কুবি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামিদের পক্ষে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আইনজীবী হিসেবে লড়বেন না বলে জানিয়েছেন সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল্লাহ। একই সঙ্গে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক অভিযোগপত্র দাখিল এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইনজীবী নেতারা।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কনফারেন্স কক্ষে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, জেলা আইনজীবী সমিতি, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলা হয়।

সভায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির পিপি অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু, জিপি অ্যাডভোকেট তারেক আব্দুল্লাহ, সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল্লাহসহ সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল্লাহ বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মতো একটি ঘটনায় আইনজীবী সমাজ গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি জানান, আসামিদের পক্ষে আইনজীবী না দাঁড়ানোর বিষয়টি কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত রেজুলেশনের মাধ্যমে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং ঘটনার নির্মমতার প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই আইনজীবীদের মধ্যে এমন একটি নীতিগত অবস্থান তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আসামিদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয়ভাবে স্টেট ডিফেন্সের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে আসামিদের পক্ষে জেলা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য না দাঁড়ালেও বিচারপ্রক্রিয়া আইনগতভাবে চলতে বাধা থাকবে না।
কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির পিপি অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু বলেন, অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে বারের নেতারা সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিচার আবেগের ভিত্তিতে নয়, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সম্পন্ন হবে। এজাহার, তদন্ত ও চার্জশিট, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন, যুক্তিতর্ক এবং সর্বশেষ রায়ের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। আসামির পক্ষে আইনজীবী না থাকলে আইন অনুযায়ী আদালত স্টেট ডিফেন্সের ব্যবস্থা করতে পারে বলেও জানান তিনি।
এর আগে অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু, সরকারি আইন কর্মকর্তা (জিপি) অ্যাডভোকেট তারেক আব্দুল্লাহ, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদুল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল হক খন্দকার এবং সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শরীফুল ইসলাম। এ সময় তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন ও সমবেদনা জানান।
মতবিনিময় সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করতে হবে। আসামিদের বয়সসংক্রান্ত কোনো অস্পষ্টতা থাকলে যথাযথ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করতে হবে। ঘটনার পেছনে কোনো অপরাধচক্র বা পৃষ্ঠপোষকের সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাটিকে কোনোভাবেই ভিন্ন খাতে নেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধের প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রতিমের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে অপ্রতিমকে বিভিন্নভাবে অপরাধের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তার মা ড. নাহিদা বেগম।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে নানা উপায়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে আমি অনেক মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। ওই ঘটনার কারণে যদি আমার ছেলেকে টার্গেট করা হয়ে থাকে, তাহলে এটা আমি মেনে নেব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কোনো দোষ থাকলে আমাকে শাস্তি দেওয়া হোক। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তার শাস্তি আমি পাব। আমার ছেলে কেন এর শাস্তি পাবে? আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেলা হলো?’
নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে তাদের সঙ্গে জড়িয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সেও তাদেরই একজন। অথচ আমার ছেলে নিষ্পাপ, ছোট বাচ্চা। সে এসবের কিছুই বোঝে না।’
তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আমার ছেলের জন্য বিচার চাই না। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তারা জেল থেকে বের হলে আরও কত বাচ্চার জীবন নেবে, কত বাচ্চার জীবন ধ্বংস করবে—সেটা নিয়েও আমি চিন্তিত। আমি চাই, এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হোক।’
মতবিনিময় সভায় শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা আসামিদের বয়স যথাযথভাবে যাচাই, প্রয়োজনে Ossification Test ও অন্যান্য মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত বয়স নির্ধারণ, লালমাই ও সালমানপুর এলাকায় পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও সিসিটিভি স্থাপন এবং মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে কোটবাড়ী ও বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রশাসনিক টহল বাড়ানোর আহ্বান জানান তারা।
সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জেলা পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।