চট্টগ্রাম: বোয়ালখালীতে বাংলার লোকসংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র একুশে পদকপ্রাপ্ত কবিয়াল রমেশ শীলের ১৪৯তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। শনিবার (৯ মে) সকালে পৌরসভার গোমদণ্ডী রমেশ শীল সমাধি প্রাঙ্গণে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই প্রখ্যাত কবিয়ালের জন্মোৎসব উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
রমেশ শীল ট্রাস্টের সভাপতি মানস চৌধুরীর সার্বিক তত্বাবধানে জন্মবার্ষিকী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট প্রকৃতি চৌধুরী ছোটনের সভাপতিত্বে মঞ্চে উপস্থিত অতিথিদের ফুল ও ক্রেস্ট দিয়ে বরণ করে নেন আয়োজক কমিটি।
সাংবাদিক প্রলয় চৌধুরী মুক্তির সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভাইস চেয়ারম্যান তপন মজুমদার। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাংবাদিক মুস্তফা নঈম।
অতিথি ছিলেন- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, মাইজভান্ডারী গবেষক ড. সেলিম জাহাঙ্গীর, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক রিংকু শর্মা, লেখক-লোকসংস্কৃতি গবেষক মনিরুল মনির, কবি-গবেষক ও দৈনিক বিজনেস ফাইলের ম্যানেজিং এডিটর শিব শংকর মোদক, রমেশ ট্রাস্টের সম্পাদক মৃণাল শীল ও জন্মবার্ষিকী উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব প্রকৌশলী রানা শীল মাইকেল।
স্মরণসভায় মহান এ কবির স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য আয়োজক কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভাইস চেয়ারম্যান তপন মজুমদার বলেন, ‘ভবিষ্যতে উনার যেকোনো অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিতি যদি এ স্মৃতিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে আরও বেগবান হয় তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ধর্মের কাহিনী কর্মজীবনে প্রয়োগ করি না। আর ধর্মের মধ্যে যে মানবিকতা আছে, মূল্যবোধ আছে তাও আমরা মূল্যায়ন করি না। সেখানে কবিয়াল রমেশ শীল আমাদের মাইজভান্ডারীর উত্তরসুরির মতো কাজ করেছেন। কবিয়াল রমেশ শীল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। আর তাই তিনি একজন হিন্দু হয়েও আজ উনার মাজার শরিফ হয়ে গেছে। আমি আনন্দিত এবং গর্বিত। ধর্মের বেরী অতিক্রম করে উনাকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছে।’
প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, ‘চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে একজন সৈনিক এদেশের মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান করেছেন। এটাও এক বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড। বোয়ালখালী থেকেই সূর্যসেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছেন। প্রীতিলতা, কল্পনা দত্তসহ বিরল স্রষ্টাদের উর্বর মাটি এ বোয়ালখালী।’
তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে তার সঙ্গে সমন্বয় করে রমেশ শীলের সমাধি, কমপ্লেক্স এবং তার বাড়ির রাস্তার উন্নয়ন এবং এলাকার বিশিষ্টজনদের স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়ে চিন্তাধারা করবেন বলে আশ্বস্থ করেছেন। এ ছাড়াও আগামী দু বছরের মধ্যে কবিয়াল রমেশ শীলকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পদকে ভূষিত করার বিশেষ প্রধান মন্ত্রীসহ সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ে আলোচনা করবেন বলেছেন।
তাছাড়া তিনি ভবিষ্যতে যেকোন অনুষ্ঠানে আবার আসার উৎসাহ প্রকাশ করেন এবং রমেশ শীলের আগামী অনুষ্ঠানগুলোতে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গদের উপস্থিতি করার আশ্বাসও প্রদান করেন।
এর আগে স্বাগত ব্ক্তব্যে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাংবাদিক মুস্তফা নঈম বলেন, ‘আমি উপমহাদেশের বিখ্যাত কবি রমেশ শীলের অনুষ্ঠানে এসে নিজেকে ধন্য মনে করছি। মহান এ কবির আগামী দেড়শতম জন্মবার্ষিকীতে কী কী আয়োজন হবে তা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। আগামী দিনে রমেশ শীলকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য আমরা কাজ করব।’
অতিথিরা বলেন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল, বাউল ও লোকসংস্কৃতির সাধক রমেশ শীল বাংলা লোকসংগীতের এক অনন্য নাম। তার গান, দর্শন ও জীবনচেতনা আজও বাংলা লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। এ আয়োজনের মাধ্যমে কবির স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় রমেশ ট্রাস্টকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অতিথিরা।
দিনব্যাপী কবিগান, মাইজভাণ্ডারী সংগীত ও আধ্যাত্মিক গানে মুখর থাকে কবির সমাধিস্থল। সন্ধ্যায় দেশবরেণ্য শিল্পীদের অংশ গ্রহণে গানে গানে কবিকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। রোববার (১০ মে) দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানমালায় রয়েছে আলোচনা সভা এবং সমাপনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।