বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

সিনিয়র-জুনিয়র ফুটবল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

ডিসেম্বর ৯, ২০১৭ | ৫:৩৫ অপরাহ্ণ

জাহিদ হাসান, স্পোর্টস করেসপন্ডেন্ট

বিজ্ঞাপন

মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দুটাই দেখছে বাংলাদেশের ফুটবল। একদিকে যখন একের পর এক হার দিয়ে ফুটবলের মৃত্যু ডেকে লজ্জার নিদর্শন তৈরি করেছেন মামুনুল-এমিলিরা, অন্যদিকে, সম্প্রতি বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলোতে লাগাতার ধারাবাহিক সাফল্য দেখিয়ে ফুটবলের আশা জিইয়ে রেখেছেন জাফর-ফয়সালরা। সিনিয়র পর্যায়ে ভরাডুবি আর জুনিয়রে এমন সাফল্য অবধারিতভাবে একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়-সিনিয়র-জুনিয়রে এমন পার্থক্য কেন?

এই বিরাট বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধানে ফুটবল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে সারাবাংলা। এতে উঠে এসেছে দেশের ফুটবলের নানান অবহেলা আর সমস্যার খণ্ড চিত্র।সিনিয়র পর্যায়ে যে ফুটবল পরিপক্কতা প্রয়োজন হয় সেটা বাংলাদেশে নেই। এই পরিপক্কতা বয়সভিত্তিক পর্যায়ে স্থায়ী হয় বলে মনে করেন জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন কোচের দায়িত্ব পালন করা মারুফুল হক। তিনি জানান, ‘বয়সভিত্তিক যে ট্যাকনিকাল লেভেল থাকে তা সিনিয়র লেভেলে এক নয়। আর যেটা আছেও সেটা যথেষ্ট নয়। তৃণমূল থেকে এটা স্থায়ী হয়। যুব পর্যায় যারা খেলে তাদের পরিপক্কতা ও সিনিয়রদের পরিপক্কতা এক নয়। অন্য দেশের কথা যদি বলা হয় তারা একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকেই ফুটবল খেলে। শিখে। পরিপক্কতা অর্জন করে।’

সেই বড়-ছোটদের পরিপক্কতার পার্থক্য এবার জয়-হারের পরিসংখ্যানে মেপে দেখা যাক। ছোটদের এই একবছরের পারফর্মেন্স একটু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়,

বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মিলে মোট ১৪ টি ম্যাচ খেলেছে জুনিয়ররা। এর মধ্যে ৯টি জয় একটি ড্র আর হার ৪টি। দেশের ফুটবলের এমন সংকটকালে এই সাফল্যকে কি আখ্যা দিবেন?

‘অবিশ্বাস্য।’  অন্যদিকে ২০১৬ তে ৯টি ম্যাচ খেলেছে মামুনুল-জাহিদরা। তার মধ্যে শ্রীলঙ্কা ছাড়া কোনো জয় নেই সিনিয়রদের খাতায়। বাকি ৮টার মধ্যে ২টি ড্র আর বাকি ৬টিই হার। তার মধ্যে সবশেষ ভূটানের বিপক্ষে সেই কলঙ্কময় ৩-১ গোলের হারতো আছেই। তারপরেই আক্ষরিক অর্থেই বোতলবন্দী হয়ে আছে সিনিয়র ফুটবল।

যার হাত ধরে জুনিয়র পর্যায়ে এমন সাফল্য এসেছে সেই মাহবুব হোসেন রক্সি জানান, ‘আমি নিজে জাতীয় দল আর বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলের হয়ে কোচ হিসেবে কাজ করেছি। সেখানে দেখেছি, খেলোয়াড় কালেকশন একটি বড় জিনিস। এবং তাদের কোথায় কোন জায়গায় খেলাতে হবে সেটাই সাফল্য নিয়ে আসে।

অনেকদিন থেকেই পাইপলাইনে খেলোয়াড় নেই। সিনিয়র খেলোয়াড়দের অনেক গ্যাপ হয়ে গেছে। তার জন্য নিচের দিকে এসেছি। ফুটবল এগিয়ে নেয়ার জন্য বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কাজ করতে হবে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে জোর দিয়েছি খেলোয়াড় বের করে আনার চেষ্টা করছি।’

‘আমাদের আন্ডার ১৮, ১৯, ১৬ দলগুলো ভালো করেছে। ১৬ দলটি কাতারকে হারিয়েছে। খেলোয়াড়রা ভালো করছে। এই টিমগুলোকে আবাসিক ক্যাম্পে রেখে প্রস্তুত করতে হবে। ট্রেনিং করাতে হবে। পরে বিদেশি দলের সঙ্গে খেলাতে হবে। আবার খেলবে আবার কোনও টুর্নামেন্ট খেলবে। সেখান থেকে খেলোয়াড়রা ভালো পর্যায়ে যাবে।’ যোগ করেন তিনি।

সরাসরি একাডেমি তৈরির কথা না বললেও ঘুরিয়ে বললেন, ‘একসময় একাডেমি হবে।’

তবে দেশের জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় ও মোহামেডানের স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলি মনে করেন, ক্লাব পর্যায়ের ফুটবল আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিশাল পার্থক্য। সেটি মানের। তিনি বলেন, ‘শুধুতো খেলোয়াড়ই না, ফ্যাসিলিটিসসহ আমাদের কোনো একাডেমি নাই, আমাদের পাইপলাইনে খেলোয়াড় খুব কম। বয়সভিত্তিক দলগুলো যখন ভাল করতেছে আমাদের একাডেমি থাকলে ভাল হতো। একাডেমিতে যখন তারা ট্রেনিং করবে তখন তারা ভালো ভিত্তি তৈরি করতে পারবে। একাডেমি হওয়াটা জরুরি। ক্লাবেরও অবশ্যই একাডেমি থাকা উচিত। আন্ডার ১৪-১৬ এই পর্যায়ে করলে ভাল হয়।’

সেজন্য ক্লাবের পাশাপাশি দেশের ফুটবলের অভিভাবক বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে) এগিয়ে আসতে হবে মনে করেন এই স্ট্রাইকার।

একাডেমি করে খেলোয়াড় তৈরির মাধ্যমে পাইপলাইন শক্তিশালী করতে হবে বলে মনে করেন জাতীয় দলের সাবেক কোচ  মারুফুল হক। তিনি সারাবাংলাকে জানান, ‘ভূটানেরও মতো দেশেও ক্লাব ও দেশের একাডেমি আছে। সেখানেই তাদের সবদিক তৈরি হয়। এটার কোন শর্টকার্ট উপায় নেই। সো কল্ড একাডেমি এই তৃণমূল খেলোয়াড় তৈরি করার কাজটা করে থাকে। যেটা আমাদের দেশে নেই। বাফুফের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। বরং ক্লাবগুলোকেও এই খেলোয়াড় তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে। ৯-১২ বছরের কিশোরদের সোনালী বয়ষ বলা হয়। এই সময়েই তাদের মধ্যে ফুটবল জ্ঞান, কৌশল শেখাতে হবে।’

বাফুফের গত নির্বাচনে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ফুটবল একাডেমির গড়ে তোলাসহ ২৫টি দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিলেন বাফুফে সভাপতি সালাউদ্দিনের প্যানেল। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করাতো দূরের কথা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রস্তুতিও নিতে পারেনি। সিলেটে একাডেমির কার্যক্রম শুরু করেও বন্ধ করতে হয়েছে। জেলা পর্যায়ে লীগ হচ্ছে অনিয়মিত।

এরপরে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কার্যকরণ নিয়ে তিনি এর আগে এক সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আমি যা যা বলেছিলাম, আপনারা যদি দেখেন প্রতিটি অপারেশনে আছে। এটা কিন্তু চার বছরর প্রোগ্রাম। এক বছর বা দুই বছরের নয়। যুব উন্নয়ন হচ্ছে।’
তবে একাডেমির প্রসঙ্গ এলেই তিনি অস্বীকার করেন। এক কথায় বলেন, ‘আমার ইশতেহারে একাডেমি ছিল না। এটা ফেডারেশনের কাজ নয়। জেলা সংগঠকদের কাজ।’

জুনিয়র পর্যায়ে বিষ্ময় দেখানো এই ফয়সালরা ফুটবল ভবিষ্যতের সূর্য দেখালেও দেশের ফুটবল অভিভাবকদের অবহেলা সেই স্বপ্নগুলোকে অস্তে পরিণত করছে। আশার ডালাগুলো জেগে উঠছে ঠিকই তবে সেগুলো বেড়ে তোলার দায়িত্বটা ঠিকভাবে করা হচ্ছে কি?

 

বিজ্ঞাপন
Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন