Monday 11 May 2026
সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net

মা দিবসে ছেলেকে বাঁচাতে কিডনি দিলেন মা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১১ মে ২০২৬ ১১:৪০

মা নাসিমা সুলতানা এবং ছেলে নাসিম জাহান আকাশ।

শরীয়তপুর: মায়ের ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই হার মানে। মা মানেই সীমাহীন মমতা আর সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করার অনন্য শক্তি। বিশ্ব মা দিবসে সেই ভালোবাসারই এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার এক মা। নিজের ছেলের জীবন বাঁচাতে একটি কিডনি দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১০ মে) বিশ্ব মা দিবসে ঢাকায় মা-ছেলের সফল কিডনি প্রতিস্থাপন অপারেশন সম্পন্ন হয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, জাজিরা পৌরসভার উত্তর বাইকশা এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা সুলতানার ছেলে নাসিম জাহান আকাশ দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন। প্রায় নয় মাস আগে অসুস্থ হয়ে পড়লে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চিকিৎসকরা জানান, তার দুটি কিডনিই প্রায় অকেজো হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

এরপর থেকেই শুরু হয় পরিবারের দুশ্চিন্তা, কান্না আর নির্ঘুম রাত। সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাসপাতাল, চিকিৎসক আর ডায়ালাইসিসের মধ্যে কাটতে থাকে আকাশের জীবন।

ছেলেকে এভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখে ভেঙে পড়েন মা নাসিমা সুলতানা। কিন্তু দমে যাননি। সন্তানের জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত নিজের একটি কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নাসিমা সুলতানা একজন শিক্ষিকা হিসেবে যেমন শত শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক, তেমনি একজন মা হিসেবে দেখালেন আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ উদাহরণ।

কিডনি অপারেশনটি পরিচালনা করেন দেশের খ্যাতিমান কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ও ইউরোলজিস্ট ডা. মো. কামরুল ইসলাম। তিনি সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

আকাশের বড় বোন বৃষ্টি বলেন,‘আমার ভাইকে বাঁচানোর জন্য মা নিজের শরীরের একটি অংশ দিয়ে দিচ্ছেন। পৃথিবীতে মায়ের মতো কেউ হতে পারে না। মা দিবসে এটাই আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ঘটনা। সবাই আমার মা ও ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন,‘আমরা অনেক ঘটনা দেখি, কিন্তু একজন মা নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সন্তানের জন্য কিডনি দিচ্ছেন-এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এই ঘটনা শুনে আমাদের চোখে পানি চলে এসেছে।’

জাজিরা উপজেলার শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবির বলেন,‘নাসিমা ম্যাডাম সবসময়ই একজন মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আজ তিনি যেটা করলেন, সেটা একজন মায়ের ভালোবাসার সর্বোচ্চ উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবে।’

স্থানীয় তরুণ সমাজকর্মী জাহিদ হাসান বলেন,‘বিশ্ব মা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মা নিয়ে আবেগঘন পোস্ট দেন। কিন্তু একজন মা নিজের সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের অঙ্গ দান করছেন-এটাই প্রকৃত মা দিবসের অর্থ বুঝিয়ে দেয়।’

এদিকে উত্তর বাইকশা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় আকাশের সুস্থতা কামনায় দোয়া ও প্রার্থনা করছেন স্থানীয়রা। কেউ কেউ হাসপাতালে খোঁজ নিচ্ছেন, আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা-ছেলের জন্য দোয়া চেয়ে পোস্ট করছেন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর সব সম্পর্কের মধ্যে মায়ের সম্পর্কই সবচেয়ে নিঃস্বার্থ। একজন মা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে পারেন। শরীয়তপুরের এই ঘটনা যেন সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এলো।

বিশ্ব মা দিবসে এই মায়ের আত্মত্যাগের গল্প শুধু শরীয়তপুর নয়, পুরো দেশের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। কারণ, পৃথিবীর সব ভাষা, সব অনুভূতির ওপরে একটি শব্দই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী।