ঢাকা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০১৫ সালে কার্যকর হওয়া অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলের পর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এখন প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোয় ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা হয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশেও সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল।
অন্যদিকে বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হবে। বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হারও বর্তমান কাঠামোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
চার ধাপে বাস্তবায়ন
নতুন পে-স্কেল একসঙ্গে পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং বাজেটের ওপর চাপ বিবেচনায় নিয়ে মূল বেতন ও ভাতার সুবিধা কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ২০২৭ সালের শুরুতে আরও ৩৫ শতাংশ এবং পরবর্তী ধাপে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করা হবে। শেষ ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বর্ধিত বেতনের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্য হবেন। তবে বাস্তবে নতুন হারে বেতন পরিশোধ ও বকেয়া সমন্বয়ের বিষয়টি প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে।
বকেয়া কীভাবে দেওয়া হবে
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি এবং হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে বেতন সমন্বয় করা হবে। জুলাই থেকে নতুন স্কেলে বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে যে পার্থক্য তৈরি হবে, তা বকেয়া হিসেবে পরবর্তীতে সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে বকেয়া অর্থ এককালীন দেওয়া হবে, নাকি ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হবে- এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হবে।
২০ গ্রেডেই থাকছে কাঠামো
নতুন পে-স্কেলেও সরকারি চাকরির বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। নতুন কাঠামোতে সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভাতাতেও আসছে পরিবর্তন
নতুন পে-স্কেলের আওতায় মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ভাতা মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে একই সময়ে কার্যকর হবে না। ধাপে ধাপে ভাতাগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মোট মাসিক আয় বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ও অন্যান্য অবসরকালীন সুবিধার ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
সরকারের বাড়বে ব্যয়
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন ও পেনশন বাবদ সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাব। এ কারণেই ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জাতীয় বেতন কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে সরকারের সংশ্লিষ্ট কমিটি সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি করে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ফলে এখন নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষা। প্রজ্ঞাপন জারির পরই কোন গ্রেডে মূল বেতন কত হবে, ভাতার হার কী হবে, বকেয়া কীভাবে পরিশোধ করা হবে এবং কোন তারিখ থেকে কোন সুবিধা কার্যকর হবে- এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে সরকারের নিয়মিত বেতন-পেনশন খাতে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।