ঢাকা: শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ও উদ্দীপনা এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সকালের পবিত্র পরিবেশে ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে মা দুর্গার বোধন ও আমন্ত্রণ সম্পন্ন হওয়ার পর সন্ধ্যায় উন্মোচন করা হয় দেবী দর্শন।
সন্ধ্যার এই বিশেষ মুহূর্তে ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দেবীর মুখদর্শনের জন্য বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন মন্দিরে ভক্তরা।
সন্ধ্যার প্রদীপের আলো, ধূপ-ধুনোর সুবাস এবং ভক্তদের উলুধ্বনি ও ঢাকের আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। পুরোহিত মহাশয়ের মন্ত্র উচ্চারণ এবং সন্ধ্যারতি ভক্তদের মনে এক গভীর আধ্যাত্মিক শান্তির সৃষ্টি করেছে। মায়ের মৃণ্ময়ী প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভক্তরা তাদের সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে অঞ্জলি ও প্রার্থনা নিবেদন করছেন। আলোকসজ্জা আর ভক্তকুলের সমাগমে ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বর এক অনন্য উৎসবমুখর জনসমুদ্রে পরিণত হয়, যা শারদীয় দুর্গোৎসবের ঐতিহ্য ও বাঙালি সংস্কৃতির চিরন্তন রূপকে ফুটিয়ে তোলে।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ও উদ্দীপনা এখন চারদিকে এক অন্য মাত্রা লাভ করেছে। শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠী বা অধিবাসের সন্ধ্যায় মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা উন্মোচনের পর ভক্তরা দেবী দর্শনে ভিড় জমান। উলুধ্বনি, শঙ্খনাদ ও ঢাকের বাদ্যের মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবীকে বরণ করে নেন। সন্ধ্যার এই প্রতিমা উন্মোচনের পর ভক্তদের মাঝে এক গভীর ধর্মীয় ভাবাবেগ ও উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ভক্তরা করজোড়ে দেবীর রূপ দর্শন করেন এবং পরিবারের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা ও প্রণাম জানান। সন্ধ্যার পর মণ্ডপগুলোতে দেবীর প্রথম সন্ধ্যারতি শুরু হয়, যেখানে ধূপ-দীপ ও কর্পূরের আলোয় চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে। আলোকসজ্জায় সেজে ওঠা মণ্ডপগুলোতে সব বয়সী মানুষের আনাগোনায় উৎসব প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে।

শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যে মর্ত্যে দেবীর আবাহন। ছবি: সারাবাংলা
এর আগে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রথম প্রভাতে জাতীয় ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে দেবী ষষ্ঠীর আরাধনার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের বৃহত্তম এই উৎসবের শুভ সূচনা হয়। পুরোহিতের সুনির্দিষ্ট সংকল্প এবং মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় সকালের ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী বিহিত পূজার আনুষ্ঠানিকতা। শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে স্থাপিত বেলতলায় সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় বিল্ববৃক্ষ বা বেলগাছ পূজার মূল আচার।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও জাগরণের সূচনা ঘটে বেলবৃক্ষে দেবীর আবাহনের মাধ্যমে। পূজোর বেদিতে গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকার হলদে-কমলা মালায় সাজানো মণ্ডপে তাম্র পাত্র, কাঁসার ঘণ্টা, শঙ্খ এবং পুষ্পাদানি সাজিয়ে বসেন পুরোহিতরা। বেদিতে রাখা হয় পঞ্চপল্লব, আম্রপল্লব, আতপ চাল, নারকেল, ঘট এবং ফুল-তুলসী ও রক্তজবা। বেলতলায় দেবীর বিশেষ অর্ঘ হিসেবে নানা রকমের কাটা ফল, আপেল, আঙুর, বাতাবি লেবু, কামরাঙ্গা ও মিষ্টি নিবেদন করা হয়।
আচারের অংশ হিসেবে পুরোহিত পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে ও কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে বেদির উপাচার শুদ্ধ করেন। এরপর শঙ্খধ্বনি ও ঢাক-কাঁসরের বাদ্যে মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। নারী-পুরুষ ভক্তবৃন্দ অঞ্জলি ও প্রার্থনার জন্য করজোড়ে বেদির সামনে সমবেত হন এবং হাত জোড় করে আম্রপল্লব ও ফুল ধারণ করে দেবীর কৃপা কামনায় ভক্তিভরে প্রণাম জানান। মণ্ডপজুড়ে ঢাকের তালের সঙ্গে কাঁসর-ঘণ্টা ও শঙ্খের সমন্বিত ধ্বনি পুরো পরিবেশে এক অনন্য পবিত্র ও উৎসবমুখর আবহ তৈরি করে।
হিন্দু শাস্ত্রমতে, শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী আজ বাপের বাড়ি মর্ত্যলোকে বেড়াতে আসছেন। অসুর শক্তির কাছে পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন এবং এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্র হয়ে দেবতারা অনুভব করেছিলেন এক মহাশক্তির আবির্ভাব। দেবতাদের তেজ রশ্মি থেকেই আবির্ভূত হয়েছিলেন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা। এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটছে ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং প্রস্থান হবে নৌকায়। শাস্ত্রীয় এই বার্তা মনে রেখে দেশ ও সমস্ত জীবে মঙ্গল কামনায় ভক্তদের প্রাণের আকুতিতে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী পর্যন্ত ছয়দিন ঢাকঢোল ও কাঁসরের বাদ্যে মুখর থাকবে পূজামণ্ডপগুলো।