ঢাকা: অবশেষে দেশের পুঁজিবাজার থেকে ‘কলঙ্কিত’ নাম সালমান এফ রহমানের অধ্যায় শেষ হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে তার নাম একটি ‘আতঙ্ক ও পুঁজি’ হারানোর প্রতিচ্ছবি। তার কালো ছায়া সরে যাওয়ার আভাসের প্রতিফলনও দেখা গেছে লেনদেনে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪৯৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগে মঙ্গলবারও (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক সূচক বাড়ে ৯৩ পয়েন্ট।
সূচকের এই উত্থান থেকে বোঝা যায়, নতুন শুরুর আশায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, প্রায় চার দশক পর সালমানমুক্ত হচ্ছে এই বাজার। দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন তিনি। তাতে বিদ্যমান সংকট থেকে কোম্পানিগুলোর বের হয়ে আসার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জানা গেছে, বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। সরকারের নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার ছিল অপরিসীম প্রভাব। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি বেক্সিমকো গ্রুপের দায় হয়ে উঠেন। গ্রুপের কোম্পানিগুলো নানা সমস্যার মুখে পড়ে। তাছাড়া তখন থেকেই বিভিন্ন অভিযোগে তিনি কারাগারে আটকে আছেন।
বিদ্যমান বাস্তবতায় পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে গেলে কোম্পানিগুলোর উপর থেকে একটু চাপ কমতে পারে মনে করে নিজে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সালমান এফ রহমান। ইতোমধ্যে গ্রুপের সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। বাকী দুটির পক্ষ থেকেও চিঠি দেওয়ার কথা।
বেক্সিমকো ফার্মার চিঠিতে বলা হয়, সালমান এফ রহমানকে বাদ দিয়ে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন পর্ষদে কোম্পানির উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে তিন জন, চার জন স্বতন্ত্র পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংকের পক্ষ থেকে মনোনীত একজন পরিচালক ও পদাধিকারবলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকতে পারেন। এ বিষয়ে বিএসইসির পক্ষ থেকে কোম্পানিটিকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বেক্সিমকো গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বেক্সিমকো লিমিটেড, পদ্মা টেক্সটাইল, বেক্সিমকো টেক্সটাইল, বেক্সিমকো ডেনিমস, বেক্সিমকো অনলাইন, বেক্সিমকো ফিশারিজ, শাইনপুকুর সিরামিকস এই বাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
বাজারে আসার এক দশকের কাছাকাছি সময়ের মধ্যে পদ্মা টেক্সটাইল, বেক্সিমকো টেক্সটাইল, বেক্সিমকো ডেনিমস, বেক্সিমকো অনলাইন, বেক্সিমকো ফিশারিজকে একীভূত করে নেয় বেক্সিমকো লিমিটেড। এটি বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
এই প্রক্রিয়ায় সালমান এফ রহমানসহ বেক্সিমকো গ্রুপের উদ্যোক্তারা লাভবান হলেও বিনিয়োগকারীরা বিপুল লোকসানের শিকার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব পণ্য তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারায়। বাজারের ওপরও অনেক বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যায়। অনেকে সহায় সম্বল হারিয়ে পথে বসে যান। আবার কেউ কেউ হতাশ হয়ে বাজার ছেড়ে চলে যান।
জানা গেছে, দেশের পুঁজিবাজারে মার্জার, অ্যাকুইজিশন, টেকওভার, ডিবেঞ্চার, প্রেফারেন্স শেয়ার, সুকুকসহ অনেক পণ্যের প্রচলন হয় বেক্সিমকো গ্রুপের হাত ধরে। এসব পণ্য চালুর পেছনে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন সালমান এফ রহমান। জিএমজি এয়ারলাইনস কিনে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে বিপুল শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা, অ্যাপোলো ইস্পাতসহ কয়েকটি অচল কোম্পানিকে আইপিওতে নিয়ে আসাসহ নানা অপকর্মের পেছনে ছিল তার কালো ছায়া। ডিবেঞ্চার ইস্যু করে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত না দেওয়া, নানা অনিয়মের মাধ্যমে সুকুক ইস্যু করে হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের মতো ঘটনা বেক্সিমকো গ্রুপ ও পুঁজিবাজারের কালো দাগে পরিণত হয়।
সালমান এফ রহমান বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলোর পর্ষদ থেকে সরে গেলে সাময়িকভাবে হলেও তার কালো ছায়া থেকে মুক্ত হবে পুঁজিবাজার।