Ad

বিজ্ঞাপন

বিত্তহীন বাঙালির ভাষা

February 28, 2021 | 3:41 pm

ড. আজহার শাহিন

বাংলা যদি পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হতো, তবে কি বাঙালির জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসত কিংবা, টিকে যেত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি? সম্ভবত না। কারণ ভাষা-আন্দোলনের পেছনে কেবল ভাষার প্রসঙ্গটি মুখ্য হয়ে থাকেনি, এর ভেতর দিয়ে উন্মোচিত হয়ে যায় প্রাচীন দু’টি শ্রেণির অবস্থান। একটি অর্থবিত্ত-ক্ষমতার প্রাচীর দিয়ে তৈরি অভিজাত বিত্তবান শ্রেণি। বিশেষ ভাষা তাকে সাধারণের নিকট থেকে দূরবর্তী ও উচ্চবর্তী রাখে। অপর অংশে এদেশের সাধারণ মানুষ, দারিদ্র্য যার বুকে পাথরের মতো চেপে আছে হাজার বছর ধরে। নিম্নবিত্তের এই মানুষের কাছে বাংলা ভাষা আলো-জল-বায়ুর মতো প্রাণের ঘনিষ্ঠ। এই ভাষাকে আঁকড়ে ধরেই দারিদ্র্য থেকে মুক্তির লড়াই করে। কিন্তু তার সংগ্রাম শেষ হয় না। একবিংশ শতকে এসেও তাই ভাষাটি কেবল এই বিত্তহীন বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রাণের ভাষাই রয়ে যায়। ‘রাষ্ট্রভাষা’ হয়ে উঠতে পারেনি।

Ad

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার চক্রান্তের মূলে ছিল ঔপনিবেশিক সামন্তবাদী শ্রেণিচেতনা। এই জনবিচ্ছিন্ন বিত্তবান শ্রেণি বহন করে প্রাচীন জনবিচ্ছিন্নতার অগণতান্ত্রিক ঐতিহ্য। শাসকগোষ্ঠী যেমন ফারসিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়, একইভাবে বাণিজ্য করতে আসা সাদা জনগোত্রের ভাষা ইংরেজিও চেপে বসে এদেশের ওপর। একই পথ ধরে আসে সংখ্যায় নগণ্য পাকিস্তানি উপনিবেশবাদীরা উর্দু তাদের আভিজাত্যের ধারক। তবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন যে কেবল ভাষার ব্যাপার নয়, একটি প্রগতিবিরোধী, প্রতারক, মিথ্যা ও ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেণির সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের হীন চক্রান্ত, তা প্রকাশ হয়ে পড়ে কেবল উর্দু নয়, আরবিকেও রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টায়। আরবি, রোমান হরফে বাংলা চালুকরণের অপচেষ্টা, সাহিত্যকে ‘পৌত্তলিকতা’ মুক্ত ও ‘ইসলামি’করণের মতো বিভ্রান্তিকর ও পশ্চাৎমুখী অপতৎপরতার মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে দানা বেঁধে উঠলেও শেষপর্যন্ত এটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। প্রধানত, ১৯৪৮ থেকে চলা এই আন্দোলন পরিণতি লাভ করে ১৯৫২-তে। ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় ভয়-শঙ্কা-দ্বিধা কাটিয়ে জেগে ওঠে পূর্বপাকিস্তানের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত; এবং এই জাগরণের ঢেউ পৌঁছে যায় গ্রামে-গ্রামান্তরে। ভাষার দাবিতে রক্তদানের ঘটনা বাঙালির জীবনে একইসাথে শোকের ও গৌরবের, করুণ ও দ্রোহজাগানিয়া। শিল্প-সাহিত্য এই করুণ-দ্রোহের কাহিনীকে শিল্পমণ্ডিত করেছে। রাজনীতি এই জাগরণকে গ্রহণ করেছে। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার বিপরীতে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বিকাশে ভাষা-আন্দোলন পালন করেছে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বাঙালির জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া এই অভূতপূর্ব ঘটনার বহুমাত্রিক বিস্তার শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তবে বাংলা ফারসি-আরবি, ইংরেজি বা উর্দুর মতো অর্থ-ক্ষমতাবান শ্রেণির ভাষা হতে পারেনি।

বাংলাদেশে মর্যাদার দিক থেকে বাংলা ভাষার অবস্থান তৃতীয় সারিতে। আরবি ও ইংরেজি ধর্ম-অর্থ-ক্ষমতা ও আভিজাত্য চর্চার ভাষা হিসেবে খুবই সম্মানের সাথে বিরাজ করছে। উপর্যুক্ত দু’টি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণকারীর সংখ্যা কত, তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা না গেলেও বলা যায়, জনগোষ্ঠীর এক বিপুল অংশ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে দু’টি ভাষাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এদেশে। আরবি ধর্মচর্চা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিশেষ সম্মানের; ইংরেজিও শিক্ষা, অর্থ-ক্ষমতাবানের ভাষা হিসেবে অতি উঁচু অবস্থানে। এই ভূখণ্ডে বাংলার মর্যাদার জন্যই কেবল লড়াই করতে হয়। ফুল, কালো ব্যাজ, র‌্যালি ফিরে ফিরে আসে, কেবল ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’র মর্যাদা আসে না।

Ad

বিজ্ঞাপন

বাংলা মর্যাদার ভাষা কখনো ছিলও না। এ ভাষায় কোনো ‘পুণ্যশ্লোক’ রচিত হয়নি। একে রাজভাষা করার কথা কেউ ভাবেইনি। শাসক ও অভিজাত শ্রেণির নিকট বাংলা সবসময়ই ছিল অবহেলার পাত্র। ফারসি-আরবির আধিপত্যের যুগে, সতেরো শতকে কবি আবদুল হাকিম শোনালেন তীব্র ক্ষোভ আর ভালোবাসার কথা, ‘যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥/ দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।/ নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ ন যায় ॥/মাতাপিতামহক্রমে বঙ্গেত বসতি।/দেশী ভাষা উপদেশ মান হিত অতি ॥’ বাংলা ভাষা আর বাঙালি সত্তা কতটা আহত হলে কবির কণ্ঠ এমন তীব্র হতে পারে, অনুমান করা যায়। অষ্টাদশ শতকে ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি আসে আধিপত্যের নতুন পোশাক পরে। ছয়শ বছরের ফারসি আধিপত্য শেষে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি দখল করে নেয় রাষ্ট্র-রাজনীতি-রাষ্ট্রভাষা সব। বিংশ শতকে ক্ষমতাবান শ্রেণি নিয়ে আসে নতুন মর্যাদা সম্পন্ন ভাষা উর্দু। অর্থবিত্তহীনের ভাষা বাংলা অর্থ-ক্ষমতা-আভিজাত্য বলয়ের বাইরে ছিল সবসময়ই। এ ভাষা শোণিতের প্রবাহের মতো লুকিয়ে ছিল সাধারণ মানুষের বুকে, চর্যা-কীর্তন-পদাবলি গানের কথামালায়।

সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা বা প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। তার পর পেরিয়ে গেছে প্রায় দেড় হাজার বছর। এই সময়প্রবাহে ভাষা পাল্টে গেছে তার নিজস্ব নিয়মে। কেবল যোগাযোগের মাধ্যম না হয়ে, তা হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক প্রয়োজন আর জ্ঞানচর্চার বাহন। এর লিখিত রূপ বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে অনেকটা বিধিবদ্ধ অবস্থায় সুশৃঙ্খল রূপ নিয়েছে। চর্যাপদের ‘সন্ধ্যা’ ভাষার আলো-আঁধার পার হয়ে কিছুটা আলোকিত অবস্থায় আসে মধ্যযুগের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’ এবং আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে ভাষা নিশ্চয়ই লাভ করেছে যোগাযোগ, সাহিত্য আর জ্ঞানচর্চার জন্য যুগোপযোগী মানের। গত দুইশ বছরে বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশ খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার যোগ্য। বাঙালিরা ভাষাকে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তা অন্য কোনো ক্ষেত্রে ঘটেনি। তবুও বাংলা ভাষা মর্যাদার আসনে সমাসীন হতে পারেনি।

ভাষার মর্যাদার প্রশ্নটি শুধু স্বীকৃতির বিষয় নয়, রাষ্ট্রভাষা সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন তা জনগোষ্ঠীর সকল কাজে ব্যবহৃত হয়। দৈনন্দিন কাজ থেকে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল কর্মকাণ্ডের বাহন হয়ে ওঠে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার চর্চা হয় বা চর্চার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা চালুকরণের যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা হয়ে ওঠেনি। বরং প্রতিনিয়ত বাংলা চাপা পড়ে যাচ্ছে সেই পুরনো ইংরেজির আধিপত্যে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে উচ্চ আদালতে এখনো বাংলা চালু হয়নি। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র হয় ইংরেজিতে। সামাজিক অনুষ্ঠানাদির দাওয়াতপত্র অনেক স্থানে বাংলায় লেখা হয় না। আধুনিক সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বাংলার ব্যবহার কম। ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে এরকম সংবাদ কেউ শুনেছেন বলে জানা যায় না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব বিষয়ই আছে, কেবল বাংলা নেই। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজগুলোতে আর মেধাবীরা বাংলা পড়তে আসে না, কারণ ওতে অর্থ উপার্জনের সুযোগ কম। বাঙালির প্রবাহ অর্থ-উপার্জনের দিকে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর (২০১০: ২৭২) অভিমত, বাংলাদেশে এখন ধনীরা বাংলা ব্যবহার করে না, গরীবেরা ব্যবহার করতে পারে না, বাংলা আছে শুধু উপায়হীন মধ্যবিত্তের জীবনে, যে-মধ্যবিত্ত সর্বক্ষণ ধনী হবার স্বপ্ন দেখে, এবং ধনী হতে না পেরে গ্লানিতে ভোগে। বাংলা বুঝি ব্যর্থ মানুষের ভাষা। তিনি বাংলা ভাষা ও বাঙালির দুর্দশার কারণ পুঁজিবাদ বলে উল্লেখ করেন।

যদিও বাঙালির জন্য মধ্যবিত্তই স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল। গত শতকের মাঝামাঝিতে নতুন তৈরি হওয়া শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভাষাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণ ঘটায় তা বাঙালির জাতিসত্তাকে নাড়া দিয়ে যায়। দরিদ্র-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়, এবং সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি দেশও অর্জিত হয়। কিন্তু ভাষাকে কেন্দ্র করে যে জাগরণ ঘটে কয়েক দশকের মধ্যেই তাতে ভাটা পড়ে যায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশ-সমাজ-সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় অর্থবিত্তের দিকে। বিত্তবান হওয়ার স্বপ্ন যার চিন্তায় প্রবেশ করে তার দৃষ্টির অনেকগুলো এলাকা বন্ধ হয়ে যায়, এবং বিত্তবান হওয়ার পরে নিম্নবিত্তের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এই অর্থবিত্ত-ক্ষমতাবান শ্রেণিটি তার আভিজাত্য, অর্থ-ক্ষমতা নিশ্চিত রাখার জন্য ইংরেজিকে আঁকড়ে ধরে আছে। এই অভিজাত শ্রেণিচেতনার উৎস প্রাচীন। হুমায়ুন আজাদ (২০১৪: ২৪) একে বলছেন, ঔপনিবেশিক ঘোর। যা এখনো কাটেনি। সাদা সাহেবেরা চলে যাওয়ার সময় রেখে যান কয়েক লাখ কালো সাহেব। যারা প্রভুদের গুণগুলো আয়ত্ত করেননি, কিন্তু দোষগুলো যত্নের সঙ্গে অর্জন করেছিলেন।

প্রায় পাঁচ দশক আগে আবদুল হক (২০১২: ১৯৭) বলেছিলেন, ইংরেজের রাজত্ব শেষ হয়েছে অনেক আগে, ইংরেজির রাজত্বও শেষ হবে। তিনি আশা করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম স্তর অবধি শিক্ষণীয় যাবতীয় বিষয়ের যথেষ্টসংখ্যক বাংলা গ্রন্থ সুলভ হলেই সর্বস্তরে বাংলা-মাধ্যম চালু হবে। ‘সেদিন জ্ঞান ও মনীষার ঐশ্বর্যে, প্রকাশক্ষমতায় এবং জীবন ও চিন্তার জটিলতম অভিব্যক্তিতে আমাদের সাহিত্য একটা পরিণত সাহিত্য হয়ে উঠবে, অথবা হওয়ার পথে অনেকদূর অগ্রসর হবে।’ তার সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তার কথা সকলের নিকট বোধগম্য। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ নানা ভাষা শিখতে পারে, কিন্তু কোনো ভাষাই সে মাতৃভাষার মতো সম্পূর্ণরূপে শিখতে পারে না (রফিকুল ইসলাম ২০০০: ৩)। রবীন্দ্রনাথ বহুবার মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন: ‘জার্মানিতে ফ্রান্সে আমেরিকায় জাপানে যে সকল আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় জাগিয়া উঠিয়াছে তাদের মূল উদ্দেশ্য সমস্ত দেশের চিত্তকে মানুষ করা। দেশকে তারা সৃষ্টি করিয়া চলিতেছে। বীজ হইতে অঙ্কুর, অঙ্কুর হইতে বৃক্ষকে তারা মুক্তিদান করিতেছে। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে, চিত্তশক্তিকে উদ্ঘাটিত করিতেছে।...দেশের এই মনকে মানুষ করা কোনোমতেই পরের ভাষায় সম্ভবপর নহে’ (উদ্ধৃত: মুহম্মদ হাবিবুর ১৯৯৫: ৫৭)। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি ভয়ানক রূপে উপস্থিত। মুখস্থ করার বিপুল পরিশ্রমে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়। জ্ঞান অর্জন করার উপযোগী ভাষা শেখার আগেই অধিকাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়। অথচ, এর বিকল্প হতে পারত। নিজ ভাষায় তাকে শিক্ষা দিতে পারলে জেগে উঠত ‘মন’ ও মানুষ।

শিক্ষার সকল স্তরে এখনো বাংলা ভাষার ব্যবহার হয়নি বা বাংলা ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। এর দায় কি বাংলা ভাষার, না কি বাংলাভাষী মানুষের— এ প্রশ্ন করেছেন আহমদ ছফা (২০০২: ৬৫)। তিনি এর জন্য একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সে আন্দোলনের লক্ষ্য হবে সকল শোষিত এবং নির্যাতিত মানুষকে অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রদান করা, এবং অতীতের ঔপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত শ্রেণিবিভক্ত সমাজকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলা। ড. হুমায়ুন আজাদ (২০১৪ : ২৯) ইংরেজিকে বাংলাদেশে শ্রেণিস্বার্থের ভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একটি ছোটো কিন্তু শক্তিমান শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় নিযুক্ত ইংরেজি। বাংলাও একটি শ্রেণির স্বার্থের ভাষা; সে-শ্রেণি বড় কিন্তু প্রত্যক্ষ শক্তিহীন। ‘এ-শ্রেণি দুটি এখন সংঘর্ষের মুখোমুখি; এবং বড় শ্রেণিটির বিজয় অবধারিত, কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিরোধে তার জয় বিলম্বিত হচ্ছে।

তবে জয়টি দরকার, ভীষণভাবে দরকার। কেননা, জাতিসত্তার জাগরণে নিজ ভাষার বিকল্প কিছু হতে পারে না। বাংলা ভাষা ছাড়া বাঙালি জাতির ভবিষ্যত নেই, অস্তিত্বই নেই। শিক্ষার নামে, অর্থনীতির নামে, বিশ্বায়নের নামে ইংরেজিকে আঁকড়ে থেকে ভোগবাদী সমাজে মিথ্যে আভিজাত্যে টিকে থাকা যাবে, তবে তা বাঙালি জাতিসত্তার জন্য সম্মানের হবে না। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজ ভেঙে ফেলার স্বপ্ন এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ব্যাপক। তাই বাংলা রয়ে যায় সে বিত্তহীন মানুষের কাছেই। ভাষা নিয়ে আলাদাভাবে যাদের বিপুল অধিকাংশের কোনো চিন্তা নেই, ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি সম্বন্ধেও অনেকের ধারণা নেই।কেবল জীবনসংগ্রামই যাদের নিকট একমাত্র সত্য। বাংলা ভাষা এই বিত্তহীন মানুষের নিকট নিঃশ্বাসের মতোই নিজস্ব, প্রাণের কাছাকাছি—বাংলা ভাষা আর বাঙালিসত্তা একই সূত্রে গাঁথা।

ভাষা নিয়ে বিপুল এই জনগোষ্ঠীর বুকের অনুভূতি ধারণ করে আছে হুমায়ুন আজাদের (২০০৭: ৭৯) কবিতা : ‘আমাদের ঘিরে শাঁইশাঁই চাবুকের শব্দ, স্তরেস্তরে শেকলের ঝংকার।/ তুমি আর আমি সে-গোত্রের যারা চিরদিন উৎপীড়নের মধ্যে গান গায়/ হাহাকার রূপান্তরিত হয় সঙ্গীতে শোভায়।/...তোমার অ, আ চিৎকার সমস্ত আর্যশ্লোকের চেয়ে পবিত্র অজর।’

শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির ‘অ, আ চিৎকার’ বিশ শতকের মধ্যভাগে তৈরি করেছিল বাঙালির নবজাগরণ। ভাষার প্রশ্নে এই মধ্যবিত্ত বা স্বল্পবিত্তের পুনর্বার জেগে ওঠার জন্য কিছুটা সময় হয়ত লাগবে; তবে কতটা সময় নেয় সেটিই দেখার বিষয়।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক

সহায়ক গ্রন্থ :
আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক ২০১৭, ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
আবদুল হক ২০১২, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা।
আবুল হুসেন ১৯৯৭, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
আহমদ ছফা ২০০২, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
আহমদ রফিক ১৯৯৮, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
এ কে এম শাহনাওয়াজ ২০১৭, ভাষা আন্দোলন: পরিপ্রেক্ষিত ও ইতিহাস, প্রতীক, ঢাকা।
বদরুদ্দীন উমর ২০১৫, ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
বশীর আলহেলাল ২০১৬, ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ২০০৩ (সম্পাদিত), শিখা সমগ্র, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ২০১৪, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা, ভাষা আন্দোলনের ইতিকথা, (ড. মিজান রহমান সম্পাদিত), ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৯৫, মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
রফিকুল ইসলাম ২০০০, ভাষাতত্ত্ব, বুক ভিউ, ঢাকা।
রংগলাল সেন ২০০৯, বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিখা প্রকাশনী, ঢাকা।
সরদার ফজলুল করিম ২০১০, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ২০১০, নির্বাচিত প্রবন্ধ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
সৈয়দ মুজতবা আলী ২০১৫, পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা।
হুমায়ুন আজাদ ২০১৪, ভাষা-আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি,আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
২০০৮, কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
২০১৪, বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
২০০৭, শ্রেষ্ঠ কবিতা, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

Ad

বিজ্ঞাপন

Tags:

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad