সিলেট: প্রেমের টানে সনাতন ধর্মের এক তরুণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর নাম পরিবর্তন করে এক মুসলিম তরুণীকে বিয়ে করেছেন— এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শুরু হয়েছে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা। ঘটনাটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার।
এ বিয়ের নিবন্ধন কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় হয়েছে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
তার দাবি, দেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন, নোটারি অ্যাফিডেভিটের আইনি বৈধতা এবং শরিয়াহ বিধান শতভাগ অনুসরণ ও যাচাই করেই উক্ত বিয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়েছে।
জানা যায়, সনাতন ধর্মাবলম্বী সুপ্রজিত কুমার দাস নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ধর্ম ও নাম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে তিনি ‘শাহরিয়ার শুভ’ নামে মুসলিম রীতিনীতি অনুযায়ী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর সুপ্রজিত কুমার দাস ওরফে শাহরিয়ার শুভ এবং কনে উভয়ের বাড়ি বড়লেখা পৌরসভা এলাকায় হলেও তাদের বিয়ে নিবন্ধন করা হয় দক্ষিণভাগ (দক্ষিণ) ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর কার্যালয়ে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন নাম-বেনামের পেজ থেকে ওই বিয়ে ও নিবন্ধন নিয়ে নানা দাবি করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ধর্মান্তরের অ্যাফিডেভিট ও কাবিন সম্পন্ন করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন না করেই ভিন্ন নাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং নিজ এলাকার কাজীকে এড়িয়ে অন্য ইউনিয়নে গিয়ে বিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বরের সই নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন কাজী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এ বিষয়ে কাজী জানান, বিয়ে নিবন্ধনের সময় প্রয়োজনীয় সব বৈধ কাগজপত্র ও আইনি দলিল যাচাই করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, ধর্মান্তর, নাম পরিবর্তন ও বিবাহ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন তথ্যের কারণে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি সনাতন বা অন্য কোনো ধর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ধর্ম পরিবর্তনের হলফনামা (Affidavit of Conversion) এবং নাম পরিবর্তনের হলফনামার মূল কপি কাজীর কাছে উপস্থাপন করতে হয়। এই আইনি দলিল যাচাই করে কাজী সাহেব মুসলিম শরিয়াহ ও আইন অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে সম্পূর্ণ বৈধ ক্ষমতা রাখেন। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনে নাম সংশোধনের আগেই নোটারির কাগজ দেখিয়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই।
এছাড়া নিজ এলাকা বা অন্য ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে বিয়ে নিবন্ধন প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী দাফতরিক ও স্থানীয় বিধিবিধান মেনেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা কাজী সমিতির সভাপতি কাজী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিবাহ নিবন্ধনের পূর্বে কোনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আইনগত সনদ অথবা নও-মুসলিম হিসেবে ধর্মান্তরিত হওয়ার অ্যাফিডেভিট বা হলফনামা দাখিল করলে এবং আইনগত ও প্রশাসনিক নিরাপত্তার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্ক দুজন পুরুষ সাক্ষী থাকলে সেটি আইনগতভাবে বৈধ বিবাহ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কোনো কাজী যদি মুসলিম আইন লঙ্ঘন করে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাবিননামা তৈরি করেন কিংবা গোপনে বিয়ে পড়ান, তাহলে সেটি আইনগতভাবে অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
অপপ্রচার বিষয়ে নিকাহ রেজিষ্টারের প্রতিবাদ
একপাক্ষিক ও যাচাইহীন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একজন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল নিকাহ রেজিস্ট্রারের সম্মান ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন কাজী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন তথ্য প্রকাশের পূর্বে বা একপাক্ষিক সংবাদ তৈরির সময় দায়িত্বশীল গণমাধ্যম উভয় পক্ষের বক্তব্য বা আইনি বিধানগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখে সংবাদ প্রকাশ করলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এথিকস মানা হচ্ছে না। যার কারণে দেশে ফেসবুক অনিরাপদ ও অপপ্রচারের কারখানায় পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ধর্মান্তরিত সুপ্রজিত কুমার দাস ২০১৯ সালে বড়লেখা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ও ১৬ জানুয়ারি জামিয়া জান্নাত নামের মুসলিম তরুণীকে বিবাহ সম্পন্ন করেন।