Ad

বিজ্ঞাপন

দেশে সাউথ আফ্রিকা ভ্যারিয়েন্ট ৮৭.৫ ভাগ

April 15, 2021 | 3:12 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) জিনোম সিকোয়েন্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে ৮৭ দশমিক ৫ ভাগ দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট {B.1.351 variant (20H/501Y.V2) পাওয়া গেছে। নমুনাগুলো চলতি এপ্রিলে ঢাকা থেকে সংগ্রহ করা। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এসব নমুনার সিকোয়েন্সিং করেছে। তবে জিনোম সিকুয়েন্সের এই তথ্য এখনো সম্পূর্ণভাবে জিআইএসএইডে আপলোড করা হয়নি।

Ad

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) সারাবাংলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। ল্যাব সূত্রে জানা যায়, এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত ৪৮টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২টিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

Ad

বিজ্ঞাপন

দেশে কোভিড-১৯ বিষয়ক জনস্বাস্থ্য কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘নতুন স্ট্রেইন আসবে— এটাই স্বাভাবিক। সব তো খোলা। তবে ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যাওয়ায় সংক্রমণ বাড়ছে, তা এখনই বলা যাবে না। ট্রান্সমিশন তো আমরা কখনো আটকাতে পারিনি। সংক্রমণ চলমানই ছিল।’

যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনে চার হাজারেরও বেশি মিউটেশন হয়েছে। যেহেতু এটি আরএনএ ভাইরাস, তাই এটি বিভিন্ন ধরনের মিউটেশনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত রূপ পরিবর্তন করে। সব মিউটেশন যে খারাপ, তা কিন্তু না। তবে এখন পর্যন্ত এর তিনটি ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্ট, যেটা কেন্ট ভ্যারিয়েন্ট নামে পরিচিত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্ট।’

তিনি বলেন, ‘এই ভ্যারিয়েন্টগুলো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষিত। তারপর ডেমোগ্রাফিক ডাটাতেও দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে কীভাবে সংক্রমণ বিস্তার করছে ও ফ্যাটালিটির কারণ হচ্ছে। অর্থাৎ কতজন মানুষ মারা যাচ্ছে ও কতজনের ক্ষেত্রে মারাত্মক আকার ধারণ করছে— এসব নিয়ে গবেষণা চলছে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে এই ভ্যারিয়েন্টকে সেকেন্ড ওয়েভের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় যে বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে তা হলো— এটি অনেক বেশি দ্রুত ছড়ায়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সংক্রমণের প্রায় ৯০ শতাংশই এই ভ্যারিয়েন্ট।’

ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে এই গবেষক বলেন, ‘সেখানে হঠাৎ করে যে সংক্রমণ বাড়ল এবং অনেক মানুষের মৃত্যু হলো, এর পেছনে অন্যতম কারণ এই পি.১ ভ্যারিয়েন্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টটা অবশ্য একটু ভিন্ন। এটি খুব বেশি বিস্তার লাভ না করলেও এই ভ্যারিয়েন্টে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। অক্সফোর্ডের কোভিশিল্ড এই ভ্যারিয়েন্টের ওপর তেমন কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না। ফাইজার ও মডার্না অবশ্য বলছে, তাদের ভ্যাকসিন এই ভ্যারিয়েন্টের ওপর আংশিকভাবে কার্যকর, তবে তা নিয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।’

ড. মেহেদী আকরাম বলেন, ‘দুঃখজনক বিষয় হলো এই ভ্যারিয়েন্টগুলো বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছে। এই ভ্যারিয়েন্টগুলো কমিউনিটিতে কী পরিমাণ ছড়িয়েছে, তা জানাটা খুবই জরুরি। কমিউনিটিতে যদি মিউটেশন সার্ভেইল্যান্স না হয়, তবে সেটি জানা যাবে না। বর্তমানে যেভাবে দেশে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে তাতে অনুমান করা যায় যে, যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টও ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভ্যারিয়েন্টের সব খারাপ দিকগুলোই কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে দেখা গেছে, এই ভ্যারিয়েন্টে যারা সিভিয়ার কোভিডে আক্রান্ত হয়, অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তদের তুলনায় তাদের মৃত্যুর হার ৬১ শতাংশ বেশি। প্রায় ১১৪টি দেশে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার যে ভ্যারিয়েন্ট, সেটি একটু ভিন্ন। এক্ষেত্রে বিস্তার অতটা না হলেও এটি যদি একবার প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা দেখা দেবে।’

কীভাবে এই ভ্যারিয়েন্ট বিস্তারের তথ্য জানা যাবে?— জানতে চাইলে ড. মেহেদী আকরাম সার্ভেইল্যান্সের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশে থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর দিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন, যা দিয়ে কমিউনিটি সার্ভেইল্যান্স খুবই সহজ ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। এভাবে কিন্তু যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে সার্ভেইল্যান্স করা হয়েছে। এই থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর কিট যুক্তরাজ্য ভ্যারিয়েন্ট ডিটেক্ট করতে পারে। এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশেরও কমিউনিটি সার্ভেইল্যান্স করা প্রয়োজন, যেটি সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে বড় পরিসরে কখনোই সম্ভব নয়।’

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক ডা. শাহরিয়ার রোজেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস একটি m-RNA ভাইরাস। আরে মিউটেশনও স্বাভাবিক। এসব মিউটেশনের অধিকাংশই উদ্বেগের কারণ না হলেও যখন স্পাইক প্রোটিনে মিউটেশন হয় এবং ভাইরাসের চরিত্রগত পরিবর্তন হয়, তখন সেটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। করোনাভাইরাসের এমন বিপদজনক ধরন বা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্ক এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। এগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্টগুলোই সবচেয়ে মারাত্মক, যেগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি।’

তিনি বলেন, ‘ইউরোপজুড়ে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা এই যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের। হঠাৎ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি, কম বয়স্কদের মাঝে আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়া, গুরুতর রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া— এগুলো এই ভ্যারিয়েন্টের কারণে হতে পারে। বাংলাদেশেও এরকম ঘটনাগুলোর উপস্থিতি আমাদের শঙ্কিত করে তোলে। এসব ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে মানুষজনের অনীহা— দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করি। এর মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের নতুন ধরনটির বিরুদ্ধে কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনটি কার্যকর। কাজেই সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

ডা. রোজেন আরও বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়ান্টটি অত্যন্ত বিপদজনক। কারণ সম্প্রতি একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল থেকে জানা গেছে যে, এর বিপক্ষে কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন তেমন কার্যকর নয়। ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্টের বিপক্ষে ভ্যাকসিন কার্যকর হলেও এটি নিয়েও অনেক সংশয় রয়েছে। ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্টটি আগে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত করতে পারে। এই ভ্যারিয়েন্টগুলোর সবগুলোই কিন্তু অনেক দেশেই ছড়িয়ে গেছে। তাই বিদেশ থেকে যাত্রীদের আসার বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে। যেসব দেশে এই ভ্যারিয়েন্টগুলোর উপস্থিতি আছে, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। তা না করতে পারলেও যারা আসবেন, তাদের কঠোরভাবে কোয়ারেনটাইন করানো অত্যন্ত জরুরি।’

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad