বিজ্ঞাপন

বাবুলকে ‘বাঁচিয়ে’ দাখিল হচ্ছে মিতু হত্যা মামলার অভিযোগপত্র

June 3, 2018 | 7:14 pm

রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চাকরিচ্যুত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের দুই বছরে এসে মামলার তদন্ত শেষ করেছে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযোগপত্রও চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে মিতুর মা-বাবার অভিযোগ থাকলেও এই অভিযোগপত্রে আসামির তালিকায় থাকছে না বাবুল আক্তারের নাম। তদন্তকারী কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাননি। এজন্য বাবুলকে মামলার বাদী হিসেবে অভিযোগপত্রে এক নম্বর সাক্ষী করা হচ্ছে।

চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা না হলেও সোমবার (৪ জুন) অথবা এর পরদিন মঙ্গলবার (৫ জুন) অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে দায়িত্বশীল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তবে বাবুলকে রেহাই দিয়ে কোনো অভিযোগপত্র দেওয়া হলে মিতুর পরিবার সেটি গ্রহণ করবে না বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

বিজ্ঞাপন

মিতু হত্যা মামলা তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহার সারাবাংলাকে বলেন, ‘কাল-পরশুর মধ্যেই বিস্তারিত জানতে পারবেন।’

মঙ্গলবার (৫ জুন) মিত্যু হত্যা মামলার দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ ঘটনায় বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি-ডিবি-উত্তর) মো. কামরুজ্জামান।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগপত্র চূড়ান্ত হয়েছে জানিয়ে কামরুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেবো।’

মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন দাবি করে আসছিলেন, বাবুল আক্তারের পরিকল্পনায় ও নির্দেশে তার মেয়ে মিতুকে খুন করা হয়েছে। দুই বছরের মাথায় এসেও মোশাররফ তার এই দাবিতে অনড় রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি সারাবাংলাকে বলেন, পরকীয়ার জেরে বাবুল আক্তারই আমার মেয়েকে খুন করেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাদের যখন ডেকেছিলেন, তখন আমরা এ বিষয়ে তাকে বিস্তারিত জানিয়েছি, তথ্যপ্রমাণও দিয়েছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের কথা আমলে না নিয়ে বাবুল আক্তারকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দিলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

তিনি বলেন, মামলার মূল আসামি হওয়ার কথা বাবুল আক্তারের। অথচ মূল আসামি বাইরে ঘুরছে।

বিজ্ঞাপন

‘বাবুল আক্তার যদি আমার মেয়ের খুনের সাথে জড়িত না থাকে, তাহলে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো কেন?’, প্রশ্ন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার।

তিনি বলেন, আগে অভিযোগপত্র দিক। পরে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেবো।

মোশাররফ হোসেনের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে এডিসি কামরুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা তদন্তে বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার তথ্য পাইনি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু তদন্তে যদি সেটা প্রমাণ না হয় তাকে আসামি কিভাবে করব?

‘আর মোশাররফ সাহেব একেকসময় একেক কথা বলেন। আগে বলেছিলেন, বাবুল আক্তার জড়িত নন, এখন বলছেন জড়িত। আমরা কোনটা বিশ্বাস করব?’, পাল্টা প্রশ্ন এডিসি’র।
বাবুলকে ‘বাঁচিয়ে’ দাখিল হচ্ছে মিতু হত্যা মামলার অভিযোগপত্র
একই প্রসঙ্গে সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ‘সব অভিযোগই তো খতিয়ে দেখেছি। বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার প্রমাণ পাইনি।’

সূত্রমতে, মিতু হত্যায় নেতৃত্বদাতা হিসেবে যার নাম এসেছে, সেই কামরুল সিকদার মুছাকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। যদিও মুছার স্ত্রীর দাবি, তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে অজ্ঞাত স্থানে রেখেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাও মুছা পর্যন্ত গিয়ে তদন্ত শেষ করে দিয়েছেন। মুছা ছিলেন সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের সোর্স। মুছাকে বাবুল আক্তারই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে ঘটনার পরে গণমাধ্যমে তথ্য এসেছিল।

খুনের নির্দেশদাতা এবং কী কারণে হত্যাকাণ্ড, তদন্তে পাওয়া তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে এডিসি কামরুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘অভিযোগপত্রে সবকিছু পরিষ্কার হবে।’

তবে বরাবরের মতো নিশ্চুপ আছেন বাবুল আক্তার। বর্তমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত বাবুলকে গত এক সপ্তাহ ধরে মোবাইলে বারবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়ে পুলিশ যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন না করে তাহলে তদন্ত মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাবুল আক্তারের বিষয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর নির্মোহ তদন্ত নিশ্চয় তদন্তকারী কর্মকর্তা করেছেন। সেই তদন্তে যে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে সেগুলো প্রকাশ করা প্রয়োজন। না হলে অভিযোগপত্রে খুনের যে কারণ উল্লেখ করা হবে সেটা সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কারণ এটি অত্যন্ত আলোচিত এবং স্পর্শকাতর একটি মামলা।’

এদিকে মিতু হত্যা মামলার অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করা হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা এখনও সাক্ষ্যস্মারকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর মতামত নেওয়া হয়নি। যে কোন স্পর্শকাতর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলির মতামত নেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।

ফখরুদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, সাক্ষ্যস্মারকে মতামত নিতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এটা একটা রীতি। তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলা প্রমাণের স্বার্থেই অভিযোগপত্র দাখিলের আগে সেটার সারসংক্ষেপে আইন কর্মকর্তার মতামত নেন। এতে তদন্তের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো আগেই ধরা পড়ে। নির্ভুল অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হয়। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়।

ঘটনাক্রম
২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ও আর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন মিতু। এ ঘটনায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

হত্যা মামলায় ওই বছরের ৮ জুন ও ১১ জুন নগর গোয়েন্দা পুলিশ হাটহাজারি উপজেলা থেকে আবু নসুর গুন্নু ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার শীতল ঝর্ণা থেকে শাহ জামান ওরফে রবিন নামে দু’জনকে গ্রেফতারের খবর জানায়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিতু হত্যায় তাদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
বাবুলকে ‘বাঁচিয়ে’ দাখিল হচ্ছে মিতু হত্যা মামলার অভিযোগপত্র
ওই বছরের ২৪ জুন রাতে ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুল আক্তারকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর ফলে সন্দেহের তীর যায় বাবুলের দিকে। হত্যায় বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার তথ্য নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। এ সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাবুল আক্তার স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন।

২৬ জুন মো. আনোয়ার ও মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম নামে দু’জনের গ্রেফতারের খবর প্রকাশ করে পুলিশ। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।তারা হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে জানান, মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি তাদের দিয়েছিলেন এহেতাশামুল হক ভোলা।

তারই সূত্র ধরে মামলার অন্য দুই আসামি এহেতাশামুল হক ভোলা ও তার সহযোগী মো. মনিরকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পয়েন্ট ৩২ বোরের একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়, যেটি মিতু হত্যায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ভোলা ও মনিরকে আসামি করে একটি অস্ত্র মামলা করা হয়।

এরপর ১ জুলাই মোটরসাইকেল সরবরাহ করার অভিযোগে মুছার ভাই সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু ও শাহজাহান নামে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাইদুল এরই মধ্যে জামিন পেয়েছেন।

দীর্ঘদিন নিশ্চুপ থাকার পর ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন বাবুল আক্তার। নানা নাটকীয়তা শেষে ৬ সেপ্টেম্বর বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে তদন্ত কর্মকর্তার আমন্ত্রণে একে একে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে আসেন মিতু ও বাবুলের মা-বাবা এবং বাবুল আক্তার নিজে। বাবুলের বিরুদ্ধে পরকীয়ার জেরে একজন পুলিশ কমকর্তাকে হত্যার অভিযোগ করতে ঝিনাইদহ থেকে একটি পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এসেছিলেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে।

সারাবাংলা/আরডি

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন