Ad

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফলাফল: একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

May 2, 2021 | 10:27 pm

আমিনুল হক পলাশ

সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী এই মুহূর্তে (রোববার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা) তৃণমূল এগিয়ে আছে ২০৬টি আসনে। অন্যদিকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি এগিয়ে আছে ৭৬টি আসনে। ধুয়ে মুছে গিয়েছে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট। বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয় যেমনটি বলেছেন—এই জয় মমতার। আসলেই এই জয়ের একক কৃতিত্ব মমতার। অসাধারণ কারিশমায় পুরো দলকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করেছেন হুইলচেয়ারে বসেই। এ এক অনবদ্য রাজনৈতিক বিজয়ের আলেখ্য।

Ad

বিজ্ঞাপন

মমতাকে হারাতে কী করেনি বিজেপি? নির্বাচনের আগে শুভেন্দু অধিকারী, রাজিব ব্যনার্জীর মতো হেভিওয়েট তৃণমূল প্রার্থীদের দলছুট করেছে। সর্বশক্তি দিয়ে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গোটা দেশের বিজেপি নেতৃত্বকে নিয়ে। অমিত শাহ তো রীতিমতো পশ্চিমবঙ্গের ডেইলি প্যাসেঞ্জার বনে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও করেছেন গোটা দশেক নির্বাচনী জনসভা। প্রচারের এসেছিলেন যোগী আদিত্যনাথসহ অন্যান্য প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও হেভিওয়েট বিজেপি নেতৃবৃন্দ। ইডি, সিবিআই, কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র ৩টি আসন পাওয়া বিজেপির জন্য এবারের নির্বাচনে ৮০টি আসন পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় উন্নতি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যেভাবে এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন তাতে বলা যায় বিজেপির করুণ পরাজয়ই হয়েছে।

আমার মতে, তৃণমূলের এই জয়ে অন্যতম কি-ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে মমতার নন্দীগ্রামে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত। বলা যায় দল ও পরামর্শকদের মতামত উপেক্ষা করে অনেকটা এককভাবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মমতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তকে আবেগীয় কিংবা জেদের বশে নেওয়া বললেও আমার মতে এটাই ছিল মমতার মাস্টারস্ট্রোক। বিজেপি যখন তৃণমূলত্যাগী শুভেন্দু অধিকারীকে প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার করেছিল, তখন অধিকারী গড় হিসেবে পরিচিত শুভেন্দুর খাস তালুকে দাঁড়িয়ে শুভেন্দুকে চ্যালেঞ্জ জানানো নিঃসন্দেহে তৃণমূলকে উজ্জীবিত করেছে। নিজে হারার ঝুঁকি নিয়েও তাই মমতা আসলে নিজ দলকেই জিতিয়ে এনেছেন। অন্যদিকে বিজেপি লোকসভা সাংসদ, এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকেও নির্বাচনে নামিয়ে দিয়ে আদতে প্রমাণ করেছিল তর্জন গর্জন যতোই করুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে তাদের পায়ের নিচের জমিন শক্ত না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় ও সাংসদ লকেট চ্যাটার্জি দুজনই পরাজিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। পরাজয়ের পাশাপাশি নিদারুণ লজ্জাও উপহার পেল বিজেপি।

Ad

বিজ্ঞাপন

আমার অনুমান ছিল তৃণমূল ১৮৫টির মতো আসন জিতবে, বিজেপি জিতবে ৯৫ টির মতো আসন, বাকিগুলো জোটের ভাগ্যে। কিন্তু কংগ্রেস, বাম ও আইএসএফ জোট খাতা খোলতেই হিমশিম খাবে এমনটা বোধ করি খুব বেশি কেউ আঁচ করেনি। কংগ্রেস তার সর্বভারতীয় রূপ বেশ আগেই হারিয়েছে। বাম ধুঁকছিল তারও আগে থেকে। কিন্তু এবারের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এক ঝাঁক তরুণ বাম নেতার হাত ধরে কিছুটা উন্নতির স্বপ্নও দেখেছিল অনেকে। শতরূপ ঘোষ, মীনাক্ষী সেন, দীপ্সিতা ধর, ঐশী ঘোষের মতো তরুণ তুর্কীরা রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা টেলিভিশন টকশোতে সমানতালে টেক্কা দিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের। কিন্তু ভোটের মাঠে তার প্রতিফলন কই? বাম রাজনীতিবিদদের এই বেলা এই আত্ম উপলব্ধি জরুরি—কেন তারা সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন? ফুরফুরা পীর সাহেবের ছেলে আব্বাস সিদ্দিকীকে জোট সঙ্গী করে একদিনের জন্য ব্রিগেডের মাঠ ভরানো গেলেও তাতে যে ব্যালট বক্স ভরে না, এই বোধ তাদের কেন আসলো না?

এই নির্বাচনে কয়েকটি চরিত্র সম্পর্কে কথা না বললেই নয়। প্রথমেই আসবে প্রশান্ত কিশোরের নাম। ২০১৯ সালে তৃণমূলের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার পর একের পর এক নিত্যনতুন পরিকল্পনা করে যেভাবে মমতাকে বিজয়ী করতে সহায়তা করলেন তা অনবদ্য। এ যেন মুম্বাইয়ের ফাইনালে মহেন্দ্র সিং এর সেই অনবদ্য ইনিংসের মতো। এরপর আসবে দেবাংশু ভট্টাচার্য। একটা রাজনীতি বিমুখ সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠে, কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে যেভাবে তৃণমূলের প্রচারের অন্যতম মুখে পরিণত হয়েছেন তা সত্যিই অসাধারণ। এই নির্বাচনে তৃণমূলের সিগনেচার টোন ‘খেলা হবে’ এর স্রষ্টাও তিনি। ভাঙ্গনের মুখে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা যখন কিছুটা বিভ্রান্ত তখন এই শ্লোগান নিঃসন্দেহে টনিকের মতো কাজ করেছে। টিভি টকশো, রাজনৈতিক বিতর্ক, নির্বাচনী জনসভা সব জায়গাতেই ছিল তার সদর্প বিচরণ। অভিষেক বন্ধোপাধ্যায়ের কথাও না বললেই নয়। তৃণমূল ভাঙার অন্যতম কারণ বলা হয় দলে ভাইপো অভিষেকের একক নিয়ন্ত্রণ, তোলাবাজিসহ নানান অভিযোগ। তবে অভিষেকের কিছু টকশো ও বক্তব্য শুনে এটা অন্তত বলা যায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় সে কোনো অংশেই দলছুট নেতাদের থেকে পিছিয়ে নেই। তরুণ নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এভাবে চলতে থাকলে শুধু ভাইপো হিসেবে নয়, একদিন নিজ পরিচয়েই পরিচিত হবে অভিষেক। সর্বশেষ বলতে চাই—আইএসএফের আব্বাস সিদ্দিকীর কথা। তার দলের লক্ষ্য উদ্দেশ্য যদিও এখনো পরিষ্কার নয়, তবে তার বক্তব্যও চমৎকার। রাজনীতির মাঠে লম্বা রেসের ঘোড়া হওয়ার উপাদান আছে তার মজ্জায়।

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি আরও চারটি প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ হচ্ছে আজ। এক আসাম ছাড়া আর কোথাও বিজেপি সুবিধা করতে পারেনি। কেরালা, তামিলনাড়ু, পুদেচেরিতে বিজেপি বিরোধী জোটের জয়জয়কার। এর মাঝে এই টানা দ্বিতীয়বারের কেরলে বামপন্থীদের জয়ই এই উপমহাদেশে ভোটের রাজনীতিতে বামপন্থীদের শেষ নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। সাম্প্রতিক সময়ের কৃষক আন্দোলন, কোভিডের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি, বিধানসভা নির্বাচনী ফলাফল সব মিলিয়ে খুব একটা ভালো নেই মোদী-অমিত শাহ জুটি। পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রতিটি বিধানসভা নির্বাচনেই তাদের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

এবার আসা যাক আমাদের দেশে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে প্রভাব নিয়ে। মোটা দাগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ দু’টো। এক, তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা ও দুই, জামাত পোষণ। প্রথমটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত এবং দ্বিতীয়টা তর্কসাপেক্ষ। তবে আমার অভিমত হলো— তিস্তার পানি চুক্তিকে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার এবং মমতার তৃণমূল দুই গোষ্ঠীই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেব ব্যবহার করে আসছে। লোক সভা ও রাজ্যসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা যে বিজেপি সরকার সকল বিরোধী দলের মতামতের তোয়াক্কা না করে ৩৭০ ধারা রদ করে কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা তুলে নিতে পারে, বিশেষ আইন করে দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করতে পারে তারা আরও আন্তরিক ভাবে তিস্তা চুক্তিটি করতে পারতো বলেই আমার বিশ্বাস। মমতা যে ভোটের রাজনীতির কারণে তিস্তার বিরোধিতা করে আসছে তা তো দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। তবে বিজেপি আসলেই তিস্তা চুক্তি হয়ে যেত এমনটা আমি মনে করি না। বরং ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, এনআরসিকে যেভাবে বিজেপি ভোটের হাতিয়ার করেছে তাতে পশ্চিমবঙ্গে মমতার জয় আপাতভাবে স্বস্তিদায়ক বলেই মনে করি। আমি চাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বোধোদয় হোক, তিনি তিস্তা চুক্তির বিষয়ে মানবিক হন।

পশ্চিমবঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে যদি দিল্লীকে উনি পাখির চোখ করেন তাহলে উনার নিজের স্বার্থেই প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন জরুরি। দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস পর হুইলচেয়ার ছেড়ে পায়ে হেঁটে মমতা আজ নবান্নে গিয়েছেন। তার এই অগ্রযাত্রা দিল্লীর মসনদে গিয়ে শেষ হলেও অবাক হব না। প্রশান্ত কিশোরও বলেছেন তিনি আর সরাসরি নির্বাচনী পরামর্শ দাতা হিসেবে কাজ করবেন না। এই কাজ তিনি তার আইপ্যাক টিমের হাতে ছেড়ে দিবেন। তিনি নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে চান। মমতা ও প্রশান্তের যুগলবন্দীই নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করবে ভারতে? উত্তরটা সময়ের হাতে তোলার রইলো। তবে মোদীবিরোধী মুখ হিসেবে মমতার পক্ষে বাজি ধরার লোকের এখন অভাব হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। আমিও সেই দলেই আছি।

সারাবাংলা/আইই

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad