Ad

বিজ্ঞাপন

রাজনীতির হেফাজত, যেখান থেকে পচন শুরু

May 3, 2021 | 1:58 pm

আশরাফুল আলম খোকন

২০১৩ সালের ৫মে’র আগেও হেফাজত ছিল। হয়তো রাজনীতির অন্দর মহলের হিসাবনিকাশে ছিল। রাজনীতির মাঠে তাদের প্রকাশ্য পদচারণ ছিল না। তাদের সবাই কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হিসেবেই জানত। ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরের আশপাশ এলাকায় দিনব্যাপী সহিংসতা দিয়েই তারা আলোচনায় আসে। তখনও আগের ধর্মীয় ইমেজের কারণে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের দুর্বলতা ছিল।

Ad

বিজ্ঞাপন

তারা কিভাবে মসজিদ মাদ্রাসার আঙ্গিনা ছেড়ে সহিংসতা নিয়ে রাজপথে আসল এবং নিজেদের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ল— এটা নিয়ে আমার কোনো গবেষণা নেই। ঘটনা প্রবাহ যতটুকু মনে পড়ে সেটাই বলব। আজকে কেন তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ওই দুর্বলতাটুকু যে নাই এর জন্য হেফাজত নেতৃত্বই দায়ী। এর বিন্দুমাত্র দায় অন্যকারও নয়।

দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তখন উত্তাল শাহবাগ। সারা দেশের সাধারণ মানুষ,পেশাজীবী, মিডিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শুধু যুদ্ধাপরাধী ও বিএনপি-জামাতের মুখপাত্র দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক সংগ্রাম, দিগন্ত টেলিভিশনসহ কিছু মিডিয়ার অবস্থান ছিল শুরু থেকেই শাহবাগের বিপক্ষে। তারা শুরু থেকেই শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে আসছিল। গণজাগরণের অবস্থান কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পরই তারা মিডিয়াতে এসে বলতে থাকে— শাহবাগে সব নাস্তিকদের সম্মিলন হয়েছে। এই নাস্তিকরা জাতিকে ধর্মহীণ করতে চায়।
আমার দেশ পত্রিকাতে শাহবাগের নেতৃত্বদানকারী কিছু তরুণকে নাস্তিক উপাধি দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যা সাংবাদিকতার কোনো নীতি নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। ওই সময় চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে গিয়ে হেফাজত নেতৃত্বের সাথেও বৈঠক করেন আমার দেশের তৎকালীন সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। যে বৈঠকের ছবিগুলো পরে প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমা কিছু দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বৈঠকের ছবিও পরে প্রকাশিত হয়েছে। বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগের অভিযোগও আছে।

Ad

বিজ্ঞাপন

আমার পাশের গ্রামের একটা ছেলে যাত্রাবাড়ীতে একটি কওমি মাদ্রাসাতে পড়তো। শাপলা চত্বরে হেফাজতের জমায়েতে গিয়ে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় আহত হয়েছে। আমি তখন আমেরিকা থেকে দেশে বেড়াতে গিয়েছি। তার বাবা দিন আনে দিন খায়। আমার কাছে এসেছে চিকিৎসায় সাহায্যের জন্য। আমার প্রথম প্রশ্নই ছিল, আপনার ছেলে ওইখানে গেল কেন? উনার উত্তরে অবাক হইনি। উনি বললেন ঐটা নাকি ছিল তাদের ইমানি দায়িত্ব। হেফাজতের হুজুররা তাদের নাকি বলেছিল—ঢাকা শহর নাস্তিকরা দখল করে নিয়েছে। এই নাস্তিকদের খতম করতে হবে।

একটা গল্প বললাম। সবগুলো গল্প এ রকমই ছিল। হেফাজতের এই নেতারা কোমলমতি শিশুদের বিভ্রান্ত করেছে। স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে তাদের মাথা বিক্রি করে দিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটেছে। একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হয়ে রাজনীতির হাতিয়ার হয়েছে। বাংলাদেশকে মূল চেতনা থেকে সরিয়ে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছে। মূলত তাদের ক্ষমতা লিপ্সা, অন্যের হাতিয়ার হিসেবে রাজনীতিতে ব্যবহার হওয়াই হেফাজত ইসলামকে বিতর্কিত করেছে।যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত হেফাজত কোনো আলোচনায়ই ছিল না। আগেও তাদের সংগঠন ছিল, লোকবলও ছিল। তবে মাঠে তাদের নিয়ে খুব একটা বিতর্ক ছিল না।

মূলত তারা ওই সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের কলাকুশলীরা জানতো যে, বিএনপি-জামাতের আন্দোলন জনগণ গ্রহণ করবে না। তাই সেখানে তারা হেফাজতকে কিনে নিয়েছিল। যদি সরকারকে অস্থিতিশীল করা যায় তাহলে হয়তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভেস্তে যাবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও রাজনীতির চালের কাছে সবই ধরা খেয়েছে।

এরপর দীর্ঘ দিন তারা চুপ ছিল। হেফাজতের নতুন কমিটি হওয়ার কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে মামুনুল হকের মতো কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতা লাইমলাইটে আসে। সেই প্রভাবের পুরোটাই তারা কমিটি হওয়ার সময় ব্যবহার করেছে। মূলত হেফাজত ছিল অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু হেফাজতের গত কমিটির প্রায় অর্ধেক নেতার সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা ছিল। অনেকের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ততার শক্ত অভিযোগও আছে।

বিএনপি-জামাত জোটের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়ে তারা হেফাজত ইসলামকেই নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছিল। হেফাজতকে তারা ব্যবহার করেছে এবং সফলও হয়েছে। যেমন, মামুনুল হকের এতো অপকর্মের পরও হেফাজতের পুরা কমিটি তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিছু নেতা বিপক্ষে থাকলেও বাবুনগরী- মামুনুল গংদের তোপের মুখে অসহায় ছিলেন। তাই তারা গণহারে পদত্যাগ শুরু করে দিয়েছিলেন। আর এটা বুঝতে পেয়েই তড়িঘড়ি করে বাবুনগরী কমিটি ভেঙে দিয়েছেন।

হেফাজতের নতুন কমিটি হওয়ার পরদিন আমি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। লিখেছিলাম, “এই কমিটি অনুমোদন করে হেফাজত তাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছে। কারণ এই কমিটির মাধ্যমে হেফাজত ইসলাম একটি রাজনৈতিক ও জঙ্গিবাদী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। জনগণের সহানুভূতিটাও হারিয়েছে”।

হিসাবটা খুব সহজ। যেমন, নিরীহ ভালো ইমেজসম্পন্ন একজন মানুষ। সন্ত্রাসীরা যদি তাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে নিরাপত্তার জন্য ওই বাসায় আশ্রয় নেয় এবং তিনি আশ্রয় দেন। পরে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে যদি ওই আশ্রয়কারী ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন কিন্তু মানুষ ওই নিরীহ ভালো ইমেজসম্পন্ন মানুষটির পক্ষে অবস্থান নিবে না। তখন জনগণই বলবে উনি এইসব বাজে মানুষগুলোকে আশ্রয় দিলেন কেন। নিশ্চয়ই কোনো স্বার্থ আছে। দেখেন, এখন হেফাজতের এতো নেতা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেফতার হচ্ছে, কিন্তু তারা কারো কোনো সহানুভূতি পাচ্ছে না। কারণ তাদের পচনটা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। এখন সেই পচনের গন্ধ বের হচ্ছে। সেই পচনের গন্ধে সহানুভূতিগুলোও দূরে সরে গেছে।

লেখক: সাংবাদিক

সারাবাংলা/আইই

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad

বিজ্ঞাপন

Ad