ঢাকা: বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পারাপার বা ওভারফ্লাই থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে। দেশের আকাশসীমার সুসংহত ব্যবস্থাপনা, আধুনিক রাডার প্রযুক্তির সংযোজন এবং ভৌগোলিক কৌশলগত সুবিধার কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমান সংস্থাগুলোর বাংলাদেশ রুট ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আকাশপথের এ খাত থেকে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
এভিয়েশন সংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্যগামী বহু আন্তর্জাতিক আকাশপথের মূল সংযোগস্থলে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী বিমান বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বিমানকে নির্দিষ্ট সীমানা ব্যবহারের বিনিময়ে বাংলাদেশকে ‘ওভারফ্লাই চার্জ’ বা মাশুল দিতে হয়।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, দেশের প্রধান আকাশপথ ব্যবহারের বিপরীতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিগত এক বছরে (২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন) ওভারফ্লাই ফি বাবদ ৮০৫ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৬৫ টাকা ২০ রাজস্ব আয় করেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্জিত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৩৮৮ কোটি ১০ লাখ ১৫ হাজার ৪৫১ টাকা। আর পরবর্তী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আয়ের পরিমাণ ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ ৪৪ হাজার ৯১৪ টাকায়। ফলে ক্রমান্বয়েই আয়ের পরিমান বাড়তে দেখা গেছে।

-ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
অন্যান্য বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ওভারফ্লাই ফি থেকে আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকায়। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আয় ৮০ কোটি ১৬ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮০ টাকা এবং ২০২৫ সালে ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১৩ টাকা। আর ২০২৬ সালে ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ২২৬ টাকা রাজস্ব আয় হয়।
তথ্য মতে, গত ২০২৪ সালের মার্চ মাসে আয়ের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ টাকা এবং ২০২৫ সালে এটা বেড়ে হয় ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭০ টাকা। আর ২০২৬ সালের মার্চে এই আয় বেড়ে হয় ৬২ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ১০৮ টাকা। ওভারফ্লাইয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে ৫৫ কোটি ২১ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকার রাজস্ব ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ কোটি ২২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮১ টাকায়।
এদিকে, আঞ্চলিক আকাশসীমায় রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক জটিলতার কারণে একাধিক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস নিরাপত্তার সুবিধার্থে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে রুট বেছে নিচ্ছে। আর বকেয়া মাশুল আদায়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কড়াকড়ি এবং ডিজিটাল বিলিং ব্যবস্থা চালুর ফলে এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া আগের চেয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে।
বেবিচক কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশের আকাশসীমার ট্র্যাকিং ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি আধুনিক ও শক্তিশালী। এতে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর কাছে বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবহারের আস্থা বাড়ছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় রাজস্বে।
রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে বেবিচকের এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম সারাবাংলাকে বলেন, বিষয়টা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি, এটা আরও বাড়বে। প্রতি বছরই এটা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশে যত বেশি ফ্লাইট আসবে তত বেশিই রাজস্ব বাড়বে। আমাদের প্রবৃদ্ধির যে ৬৮ শতাংশ বলেছি, এটা সেই ভাবেই এগোচ্ছে। আমাদের রাডার সিস্টেম সক্ষমতাও পর্যাপ্ত রয়েছে।
এক বছরে ওভারফ্লাই ফি বাবদ ৮০৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কীভাবে দেখছেন- জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এয়ার স্পেস ম্যানেজমেন্ট যত বাড়বে ওভারফ্লাই চার্জ থেকে আয় আরও কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।
ওভারফ্লাই পর্যবেক্ষণের জন্য আমাদের সিস্টেমগুলো আরও আধুনিকায়নের দরকার আছে কি না- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে অত্যাধুনিক রেডার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এটা উপযুক্ত বলে মনে করছি। তাই আপাতত আর আপডেট প্রয়োজন নাই। এটার মাধ্যমে অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। তবে এখানে জনবল সংকট আছে কিনা সেটি দেখতে হবে। অনেক সময় জনবল সংকটের জন্য বিমানবন্দরে অনেক কাজ করা যায় না। তাই এসব ক্ষেত্রেও নজরদারি রাখতে হবে।