বিজ্ঞাপন

‘অজানা কারণে’ সিডিএ কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি – আদালতের পর্যবেক্ষণ

July 10, 2024 | 7:50 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার ধসে ১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগপত্র থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ‘অজানা কারণে’ বাদ দেয়া হয়েছে বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন আদালত। মামলাটি অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন থাকলেও এক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতায় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ন্যায়বিচারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা ছিল বলে মনে করেন আদালত।

বিজ্ঞাপন

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত ফ্লাইওভার ধসে প্রাণহানির ঘটনাকে বাংলাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয়ের অন্যতম কালো অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন। ফ্লাইওভার নির্মাণকাজে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সঙ্গে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মীর আক্তার অ্যান্ড পারিশা ট্রেড সিস্টেমস এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএআরএম অ্যাসোসিয়েটস অ্যান্ড ডিপিএমের কোনো সমন্বয় না থাকা, ন্যূনতম নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে প্রাণহানির পর সংস্থাগুলোর পরস্পরের দোষারোপের বিষয়টিও আদালতের পর্যবেক্ষণে এসেছে।

বুধবার (১০ জুলাই) চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঞা এ মামলার রায় দেন। এতে আটজন আসামির প্রত্যেককে দণ্ডবিধির পৃথক দুই ধারায় সাতবছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

রায়ের সারসংক্ষেপের সঙ্গে আদালতের উল্লেখ করা পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অতিরিক্ত মহানগর পিপি অনুপম চক্রবর্তী সারাবাংলাকে বলেন, ‘রায়ের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আদালত দিয়েছেন। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা না থাকার বিষয়টি এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল প্রতিষ্ঠান সিডিএ। তাদের সঙ্গে ঠিকাদারের কোনো সমন্বয় ছিল না। যদিও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আটজন কর্মকর্তাকে সাজা দেয়া হয়েছে, কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণে এটাই প্রতীয়মান হয়েছে, হতাহতের ঘটনায় সিডিএ দায় এড়াতে পারে না।’

বিজ্ঞাপন

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের তিনটি গার্ডার ধসে ১৩ জন নিহত হন। আহত হন অর্ধশতাধিক। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএর তখনকার চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা আবদুচ ছালাম। তিনি রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া প্রথম সিডিএ চেয়ারম্যান। সংস্থাটি চট্টগ্রাম নগরীতে প্রথম ফ্লাইওভারের নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল, যাতে দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রাণহানি ঘটতে পারে, এমন জ্ঞান আসামিদের ছিল না:

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ফ্লাইওভার ধসের মামলা প্রচলিত ফৌজদারি মামলার মতো নয়। এখানে ঘটনা প্রমাণের আবশ্যিকতা ছিল না, ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত। নিহতের ক্ষেত্রে আসামিদের কোনো ‘ক্রিমিনাল ইনটেনশন ছিল না, তবে ভিকটিমদের মৃত্যু ঘটতে পারে এমন জ্ঞান তাদের ছিল না।

বিজ্ঞাপন

মানবিক বিপর্যয়ের দায় ‘ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক’ উল্লেখ করে আদালত বলেন, বেপরোয়া ও অবহেলাজনিত এই দুর্ঘটনার দায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মালিক থেকে শুরু করে সকল কর্মচারীর, যারা যে-ই পদেই থাকুক না কেন। এ দায় আসামির ব্যক্তিগত দায় নয়, বরং প্রতিষ্ঠানিক দায়। প্রতিষ্ঠান দায়ী হওয়ায় কর্মচারি হিসেবে আসামিরা সমান দায়ী। অপরাধমূলক অবহেলার জন্য আসামিদের ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকাটা আবশ্যিক নয় মর্মে আদালত মনে করে।

‘প্রতিষ্ঠানের দায়ের সাজা কর্মরত কর্মচারিদের সাজা ভোগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে। না হলে ভবিষ্যতে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হুমকির মুখে পড়বে। একইসাথে দুর্ঘটনার শিকার নিম্নবিত্ত মানুষগুলো পরিবারের অভিশাপ থেকে এ দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে না।

অজানা কারণে ‘দায়মুক্তি’, নারাজিও দেয়নি রাষ্ট্রপক্ষ:

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, মামলার বাদী এজাহারে আসামির তালিকায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিডিএ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। কিন্তু অজানা কারণে তাদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ কিংবা কোনো ভিকটিম ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নারাজি আবেদন করেননি। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যেও অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের বিষয়ে কিছু আসেনি।

বিজ্ঞাপন

অপরাধমূলক অবহেলার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দায়- এ নীতিতে আসামিদের সাজা দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে আদালত বলেন, ‘এক্ষেত্রে অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের মামলায় সম্পৃক্ত করার জন্য মামলাটি অধিকতর তদন্তে পাঠানো হলে কিন্তু সেটি দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতো। এতে ভিকটিমের পরিবার ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলত বলে আদালত মনে করে।

বিচারে একযুগ সময়ক্ষেপণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আদালত বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্তের দ্রুত বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত না করা রাষ্ট্র এবং বিচারকার্যে জড়িত সকলের ব্যর্থতা।

সিডিএর সঙ্গে ঠিকাদারের সমন্বয় ছিল না:

সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার অভাবের বিষয়টি সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতীয়মান হওয়ার কথা উল্লেখ করে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, নির্মাণকারী (সিডিএ), ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজের সমন্বয় ছিল না। ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো এতো বিশাল কর্মযজ্ঞে ন্যূনতম নিরাপত্তা পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপের বিষয়টি উঠে এসেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

দুর্ঘটনার পর ভিকটিমের পরিবারকে সিডিএ পঞ্চাশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়, যা খুবই অপ্রতুল বলে মনে করেন আদালত।

সারাবাংলা/আরডি/এনইউ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন