Ad

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে ’গ্রিন বিল্ডিং’ আন্দোলন

March 11, 2021 | 7:21 pm

অনন্ত আহমেদ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুবই চমৎকার। এই প্রবৃদ্ধি বাড়াতে আমাদের উৎপাদন ও নির্মাণ শিল্প দ্রুত বাড়ছে। একইসঙ্গে, দেশটি ব্যাপক শক্তি বা এনার্জি খাদক বা অপচয়কারী হয়ে উঠেছে। এখানে মাথাপিছু শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এই অঞ্চলটিতে সবচেয়ে কম। বাংলাদেশের জলসম্পদও ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার আমাদের জন্য দিনকে দিন চ্যালেঞ্জিং বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।

Ad

বিজ্ঞাপন

প্রাকৃতিক সম্পদের অব্যবস্থাপনা এবং সঠিক পরিবেশগত জ্ঞানের অভাব—এ দু’টি বিষয় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াটিকে সমস্যাসঙ্কুল করে তুলছে। এর ফলে টেকসই উন্নয়নের পরিবর্তে অস্থায়ী উন্নতি ঘটছে। যার জন্য প্রতিনিয়ত ঘটছে জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিক্ষয়, সব প্রকার দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি সাধন। এটাকে জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় টেকসই দিকগুলোর অপ্রতুলতা হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

এটা স্পষ্ট যে টেকসই উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য আবশ্যক। গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ, জ্বালানি সক্ষমতা এবং নবায়নযোগ্য শক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা এখন সমস্যাটি বুঝতে পেরেছি, তবে এর সমাধান কী? সমাধানটি হলো আমাদের জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে সবুজ এবং স্থায়িত্ব অনুশীলন করা। একই সঙ্গে, আমাদের সমস্ত উন্নয়ন ‘টেকসই উন্নয়ন’ এবং সমস্ত স্থাপনা ‘টেকসই স্থাপনা’ হওয়া উচিত।

Ad

বিজ্ঞাপন

আমরা আমাদের ৯০ ভাগ সময় ঘরেই ব্যয় করি। অর্থাৎ, আমাদের আবাসন, অফিস, শিল্প-কারখানা, দোকান, হাসপাতাল, শিক্ষা ও বিনোদন সুবিধাসমূহ ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে, এই গৃহ বা বিল্ডিংগুলোই কার্বন নিঃসরণের এক নম্বর উৎস (৩৯ থেকে ৪০ শতাংশ) যা বিশ্ব উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। সুতরাং, যদি আমরা বিশ্ব উষ্ণায়নের মোকাবিলা করতে চাই তবে এর এক নম্বর কারণটির দিকে মনোনিবেশ করতে পারি, আর তা হচ্ছে গৃহ বা বিল্ডিং। একই সময়ে, আমরা পরিবহন এবং শিল্পগুলোকেও বিবেচনা করবো। বিশ্ব উষ্ণায়নের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ভাবনা থেকে ’গ্রিন বিল্ডিং কনসেপ্ট’ জন্ম নিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে গ্রিন বিল্ডিং-এর অনেক রকম সংজ্ঞা রয়েছে তবে মূল ধারণাটি একই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা (ইপিএ) এর মতে, গ্রিন বা টেকসই বিল্ডিং হলো এক ধরণের চর্চা যা নির্মাণ, সংস্কার, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ধ্বংসের স্বাস্থ্যকর এবং আরও বেশি দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে।

ভবনগুলোর সবুজ বা স্থায়িত্বের লেভেল পরিমাপ করতে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন রেটিং সিস্টেম তৈরি করেছে। বিল্ডিং রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্ট এনভায়রনমেন্ট অ্যাসেসমেন্ট মেথডোলজি (বিআরইইএএম) হলো বিশ্বের প্রথম গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম। বিশ্বজুড়ে আরও অনেকগুলো গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম এখন চালু আছে। সেগুলোর মধ্যে লিডারশিপ ইন এনার্জি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (এলইইডি) হলো সবচেয়ে জনপ্রিয়।

দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ’গ্রিন বিল্ডিং’ (গ্রিন বিল্ডিং অথরিটি কর্তৃক অনুমোদিত একটি বিল্ডিং) আন্দোলনটি এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশি কোম্পানি ও সংস্থাগুলো বেশিরভাগ গ্রিন বিল্ডিং প্রশংসাপত্রের জন্য ইউএসজিবিসি (এলইডি) রেটিং সিস্টেম পছন্দ করে। আমাদের বেশিরভাগ এলইডি সার্টিফাইড প্রকল্পগুলো তৈরি পোশাক শিল্প খাতে রয়েছে (টেক্সটাইল এবং আনুষাঙ্গিকগুলো সহ) এবং আমাদের বিশ্বের সেরা ৭টি (শীর্ষ ১০টির মধ্যে) কারখানা রয়েছে। আমাদের এলইডি সার্টিফাইড বাণিজ্যিক ভবন, বাণিজ্যিক অফিস ইন্টরিয়র, আবাসিক বিল্ডিং ইত্যাদি রয়েছে। এলইডি প্রত্যয়নপত্রের জন্য আমাদের ৩৯১টি বিভিন্ন ধরণের প্রকল্প ইউএসজিবিসিতে নিবন্ধিত রয়েছে।

গ্রিন বিল্ডিং ধারণাটি ভিত্তি করে ট্রিপল বটম লাইন সুবিধার উপর। ট্রিপল বটম লাইনের ভাবনা জোর দেয় কোনো সংস্থার উচিত পরিবেশগত পরিচালনা ও সামাজিক ন্যায়বিচার পরিমাপকারীদের সঙ্গে আর্থিক সাফল্যের মানদণ্ডকে সংযুক্ত করা। মানুষ (People), গ্রহ (Planet) এবং লাভ (Profit)- এটি কখনও কখনও থ্রি পি (3P) পদ্ধতি নামেও পরিচিত। প্রতিটি ক্ষেত্রে এর জন্য তিনটি মাত্রায় চিন্তা করা দরকার, একটি নয়।

তবে গ্রিন বিল্ডিং অপরিহার্য, কারণ আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। আমরা চাই বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে প্রত্যেকের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ মজুদ থাকুক। গ্রিন বিল্ডিং প্রথমে একটি জটিল এবং বড় বিনিয়োগের মতো মনে হতে পারে। তবে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘসময়ের মধ্যে এর দুর্দান্ত সুফল পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এর প্রচুর সুবিধা রয়েছে, যা বিল্ডিং-এর জীবনচক্র জুড়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা পেয়ে থাকেন।

এই ধারণাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করবে যা কোনো কোম্পানির বা সংস্থার লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে। এগুলো হলো:

দক্ষ এনার্জি সুবিধা এবং এর কার্যকলাপ আর্থিকভাবে লাভজনক হয়। উৎপাদন সুবিধার জন্য, এই ধারণাটি উৎপাদন ব্যয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে এবং প্রতিষ্ঠানকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।

  • প্রতিষ্ঠানের সর্বোত্তম অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ বেশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং কর্মীদের অনুপস্থিতি কমায়।
  • সেরা রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট পরিবেশের সঞ্চয় বৃদ্ধি করে এবং এর ওপর কম প্রভাব বিস্তার করে।
  • দক্ষ এবং অনুপ্রাণিত কর্মী উচ্চতর মানসম্মত কাজের জন্য নিযুক্ত করা যাবে।
  • গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বব্যাপী খ্যাতি বৃদ্ধি পাবে।
  • পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সবুজ শান্তিপূর্ণ জায়গা তৈরির সেরা অনুশীলন এটি।
  • গ্রিন বিল্ডিং ধারণা স্থাপনা ব্যয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।

সর্বোপরি বলা যায়, গ্রিন বিল্ডিং ধারণাটি কেবল একটি সার্টিফিকেট নয়। বরং, এটি সর্বাধিক লাভজনক এবং পরিবেশ বান্ধব ব্যবসায়ের পরিচালন ব্যবস্থা। যার জন্য কোম্পানির এবং প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ক্ষেত্রে ক্রমাগত উন্নতির ভাবনা প্রয়োজন।

লেখক: আন্তর্জাতিক গ্রিন বিল্ডিং বিশেষজ্ঞ
ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের ফ্যাকাল্টি সদস্য

সারাবাংলা/আইই/এমও

Ad

বিজ্ঞাপন

Tags:

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad