Ad

বিজ্ঞাপন

৫৭ নমুনার ৪৬টিতেই দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট: আইসিডিডিআর,বি

April 8, 2021 | 12:58 am

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের হার টানা কয়েকদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর’বি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার করোনা ভ্যারিয়েন্টের {B.1.351 variant (20H/501Y.V2)} প্রভাব বেশি পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকায় করোনাভাইরাসের সব ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় প্রাধান্য বিস্তার করছে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টটি। আর মার্চের চতুর্থ সপ্তাহে প্রায় ৮১ শতাংশ ক্ষেত্রেই দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

Ad

বিজ্ঞাপন

এর আগে, ৫ এপ্রিল সারাবাংলায় ‘দেশে দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, দেশে দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্ট। এই ভ্যারিয়েন্টগুলো এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ বাড়িয়ে চলেছে। দেশে শুধু মার্চেই পাওয়া গেছে এই ভ্যারিয়েন্টগুলোর অধিকাংশ। মার্চে এসব ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের প্রাধান্যের কথা উঠে এসেছে আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণাতেও।

গবেষণা ফলাফলে জানানো হয়, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি প্রথম দেশে যুক্তরাজ্যের করোনা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে জিআইএসএইড (গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটা) ডাটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকেই এই ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়েছে।

Ad

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা যায়, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের এই ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে বেড়েছে, যার সর্বোচ্চ পজিটিভিটি হার পাওয়া গেছে ৫২ শতাংশ। করোনার বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি বিশ্লেষণে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যরিয়েন্টের উপস্থিতিতে। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার এই করোনা ভ্যারিয়েন্টটির প্রাদুর্ভাব অন্য সব ভ্যারিয়েন্টকে ছাপিয়ে যায়। মার্চের শেষ সপ্তাহের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবগুলো ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টই ছিল ৮১ শতাংশ।

আইসিডিডিয়ারবি’র পক্ষ থেকে জানো হয়, এই তথ্য-উপাত্ত থেকে এটি স্পষ্ট যে করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টগুলোর উপস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে হবে, যা এই ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আইসিডিডিআরবি’র গবেষণা ফলে উঠে এসেছে— দেশে ১ জানুয়ারি থেকে ৭ জানুয়ারি সময়সীমায় যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি দেখা গেছে একটি নমুনা সিকোয়েন্সিং করে। পরে ১৫ থেকে ২১ জানুয়ারি সময়সীমায় যুক্তরাজ্যের এই ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি দেখা যায় ‍দুইটি নমুনায়। এছাড়া ২২ থেকে ২৮ জানুয়ারি দুইটি এবং ২৯ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সিকোয়েন্সিং করে ছয়টি নমুনায় যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

আইসিডিডিআর,বি’র তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমায় তিনটি ও ১২ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমায় দুইটি নমুনায় যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ১৯ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনটি ও ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমায় সিকোয়েন্সিং করে সাতটি নমুনায় যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৫ মার্চ থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে সিকোয়েন্সিং করে ৯টি নমুনায় যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই সপ্তাহে ১৭টি নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি। মূলত এর পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

গবেষণার তথ্য বলছে, ১২ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমায় সিকোয়েন্সিং করে ১২টি নমুনায় যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও এ সময় ৬৪ নমুনায় পাওয়া গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি। এই সপ্তাহে ৯৯টি নমুনা সিকোয়েন্সিং করে ২৩ টি অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেলেও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টই বেশি পাওয়া যায়। মার্চের শেষ সপ্তাহে (১৮ থেকে ২৪ মার্চ) ৫৭টি নমুনা বিশ্লেষণ করে ৪৬টি নমুনাতেই দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা মোট নমুনার ৮১ শতাংশ।

আইসিডিডিআরবি’র গবেষকরা জানান, মার্চের প্রথম সপ্তাহে ১৩ জেলা থেকে সংগ্রহ করা নমুনা সিকোয়েন্সিং করা হয়। এ সময়ে কোনো দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট দেখা যায়নি। এরপর থেকেই মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে।

এই গবেষণায় জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণকারী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন আইসিডিডিআর,বি’র বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের সংগ্রহ করা নমুনাগুলোর মাঝে অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। আমরা যে গবেষণা করেছি তাতে দেখা গেছে— মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের আধিক্য ছিল। পরে তৃতীয় সপ্তাহে যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের পরিবর্তে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ বেশি হয়েছে।

ড. মুস্তাফিজুর জানান, ২৪ মার্চের পরে সংগ্রহ করা নমুনাগুলোর জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণের কাজ চলছে। দ্রুতই সেসব নমুনার সিকোয়েন্সিং প্রকাশ করা সম্ভব বলে বলে আশাবাদ জানান তিনি।

ড. মুস্তাফিজুর বলেন, আমাদের এখানে বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে অনেকের মধ্যে ভয় কাজ করছে। প্রকৃতপক্ষে বেশিরভাগ ভাইরাস, বিশেষ করে এম-আরএনএ ভাইরাস নিজেকে টিকিয়ে রাখতে অনেক বেশি মিউটেশন করে। এটা প্রাকৃতিকভাবেই হয়ে থাকে। আর যুক্তরাজ্য বা দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট আসলে এখন অনেক বেশিই পাওয়া যাবে, কারণ এগুলো দ্রুত ছড়াতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার এখন হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে কথা বলছি, পরে দেখা যাবে নতুন আরেক ভ্যারিয়েন্ট আসবে।

ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের আহ্বান জানান ড. মুস্তাফিজ। তিনি বলেন, নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কিভাবে বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বরং আমাদের সবাইকে বেশি বেশি ভাবতে হবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ নিয়ে। নতুন যে ভ্যারিয়েন্টই আসুক, তার বিরুদ্ধে বাঁচার উপায় একটাই— মাস্ক পরে থাকতে হবে, হাত ধোয়ার অভ্যাস চালু রাখতে হবে, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে।

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad