ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, মাস্টারদা সূর্যসেন হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে সুবিশাল এবং সুপরিকল্পিত অডিটোরিয়াম রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব মিলনায়তনে এখন আর কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হয় না; এগুলো পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত গুদামঘরে।
সঠিক তদারকির অভাবে ঢাবির অডিটোরিয়ামগুলোর অবকাঠামো তো ধ্বংস হচ্ছেই, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের হলকেন্দ্রিক সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাংস্কৃতিক দৈন্যদশা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচারে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের উদ্বোধন হয়েছিল ১৯৩১ সালের ১১ আগস্ট। পরবর্তীতে ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সময়ে দেশের সর্ববৃহৎ দু’টি আবাসিক হল— মাস্টারদা সূর্যসেন হল ও হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল স্থাপন করা হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের সুস্থ বিনোদন ও নাট্যচর্চার পথ সুগম করতেই হলগুলোতে বিপুল দর্শক আসন নিয়ে অডিটোরিয়ামগুলো তৈরি করা হয়। সুবিশাল মঞ্চসহ নেপথ্যের অফিস ও শৌচাগার সুবিধাও ছিল এসব মিলনায়তনে।
এদিকে বর্তমানে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অডিটোরিয়ামটি শুধুই ‘টিভি রুম’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে সূর্যসেন হলের অডিটোরিয়ামটি ‘শহীদ এইচ এম ইব্রাহীম সেলিম মিলনায়তন’ এবং মুহসীন হলেরটি ‘মুহসীন হল অডিটোরিয়াম’ হিসেবে খাতাকলমে টিকে রয়েছে।
অপরদিকে অডিটোরিয়ামগুলোরবাস্তবচিত্র অত্যন্ত নাজুক। মুহসীন হলের অডিটোরিয়ামে এখন বিনোদনের বদলে মঞ্চের পেছনে পর্দা টানিয়ে সপরিবারে বসবাস করছেন কয়েকজন হল কর্মচারী। দোতলার কক্ষগুলোও কর্মচারীদের বাসাবাড়িতে রূপান্তর করা হয়েছে। ভবনের ছাদ থেকে সিমেন্ট খসে রড বেরিয়ে এসেছে। পর্দার আড়ালে অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল কল্যাণ সমিতি’র কার্যালয়টি এখন শিক্ষার্থীদের অচেনা।
এ বিষয়ে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. জুলহাস ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘হলের অডিটোরিয়ামটি পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রভোস্ট স্যার ভবনের ঝুঁকির কথা জানালে আমরা আর পুরাতন অডিটোরিয়ামটি ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করিনি। এখানে নতুন ভবন হলে তখন অডিটোরিয়াম চালু হবে আশা রাখি।’
সূর্যসেন হলের শহিদ এইচ এম ইব্রাহীম সেলিম মিলনায়তনের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দু’টি প্রবেশদ্বারেই ঝুলছে দীর্ঘদিনের তালা, ভেতরে অকেজো আসবাবপত্র স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এখানেও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে দেখা যায় কর্মচারীদের আবাসন। ছাদ ও বাইরের রেলিংয়ের ঢালাই খসে পড়ছে। কয়েক বছর আগেও ঢালাই ধসে শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কর্মচারীরা জানান, বহু বছর ধরে এখানে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়ে মুহসীন হলের শিক্ষার্থী মাহিন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ও কার্যকর হল সংসদ না থাকায় প্রশাসনের ওপর কোনো চাপ থাকে না। হল সংসদ অকার্যকর ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে অবকাঠামোগুলো এমন অযত্নে পড়ে আছে। এই পরিবেশ থেকে বের হতে হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।’
এ বিষয়ে মুহসীন হলের প্রাধ্যাক্ষের দায়িত্ব পালন করা ড. সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখানে যে ভবন আছে সেটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে নতুন ভবন হবে। তখন অডিটোরিয়ামটি ব্যাবহার করা সম্ভব হবে।’
এদিকে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের পুরাতন ভবনটি ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হলটির রুম ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংস্কার করা হলেও অডিটোরিয়ামটি সংস্কার করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে হলভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর নাহিদ খান সারাবাংলাকে জানান, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ অঞ্চলের নাট্যচর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, শহীদুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের অডিটোরিয়ামগুলো ছিল এর অন্যতম ভিত্তি। মুনীর চৌধুরী, সাঈদ আহমেদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নাট্যচর্চা হলগুলোকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, ‘ডাকসু’র নাটক দল ‘নাট্যচক্র’ কিংবা ডাকসু নির্বাচনের পর আয়োজন করা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাগুলো থেকে রামেন্দু মজুমদার, ম. হামিদ ও মামুনুর রশীদের মতো গুণী নাট্য ব্যক্তিত্বরা উঠে এসেছিলেন, যারা পরবর্তী সময়ে জাতীয় নাট্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘হলগুলোতে সৃজনশীল নাট্যচর্চার ক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা আজ মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। থিয়েটার চর্চা শিক্ষার্থীদের বাচনভঙ্গি, শৃঙ্খলা, দলগত কাজের মানসিকতা এবং মননশীলতার বিকাশ ঘটায়। সুস্থ ধারার বিনোদন না থাকায় অনেকেই পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিংবা মাদকের মতো ক্ষতিকর পথে পথ হারাচ্ছে।’ সেজন্য অডিটোরিয়ামগুলোতে ফের আগের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করেন ঢাবির এই শিক্ষক।