জীবনের গতিপথে ছোট-বড় যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিবাহ, কর্মসংস্থান বা ব্যবসায়িক উদ্যোগের মতো জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পদক্ষেপেই সঠিক পথটি খুঁজে পাওয়া জরুরি। ইসলাম আমাদের শেখায়, এমন পরিস্থিতিতে নিজের সীমিত বুদ্ধির ওপর নির্ভর না করে মহান আল্লাহর কাছে হেদায়েত ও কল্যাণ প্রার্থনা করতে।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সালাতুল ইস্তেখারা
জীবনের বড় বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে নবীজি (স.) সাহাবিদের ইস্তেখারা করার শিক্ষা দিয়েছেন। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের কোরআনের সুরা শেখানোর মতোই গুরুত্ব দিয়ে সব বিষয়ে ইস্তেখারা শেখাতেন। তিনি বলেন, কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে ইস্তেখারার দোয়া পাঠ করে (সহিহ বুখারি: ৬৩৮২)।
ইস্তেখারার প্রার্থনায় বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার কাছে কল্যাণ কামনা করে। এই দোয়ার মাধ্যমে আর্জি জানানো হয়, উদ্দিষ্ট বিষয়টি দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য কল্যাণকর হলে আল্লাহ যেন তা সহজ ও বরকতময় করে দেন; আর অকল্যাণকর হলে তা দূর করে উত্তম বিকল্প নির্ধারণ করে দেন।
অনেকের ধারণা, ইস্তেখারার পর স্বপ্নে কোনো সংকেত পাওয়া জরুরি। বিষয়টি তেমন নয়; বরং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা, অভিজ্ঞদের পরামর্শ এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়াই ইস্তেখারার মূল শিক্ষা।
সাধারণ দ্বিধায় সংক্ষিপ্ত দোয়া
দৈনন্দিন সাধারণ বিষয়ে দ্বিধা তৈরি হলে আল্লাহর কাছে সরাসরি হেদায়েত ও কল্যাণ প্রার্থনা করা যায়। এ ক্ষেত্রে অনেকে একটি সংক্ষিপ্ত দোয়া পড়ে থাকেন…
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা খির লি ওয়াখতার লি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমার জন্য যা কল্যাণকর তা বেছে দিন এবং তা নির্বাচন করার তাওফিক দিন।
তবে এই বাক্যটি সরাসরি কোনো সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাই একে নির্দিষ্ট রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ দাবি না করে সাধারণ জিকির বা দোয়া হিসেবে পড়া যেতে পারে। দোয়া করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভাষা বাধ্যতামূলক নয়; যেকোনো ভাষায় নিজের মতো করে আল্লাহর কাছে সঠিক দিকনির্দেশনা চাওয়া যায়।
দোয়ার পাশাপাশি করণীয়
কেবল দোয়ার ওপর নির্ভর না করে সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ ও সম্ভাব্য পরিণতি গভীরভাবে বিবেচনা করা এবং সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এর পর একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দোয়া, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞদের পরামর্শ এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ই হলো সঠিক পদ্ধতি। আমরা হয়তো সাময়িক লাভ বা ক্ষতি দেখতে পাই, কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বিষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি জানেন। তাই দোয়ার পর গৃহীত সিদ্ধান্তের ফল যাই হোক না কেন, তা আল্লাহর ফয়সালা মনে করে মেনে নেওয়ার মধ্যেই প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি নিহিত।