে না, অন্যদিকে অর্থের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে পারছে না পিডিবি।

নাগরিক স্বার্থ নিয়ে সোচ্চার সংগঠনগুলো বলছে, সাধারণ গ্রাহকের একমাসের বিল বকেয়া থাকলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় আর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর বিল পরিশোধ না করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। সরকারি সংস্থাই যদি বিল না দেয়, তাহলে সাধারণ গ্রাহক কেন দেবে ?

সোমবার (২৪ জুন) বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) একাডেমিক ভবন ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দফতরের (সিআরবি) বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় পিডিবি। মূলত এরপরই সরকারি সংস্থার কাছে পিডিবির পাওনার বিষয়টি আবারও জোরালো আলোচনায় এসেছে। তবে বিল পরিশোধের জন্য সময়ের আবেদন করে সাত ঘন্টা পর চমেক এবং পাঁচ ঘন্টা পর সিআরবি বিদ্যুৎ ফেরত পায়।

বিজ্ঞাপন

পিডিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ সরকারি ১৭ প্রতিষ্ঠানের কাছে ১২৮ কোটি ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৪১৫ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া আছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের কাছেই বকেয়া ৬৩ কোটি ৯৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৯০ টাকা।

সেনাবাহিনীর কাছে ২০ কোটি ১২ লাখ ২৪ হাজার ৬৯২ টাকা, পুলিশের কাছে ৮ কোটি ১৩ লাখ ৩২ হাজার ২১ টাকা, নৌবাহিনীর কাছে ৭ কোটি ৭৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৫, বিমানবাহিনীর কাছে এক কোটি ৭৫ লাখ ৮৯ হাজার ২৭৭ টাকা এবং কোষ্টগার্ডের কাছে এক কোটি ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৪২ টাকা পাবে পিডিবি।

বিজ্ঞাপন

রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ৭ কোটি ২১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৯২, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার ২৪, গণপূর্ত বিভাগে এক কোটি ৫০ লাখ ২৫ হাজার ৫৯৭ কোটি, সড়ক ও জনপথ বিভাগে ৬৮ লাখ ৪৭ হাজার ২২৯, জনস্বাস্থ্যে ৫ কোটি ৭৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৬৮, পৌরসভায় ৩ কোটি ৩১ লাখ ৩৫ হাজার ৬১৭, ওয়াসা ১৯ লাখ ৪১ হাজার ২৬৫, বন বিভাগে ১০ লাখ ৪ হাজার ৪০৭, শিক্ষা বিভাগে ৭০ লাখ ৩০ হাজার ১২২, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে ৭০ হাজার ৩২৫ ও খাদ্য অধিদফতরে ৯৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৯৭ টাকা বকেয়া আছে সংস্থাটির।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে সাত-আট বছর আগের বকেয়া পাওনা আছে। অন্য সংস্থাগুলোর কাছে অন্তঃত এক থেকে দুই বছর আগের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া আছে। তাগাদা দিলে সংস্থাগুলো কিছু বিল পরিশোধ করে। তবে পুরোপুরি বিল পরিশোধ করে বকেয়ামুক্ত হওয়ার আগ্রহ নেই কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানেরই।

এ অবস্থায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পাওনা আদায়ে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা জানিয়েছেন পিডিবি চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (বিতরণ) মো. হুমায়ুন কবির মজুমদার।

হুমায়ুন কবির সারাবাংলাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে বকেয়া বিলের নব্বই শতাংশই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের। বিল পরিশোধ করার জন্য আমরা সব সংস্থাকে নোটিশ দিয়েছি। কিন্তু বিল পরিশোধে আমরা সেভাবে সাড়া পাচ্ছি না। বকেয়া বিল পরিশোধ না করলে যতই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হোক না কেন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। এটা নিয়মিত কাজের একটি অংশ। যেহেতু অর্থবছর শেষ, তাই বাজেট থেকে আগে ব্যবহার করা বিদ্যুৎ বিল আদায়ে খেলাপি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ অস্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা হবে।’

বিজ্ঞাপন

এদিকে বিলখেলাপি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকে না। অন্য খাত থেকে বরাদ্দ বিদ্যুতের জন্য ব্যয়েরও সুষ্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। এর ফলে নিয়মিত পরিশোধের পরও বকেয়া থেকে যাচ্ছে।

সোমবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান পিডিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চিঠি দিয়ে বিল পরিশোধে সময়ের আবেদন করেন। এতে বিদ্যুৎ খাতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি রেলওয়ের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে উল্লেখ করে বিল পরিশোধে জুলাই পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (পূর্ব) সাইফুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাজেট আছে। টাকা যে একদম নেই সেটা বলব না। কিন্তু সেগুলো অন্য খাতের। অন্য খাতের টাকা আমাদের বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাই বলে উনারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে সেটা কাম্য নয়। গত দুই মাসে উনারা দুবার রেলওয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। সামনের অর্থবছরে সরকার থেকে বরাদ্দ পেলেই সব বকেয়া বিল পরিশোধ করা হবে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) হিসাব শাখার ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘৬৩ কোটি টাকার যে বকেয়া বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, সেটা সাত থেকে আট বছর আগের। চসিকের মেয়র হিসেবে রেজাউল করিম স্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদ্যুৎ এর কোনো বকেয়া রাখা হয়নি। সেটা উনাদের প্রধান প্রকৌশলী এসে আমাদের কাছে এসে স্বীকার করেছেন। আগের বকেয়া বিলের বিষয়ে উনারা কী সিদ্ধান্ত নেবেন সেটা উনারা জানেন। সেটা তো আর আমরা বলতে পারব না। তাছাড়া মূল বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ২৬ কোটি টাকা। বাকিগুলো সারচার্জ।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (জনসংযোগ) তারেক আজিজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘পিডিবির কাছে সিএমপির কিছু বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আছে। এখন অর্থবছর প্রায় শেষ। অর্থবছরে নতুন বাজেট পাশ হলেই অর্থ বরাদ্দ হয়। অর্থ বরাদ্দ হলেই বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে সিএমপির বকেয়া বিল পরিশোধ করে দেওয়া হবে।’

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, অর্থসংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। এর ফলে জ্বালানি কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জ্বালানির সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সকল আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোকে বকেয়া পাওনা আদায়ে নিয়মিত তাগাদা দেয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এম নাজের হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিলের যে তথ্য আমাদের কাছে আছে, সেখানে ছোট বা সাধারণ গ্রাহকদের কোনো বকেয়া নেই। কারণ প্রি-পেইড সিস্টেমে বিল বকেয়া থাকলেই সংযোগ নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া।’

‘সাধারণ গ্রাহককে তো একদিনও সময় তারা দেন না। সরকারের প্রতিষ্ঠান যদি বিল না দেয়, সাধারণ পাবলিক কেন দেবে। কীভাবে বিদ্যুৎ বিলের টাকা তারা বরাদ্দ নিয়ে আসবে সেটা তাদের বিষয়। এত টাকার বিল তারা কীভাবে বকেয়া রাখে, এটা হতাশাজনক। সবার জন্য সমান ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিমাতাসুলভ আচরণ কোনোভাবে কাম্য নয়,’ – বলেন এম নাজের হোসাইন।

সারাবাংলা/আইসি/আরডি/একে

Tags: , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন