Sunday 27 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বিশ্ব পর্যটন দিবস: প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ভ্রমণের দুনিয়া

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৩

প্রতীকী ছবি।

ঢাকা: প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস আর মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ- সবকিছুকে এক সুতোয় গাঁথে পর্যটন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক শহর থেকে আরেক শহরে মানুষের যাতায়াত এখন শুধু বিনোদন বা অবকাশযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, স্থানীয় উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম বড় মাধ্যম।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। জাতিসংঘের পর্যটনবিষয়ক সংস্থা ইউএন ট্যুরিজমের উদ্যোগে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এই তারিখটি বেছে নেওয়ার কারণ, ১৯৭০ সালের এই দিনে তৎকালীন বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) সংবিধি গ্রহণ করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

এবারের প্রতিপাদ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য-‘ডিজিটাল এজেন্ডা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টু রিডিজাইন ট্যুরিজম’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনকে নতুনভাবে বিনির্মাণ’।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বার্তায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যটকের গন্তব্য বাছাই, পর্যটনশিল্পের পরিচালনা এবং ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তৈরির পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কেবল কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্য ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যেই পর্যটনকে কেন্দ্রীভূত না করে, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটনকর্মী ও নতুন গন্তব্যগুলোকে ডিজিটাল রূপান্তরের অংশীদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের বিশাল অবদান

পর্যটন এখন বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। একই বছরে এই খাত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ কর্মসংস্থানকে সমর্থন করেছে- অর্থাৎ বিশ্বে প্রায় প্রতি ৯টি চাকরির একটি পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ডব্লিউটিটিসির পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং খাতটি প্রায় ৩৭ কোটি ৬০ লাখ কর্মসংস্থানকে সমর্থন করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা

প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশও কম সমৃদ্ধ নয়। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, সিলেটের চা-বাগান, হাওর, নদী, চরাঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মসজিদ-মন্দিরসহ ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং গ্রামীণ জীবন সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটনের রয়েছে বহুমাত্রিক সম্ভাবনা।

বাংলাদেশে পর্যটনকে শুধু কক্সবাজার, সুন্দরবন বা সেন্টমার্টিনকেন্দ্রিক না রেখে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নদী, খাদ্য, গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে বৈচিত্র্যময় পর্যটন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটে বিদেশি পর্যটক আগমনসংক্রান্ত তথ্য, কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম এবং পর্যটনবিষয়ক বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে। বোর্ডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনও তালিকাভুক্ত রয়েছে।

পর্যটন উন্নয়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবকাঠামো

বাংলাদেশে পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে প্রয়োজন নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আবাসন, পরিচ্ছন্নতা, পর্যটনকেন্দ্রিক প্রশিক্ষিত জনবল, পর্যাপ্ত তথ্যসেবা, আধুনিক ডিজিটাল বিপণন এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা।

একজন বিদেশি পর্যটক কোনো গন্তব্যে যাওয়ার আগে সাধারণত জানতে চান- কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কত খরচ হবে, নিরাপত্তা কেমন, চিকিৎসাসেবা কোথায়, কী কী দেখার আছে এবং অনলাইনে কীভাবে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যাবে। এই তথ্যগুলো যত সহজে পাওয়া যাবে, একটি দেশের পর্যটনব্যবস্থা তত বেশি পর্যটকবান্ধব হবে।

টেকসই পর্যটনই ভবিষ্যৎ

পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপও বাড়তে পারে। অতিরিক্ত পর্যটক, প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিকল্পিত স্থাপনা, পাহাড় কাটা, বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কিংবা সমুদ্র ও নদী দূষণ কোনো পর্যটন এলাকার দীর্ঘমেয়াদি আকর্ষণ নষ্ট করে দিতে পারে।

এ কারণেই এখন বিশ্বজুড়ে টেকসই পর্যটন নিয়ে গুরুত্ব বাড়ছে। জাতিসংঘের মতে, পর্যটন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম এবং এটি বিশেষ করে কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি ও নারী-যুবকদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে।

স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে পর্যটন নয়

একটি পর্যটনকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়; সেই এলাকার মানুষ, সংস্কৃতি, খাবার, ঐতিহ্য ও জীবনধারাও পর্যটনের অংশ।

বিশ্বজুড়ে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও এ বিষয়ে নির্দেশিকা ও তথ্য প্রকাশ করেছে।

সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে একজন পর্যটক যখন কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় যাবেন, তখন তার ব্যয়ের একটি অংশ স্থানীয় পরিবহন, খাবার, গাইড, আবাসন, হস্তশিল্প ও অন্যান্য সেবার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছাবে। এতে পর্যটন শুধু দর্শনীয় স্থানকেন্দ্রিক না হয়ে স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে করণীয়

বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আরও কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে-

পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নত করা। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটকবান্ধব সেবার মান নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোর ব্র্যান্ডিং জোরদার করা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার করা। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিকে পর্যটন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য পর্যটকের কাছে বাংলাদেশের তথ্য সহজে পৌঁছে দেওয়া।

রাষ্ট্রপতির বাণী

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশের এক হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়নের কাজ করছে।

‘বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬’ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পর্যটন খাতকে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের এক হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। প্রত্যেকটি জেলার পর্যটন উপযোগিতা বিবেচনা করে স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন সুবিধা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২৬’ পালিত হচ্ছে জেনে আমি আনন্দিত।’ তিনি বলেন, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পর্যটন একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। জাতীয় পর্যটন নীতিমালা হালনাগাদ ও আধুনিক পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণের পাশাপাশি ইকো ট্যুরিজম ও কমিউনিটি ট্যুরিজমের বিকাশে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সরকারের চলমান উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে পর্যটনের ডিজিটাল রূপান্তরও ত্বরান্বিত হবে। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যসেবা বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোকে আরও সহজলভ্য, নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে তুলবে।

প্রধানমন্ত্রীর বাণী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও বিশ্বমানের শিল্পে উন্নীত করা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, ‘পর্যটন শুধু অবকাশযাপনের সুযোগ নয়; এটি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।’

বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, পর্যটন পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা, দেশি-বিদেশি পর্যটক এবং পর্যটনপ্রেমীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী জানান, পর্যটনকে আধুনিক ও ভূমি-সাশ্রয়ী সেবাখাত হিসেবে বিকশিত করতে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালার আধুনিকায়ন এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পর্যটনশিল্প ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার জাতীয় লক্ষ্য পূরণে অবদান রাখবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সংযোগ নারী, তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে গৃহীত সব কর্মসূচির সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করেন প্রধান্মন্ত্রী।

সারাবাংলা/এমএমএইচ/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর